টোনাটুনির সংসার-শিশুতোষ

 টোনাটুনির সংসার

জহির টিয়া

টুনটুন শব্দে কলিংবেল বাজতেই টুনি দরজাটা খুলে ঠোঁট বাঁকিয়ে মিষ্টি করে বলল, তার বর টোনাকে,
- তুমি রোজ রোজ এভাবে রাত করে, বাসায় ফিরলে আর দরজা খুলবো না কিন্তু ! ছেলেমেয়েরা দিনদিন বড় হচ্ছে। বারবার বলছি, এখন ওদের একটু সময় দাও। খাতাকলম নিয়ে পড়তে বসাও। শুনো, কালকেই তুমি ওদের জন্য খাতাকলম, স্কুল ব্যাগ নিয়ে আসবে।
মুখ টিপে হাসতে হাসতে টোনা বলল,
- আচ্ছা, গিন্নি ঠিক আছে। তাই করা হবে। এখন তাড়াতাড়ি খেতে দাও। খুব খিদে পেয়েছে। খিদেয় পেট একেবারে চোঁ চোঁ করছে ।
- আমি খাবার বেড়ে রাখছি । তুমি কলতলা হতে ফ্রেশ হয়ে এসো। 
বাসা হতে একটু দূরে কলতলা। দক্ষিণ পাড়ার পশুপাখিদের একটাই কল। লাইন দিয়ে পানি নিতে হয়। ভীষণ অসুবিধা হয়। চেয়ারম্যান বানর বারবার কথা দিয়েও কথা রাখছে না। প্রতি বছর-ই কয়েকটা কল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। বাস্তবে তা হয় না। আর কেউ নিজে থেকেও কিনে পুঁততে পারছে না। একটা কল বসাতে বিশাল অঙ্কের খরচ । কলতলা হতে একটু দূরে একটা বরইগাছের কোটরে টোনাটুনির বাসা । এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তাদের সংসার। মোটামুটি সুখী একটা পরিবার।

এদিকে টুনি খাবার বেড়ে বসে আছে। টোনার আসার কোনো খবর নাই। ছেলেমেয়েরাও ঘুমিয়ে পড়েছে । ওদের একা রেখেও বাইরে খুঁজতে যেতে পারছে না । হঠাৎ টুনির কানে, টোনার চিৎকারের শব্দ । টুনি তাড়াহুড়া করে বেরিয়ে ছুটে যায় কলতলায়। গিয়ে দেখে, মাতাল কাকের সাথে টোনার কথা কাটাকাটি চলছে। মাতাল কাক তো অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করছে । 
এই কাকটা গোটা পাড়াটাকে মাতিয়ে রাখে। তার জ্বালায় কেউ কোনো জিনিসও বাইরে রাখতে পারে না। এমন কোনো নেশাদ্রব নেই, যা সে গিলে না। গাঁজা, আফিম, মদ, ইয়াবা সবকিছুই সে খায়। বাসিপঁচা যেকোনো  জিনিস খায় আর মাতাল হয়ে পড়ে থাকে। তার মতের বিরুদ্ধে গেলে, ছোটবড় বুঝে না সবার গায়ে হাত তুলে। তাই তার সাথে কেউ লাগতে যায় না।  তার সমবয়সী সবার দুই-চার টা ছেলেমেয়ে। অথচ সে বিয়ে করছে না। কিছু দিন আগে তার বৃদ্ধ মা-বাবা মারা গেছে। ছেলেকে বারবার বলেও বিয়ে করাতে পারে নি। আর নেশাখোরকে মেয়েই দিবে কে ?
টুনি তার স্বামী টোনাকে ডানা ধরে টেনে নিয়ে এলো। টোনাও রাগে ফোঁসতে ফোঁসতে চলে গেল বাসা। টুনি মুখটা গম্ভীর করে বলল,
- অই মাতালের সাথে লাগতে কেন  গেলে? 
- আ-রে, আমি তার সাথে লাগতে কেন যাবো ? কলের হাতাটা ধরে দুই চাপ দিয়েছি। অমনি মাতালটা কোথা হতে এসে আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে কলের হাতাটা ধরে নেয়। তুমিই বলো, আমার দোষটা কোথাই ? 
- সেটা বুঝেছি। তার সাথে আর লাগতে যেও না। মাতালটা কখন কি করে বসে !
- না, এভাবে চলতে দেওয়া যাবে না। চেয়ারম্যানকে বলে তার একটা বিহিত করতে হবে।
- তুমি এইগুলোতে জড়াইতে যেও না তো। আরও সবাই আছে তারা দেখবে ।
- কিন্তু, সে (কাক) যার তার সাথে অন্যায় করবে আর আমরা মুখ বুজে সহ্য করবো। প্রতিবাদ না করলে তার আচরণ দিনদিন আরো হিংস্র হয়ে ওঠছে। অন্যায়কে প্রশয় দিতে নেই। চেয়ারম্যানকে বলে, তাকে জেলে ঢুকার ব্যবস্থা করতে হবে।
- চেয়ারম্যানও আর কত ভালো মানুষ ! তিনিও তো কথা দিয়ে কথা রাখেন না। আর কয়েকটা কল দিলেই তো হয়ে যায়। সামনের ইলেকশানে চেয়ারম্যান পরিবর্তন করা উচিৎ ।
- যাক, বাদ দাও ওসব কথা। মাটিরও কান আছে। তাঁর বিরুদ্ধে এই কথা বলছি, শুনলে তখন আরও সমস্যা হবে। 
- কোথাও ব্যথা পেয়েছ নাকি ?
- হ্যাঁ, একটু বাম ঠ্যাঙের এইখানে। সজোরে ধাক্কা দেওয়াতে পড়ে গেছিনু পিচ্ছলে। 
- আচ্ছা, মালিশ করে দিচ্ছি।
টুনি তেঁতুল পাতার রস দিয়ে টোনার পা-টা মালিশ করে দিল। তারপর খাবার খেয়ে শুয়ে গেল । বিছানায় শুয়ে টুনি, স্বামী টোনাকে বলল,
- দ্যাখো, বর্তমান যুগ-যামানা খুব খারাপ। ছেলেমেয়ে দুটাকে যেভাবেই হোক সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। ওদের একটু ভালোভাবে যত্ন নাও। 
- তুমি ওসব চিন্তা করো না। কালকে সবকিছুর ব্যবস্থা করছি।

পরদিন ঝাউপাড়ার বাজার হতে খাতাকলম কিনে নিয়ে এলো টোনা । ছেলেমেয়েকে নিয়ে পড়তে বসল । টুকি ও টোকন, টোনাটুনির দুই ছেলেমেয়ে। তারাও বাবার কাছে আনন্দের সাথে পড়তে বসল। টুকি ও টোকন মা-বাবার কথামতো চলাফেরা করে। মা-বাবার প্রতিটি কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। ছেলেমেয়েদের নিয়ে খুব সুখে দিনগুলো কাটতে লাগল। 

0/Post a Comment/Comments

Please do not enter any spam link in the comment box.

Stay connected

FACEBOOK- Fans Like
TWITTER- Followers Follow
YOUTUBE- Subscribers Subscribe

Subscribe us

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner