করোনাকালের গল্প

 করোনাকালের গল্প

জুয়েল আশরাফ 


দুপুর থেকে একটা খবর নূরুলপুর গ্রামবাসীদের ভয়াবহ আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। গ্রামের মানুষ দরজা বন্ধ করে ঘরে চুপ মেরে আছে। নূরী সাত মাসের অন্তঃস্বত্ত্বা। শাশুড়ি আর ননদ ঘরে কাঁদছে। তারও ইচ্ছে হচ্ছিল চিৎকার করে কাঁদতে। কিন্তু স্বামীর কথায় মনে পড়ে গেল, 'করোনা ভাইরাস আমাগো মতোন গরিব মানুষরে আক্রমন করব না। বুকে বল রাখো। না হলে বনের বাঘের চেয়ে মনের বাঘেই আগে খেয়ে নেবে।' স্বামীর কথাগুলি নূরী ভাবে আর গোপনে চোখের জল ফেলে।
একটু আগে বাড়ির পাশ দিয়ে গ্রামের লোকজন কথা বলতে বলতে যাচ্ছিল। লোকজনের মধ্যে দোকানদার পান্নু, আকবর চাচা, মসজিদের ইমাম সাহেবও ছিলেন। আলোচনা হচ্ছিল গ্রামের রাস্তায় পড়ে থাকা লাশ প্রসঙ্গে। লাশের কাছে যাবার কারোর সাহস হচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে খবর দেয়া হয়েছে। তারা এসে লাশের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। লাশটি যে কার হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। মানুষটি যে কোথায় থেকে এসে এখানে পড়ে মরলো কেউ জানে না। শুধু খবর রটেছে লোকটি মারা যাবার আগে পানি খেতে চেয়েছিল। তার সঙ্গে মটরবাইক ছিল। পানি আনতে আনতেই দেখা গেল লাশ হয়ে পড়ে আছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসে এই গ্রামের ছাব্বিশটি ঘর লকডাউন করে গেছে। ইমাম সাহেব দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বললেন, 'আল্লাহ রব্বুল আ'লামীন "মালাকুল আরহাম" নামক এক শ্রেণির ফেরেশতা সৃষ্টি করে রেখেছেন। এরা শিশু মাতৃগর্ভে থাকাকালীন তার মৃত্যুস্থানের মাটি তার রক্ত মাংসের সঙ্গে মিশিয়ে দেন। ফলে জন্মের পর মানুষ যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ালেও মৃত্যুর পূর্বক্ষণে রক্তমাংসের সঙ্গে মিশান মাটি যে স্থান থেকে নেয়া হয়েছিল সেখানে এসে উপস্থিত হয় এবং সেখানেই তার ইহলীলা সাঙ্গ হয়।'
বাঁশের বেড়ার সঙ্গে দাঁড়িয়ে নূরী কথাগুলো শুনছিল। সে কান খাড়া করে আছে লাশটি কার শুনতে। তার স্বামী পেটের দায়ে কাজের সন্ধানে বের হয়েছে। এরকম খিদে পেট নিয়ে কত মানুষ যে গৃহবন্দী হয়ে আছে সেখবর কে জানে! কাল এ গ্রামেরই দুজন রাজমিস্ত্রির কাজ করতে গিয়ে পুলিশের মার খেয়ে ফিরে এসেছে। রাস্তায় বের হওয়া এখন একেবারেই বারণ। অকারণে কাউকে রাস্তায় পাওয়া গেলেই জেল জরিমানা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠিন সতর্কবাণী। অল্প পর পরই তারা মাইকিং করে যাচ্ছে, 'আমাদেরকে কঠোর হতে বাধ্য করবেন না। সবাই যার যার ঘরে থাকুন। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন।' খবর পাওয়া গেল ফিলিপাইনে বাড়ির বাইরে দেখা মাত্রই গুলির নির্দেশ। সেই দেশের সরকার কঠিন আইন করেছেন। যদি তার স্বামীও রাস্তায় পুলিশের গুলিতে...। নূরীর ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে ওঠে ভয়ে। পরক্ষণেই নিজেকে সান্ত্বনা দেয়, আমাদের দেশের সরকার তো এখনো এরকম আইন করেননি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেশের লোকদের কল্যাণের জন্যই দিনরাত মানুষকে ঘরে থাকার মধ্যেই নিরাপদ ঘোষণা করে যাচ্ছে।
কাজের সন্ধানে স্বামী কোথায় গেছে জানে না নূরী। সকাল নয়টা বাজতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাস্তাঘাটে টহল দিতে আরম্ভ করে। তাদের চোখে ফাঁকি দিয়ে আজ তাই খুব ভোর-সকালে কাজে বেরিয়ে গেল। রাস্তায় লাশটা কার সঠিক না জানা পর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছে না নূরী। আর তাই তো বাঁশের বেড়ার দেয়ালে দাঁড়িয়ে কান খাড়া করে থাকে।
শাশুড়ির ডাক কানে এলো, ও বউ, পোয়াতী মেয়ে তুমি। সাঝের বেলায় চুল ছেড়ে অমন বাইরে থাকে না। ঘরে আইসা বসো। আনোয়ারকে কত করে বললাম দেশের অবস্থা ভালা না, এখন বাইরে যাইয়া কাজ নাই। কখন করোনার বাতাস কার গায়ে লাগব! কে শুনে কার কথা। পোলাটা আমার কই গেল আল্লাহ মাবুদ জানে!
নূরীর গলা বুজে আসছে। অসহায় আর্তচিৎকার বুক ফেটে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। সে নিজের ঘরে এসে বসল। নিজেকে যত সহজ আর স্বাভাবিক রাখা যায় এই এক জোড় চেষ্টা চলতে থাকে ভেতরে ভেতরে। আচ্ছা রাস্তার লাশটা যদি তার স্বামীর লাশ হয়, কেউ এসে যদি এমনই এক মৃত্যু সংবাদ দেয়? এরকম সংবাদে সে কি স্বামীর লাশ ছুঁতে পারবে? করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পাশের গ্রামের দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যু হয়েছে। তাকে কবর দেয়া হয়েছে দশ কিলোমিটার দূর জায়গায়। লোকজন মরদেহের ধারে কাছে ভিড়তে পারেনি। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নিয়মে দাফন করা হয়েছে। সে-ও নিজের স্বামীর লাশ দেখতে পাবে না!
নূরী আশ্চর্য হয়, এসব সে কী ভাবছে! তার পেটে সাত মাসের শিশু। শিশুটি পৃথিবীর আলো দেখার জন্য প্রতিনিয়ত জানান দিচ্ছে। গর্ভাবস্থায় মানুষের ভেতরে ভয় ডর আশাহত ব্যাপারগুলি খুব বেশি প্রভাব বিস্তার করে। তাকেও অহেতুক ভীতি আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আর অযথা ভাববে না নূরী। দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে ঢুকল চাপকল ঘরে। চাপকলের পানি নিল চোখে মুখে। ছড় ছড় পানির শব্দের সঙ্গে কাঁদল কিছুক্ষণ অকারণেই। এরপর নিজের ঘরে এলো।
উঠানে কার পায়ে হেঁটে আসার শব্দ শোনা যাচ্ছে। শব্দটা খুব স্পষ্ট হয়ে ঘরের দিকে আসছে। স্বামী আনোয়ারের হাঁটার শব্দ নূরী চেনে। নূরী আয়নায় দাঁড়িয়ে মুখটাকে দেখবে এখন। ব্যথিত মন কখনও আয়না দেখতে চায় না। নূরী দেখবে, তার দেখার প্রয়োজন আছে। চেহারায় অসুখী ভাবটা চলে গিয়ে সুখী ভাব আসছে না কি অসুখীই থেকে গেছে- দেখা ভীষণ দরকার। স্বামী আনোয়ার মনমরা মুখ সহ্য করতে পারে না। দেখলেই ভীষণ রাগারাগি আরম্ভ করবে। গর্ভাবস্থায় দুশ্চিন্তা দুর্ভাবনা এসব একেবারেই নিষিদ্ধ। এসব জিনিস গর্ভের সন্তানের ওপর প্রভাব ফেলে। পেটের বাচ্চাটাকে পৃথিবীর আলো দেখানোর জন্য যুদ্ধ করে যেতে হবে। করোনার ভয়কে জয় করে মুখে হাসি ফুটিয়ে রাখার যুদ্ধ। নূরী আয়নায় তাকিয়ে নিজের চুলগুলো ঠিক করে নেবে, এমন সময় পেছন থেকে পুরুষ একটা কন্ঠ বলল, বউ, মা আর লোপা কোথায়? বাজার আনছি। বাজারে জিনিসপত্রের দাম অনেক!
ঘুরে তাকাতে ইচ্ছে করছে না নূরীর। নিজের ব্যথিত ভারাক্রান্ত মুখ স্বামীর চোখে পড়ে, এই ভাবনা তাকে আরো কাতর করে রেখেছে।
আনোয়ার বলল, দুপুরে খাইছিলা?
নূরী শাশুড়ি আর ননদকে বাজারের কথা বলার জন্য পাশের ঘরে যেতে পা বাড়াচ্ছিল। আনোয়ারের গরম মেজাজের সামনে চুপ হয়ে দাঁড়াল। আনোয়ার বিরক্ত গলায় বলল, কথা কও না ক্যা? খাইছো দুপুরে?
-একজন লোক মারা গেছে গ্রামের রাস্তায়।
-মরছে তো কী হইছে? হেই লোকের মরন আছিল মরছে। তার কারণে তুমি খাওয়া বাদ দিবা ক্যান?
-খাইতে মন চায় নাই। আপনি বাইরে আছেন। আপনার জন্য চিন্তা হয়।
আনোয়ার আগের থেকে আরো রেগে গলায় বলল, তুমি করোনার ডর ভয়ে না খেয়ে থাকবা। আমার সন্তানরে না খাইয়ে মারবার পাঁয়তারা করতাছো। তুমি না খাইলে সে তো খাওন পাইব না, জানো না?
নূরী জানে সবই। বোঝেও সবকিছু। মন-মানসিকতা খাওয়া-দাওয়ার নিয়ম মেনে চলতে নারাজ। দেশের যা পরিস্থিতি, রোজ রোজ মানুষ মারা যাচ্ছে করোনাভাইরাসে। নতুন আক্রান্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ইতালি, আমেরিকা, ফ্রান্সে প্রতিদিন হাজার লোক মারা যাচ্ছে। দেশের সরকার মানুষের ভালোর জন্যই লকডাউন করেছে সমস্ত শহর, উপশহর, গ্রাম, মফস্বল। এরকম ব্যবস্থা থাকতো যদি পেটের খিদেকেও লকডাউন করা যাচ্ছে! তাহলে তাদের মতো গরীবদের করোনাভাইরাসের আতংকের ভেতর দিয়ে খাবারের সন্ধানে বাইরে যেতে হতো না। নূরী বুক ভরে বাতাস নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এখন শুধু সেই সৃষ্টিকর্তাকে ডাকা যিনি করোনাভাইরাস সৃষ্টি করেছেন। করোনাভাইরাস যিনি পরিচালনা করছেন। যার উপর ইচ্ছা ব্যবহার করছেন। 

0/Post a Comment/Comments

Please do not enter any spam link in the comment box.

Stay connected

FACEBOOK- Fans Like
TWITTER- Followers Follow
YOUTUBE- Subscribers Subscribe

Subscribe us

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner