বৃষ্টির ঘ্রাণ
জুয়েল আশরাফ
মাছ কাটার বটি দিয়ে মানুষ কাটার পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে রাহেলা জীবনে অনেকবার। মাঝে মাঝেই তার তীব্র ইচ্ছা হয় শীলার বাবাকে কেটে ফালাফালা করে ফেলে। শীলার বাবা বিনয়ী, নম্র ভদ্র জাত স্বভাবের। খাবার প্লেটে ছাই ঢেলে দিলেও এই মানুষ উচ্চ আওয়াজ করবে না। এমন মানুষকে কেটে ফেলার চিন্তা অন্যকে অবাক করলেও রাহেলা জানে, ষোল বছরের সংসার জীবনে জেনে গেছে ইউনুছের সবটাই ভান। শীলার বাবার নাম ইউনুছ। শীলা তাদের একমাত্র মেয়ে। মেয়েটির জন্মের সময় বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। ইউনুছ তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে মনের আনন্দে বৃষ্টির খুব কাছে নাক নিয়ে ঘ্রাণ টেনে নিচ্ছে। টিনের চালে ভারি বৃষ্টিপাতের আওয়াজ আর অনবরত শীল পড়ে যাচ্ছে। ভেতর ঘরে প্রসূতি স্ত্রীর চিৎকার কান্নাকাটি। সেদিকে ইউনুছের মাথাব্যথা নেই। সে এক হাড়ি ভর্তি শীল কুড়িয়ে নিল। চিনি গুলিয়ে সরবত করে খাবে। একজন এসে খবর দিল- মেয়ে হয়েছে। ইউনুছ সরবত বানাতে এসে দেখে ঘরে এক দানা চিনি নেই। চিনির কাজটা আখের গুড় দিয়েও সেরে নেওয়া যায়। সে সরবত বানিয়ে খেয়ে বলল, আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহর কী অপূর্ব নেয়ামত। এই নেয়ামতের সাথে নাম মিলিয়ে মেয়ের নাম রাখে- শিলা। মেয়ের নাম দেওয়া পর্যন্তই, ভরণ পোষনের খবরাখবর নাই। রাহেলা উচ্চমাধ্যমিক পাশ। এইটুকু পড়াশোনা নিয়ে চাকরির খোঁজ নেওয়া শুধু বোকামি নয়, রীতিমত লজ্জার ব্যাপার। স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে একজনের সহযোগীতায় সে খুবই নিম্নমানের বেতনের চাকরিটা পায়। তাতে তো আর সংসার চলে না। সাথে সকাল বিকাল কয়েকটা টিউশন করতে হয়। তাতেও স্বচ্ছলতার মুখ দেখতে পায় না সংসার। ইউনুছের কাজ ধান্দা করার মেজাজ উড়ে গেছে অনেক আগেই। সম্ভব হলে তাকে একশ দুশো টাকা দিয়ে সাহায্য করো। রোজ বউর কাছে হাত পেতে ভিক্ষে চায় ইউনুছ। রাহেলা একদিন বলেছে, মাছ কাটার বটি দিয়ে দুই টুকরো করবে। টাকা নেওয়ার জন্য জীবনে আর হাত পাততে হবে না।
ইউনুছ হাসি মুখ করে বলল, হাত না থাকলে তোমার দান-দয়ালু মনের কাছে মাথা পেতে দেব।
এই জাতীয় রসিকতায় রাহেলার মেজাজ আরও বিগড়ে যায়। ইউনুছের সবকিছু এখন অসহ্য লাগে। ওর কোনো ভালো কথা শুনলেও শরীর হাত পায়ে জ্বালা ধরে উঠে।
কাল রাত থেকে বৃষ্টি। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ইউনুছ মেয়ের চুল আচড়ে দেয়। এটা সে রোজই করে। রাহেলা বারান্দায় মন খারাপ নিয়ে এটো বাসনপত্র বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে পরিস্কার করছে। রাতে সে খুব খারাপ একটা স্বপ্ন দেখেছে। স্বপ্নে ইউনুছ পাশের গ্রামে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে। শরীয়তের আইন অনুযায়ী গ্রামের লোকজন তার হাত দিল কেটে। এমন ভয়ঙ্কর স্বপ্নে ধড়ফড় করে সে উঠে বসে বিছানায়। পাশে ইউনুছের ঘুমন্ত খোলা শরীর। স্বামীর খোলা বুকে মাথা রেখে ফুপিয়ে উঠল।
বুকে চোখের পানির স্পর্শে ইউনুছ জেগে যায়। ঘুম জড়ানো গলায় বলে, ও বউ কাঁদো কেন? রাত-বিরাতে কান্নার কী হয়েছে?
রাহেলা জবাব দেয় না। চুপ হয়ে থাকে। স্বামীর বুকে কেটে যায় দীর্ঘসময়। একসময় ইউনুছ বলল, ও বউ, শীলাকে ডাক্তারি পড়ালে কেমন হয়? গ্রামে ভালো ডাক্তার নাই। একজন আছে হাতুড়ে ডাক্তার। রমজান আলী নাম। মানুষকে ভুলভাল ওষুধ দেয়। সাজুর বাবা মারা যে গেছে, রমজান আলীর ওষুধেই মরছে। আমার মায়ের কোনো ভাইবোন নাই। নানাবাড়ির সব সম্পত্তি আমার। সেগুলো বিক্রি করে মেয়েকে ডাক্তারি পড়াব। আর গ্রামে স্কুলের পাশে একটা ছোট্ট ক্লিনিক ঘর তুলবো। চুপ কেন বউ? তোমার কাছে কী আমার কথাগুলো নাটক সিনেমা মনে হয়?
ইউনুছের কথা শেষ হতেই বজ্রপাতের সাথে বাইরে বৃষ্টি শুরু হলো। টিনের চালে ঝম ঝম বৃষ্টি পড়ার আওয়াজ বেড়ে গেল। ইউনুছ অন্ধকারে চঞ্চল হয়ে উঠে বসে। বিছানার সাথে জানালা। খুলে দেয়। ফুরফুরে বাতাসের সাথে বৃষ্টির ঝাপটা এসে লাগল মুখে।
রাহেলা বিরক্ত গলায় বলল, আহা জানালা আটকাও। বৃষ্টির পানি গায়ে লাগে।
ইউনুছ আনন্দ পাওয়া গলায় বলল, বউ, মুখটা জানালার কাছে আনো। বাতাসে জোরে শ্বাস নাও। দেখো কী দারুন ঘ্রাণ!
রাহেলা আগের চেয়ে আরও বিরক্ত হয়। কিন্তু সত্যি সত্যিই জানালার কাছে মুখ এনে বাতাসে ঘ্রাণ নেয়। বৃষ্টির ঘ্রাণ ছাড়া অন্য কোনোকিছুর গন্ধ সে পাচ্ছে না। বিদ্যুৎ চমকানো আলোতে ইউনুছের শিশুমুখ দেখতে পেল। সে মুখ কোমল আর নিষ্পাপ শিশুমুখের মতোন।
ইউনুছ আগের চেয়ে আরও আনন্দিত গলায় বলল, ছোটবেলায় আমি বৃষ্টিতে ভেজার অপরাধ করলে শাস্তির জন্য বাবা আমাকে ঘন্টার পর ঘন্টা বৃষ্টির মধ্যে দাঁড় করিয়ে রাখতেন। সেই থেকে বৃষ্টির ঘ্রাণ আমার নেশার মতো লাগে!


Post a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.