ঘুড়ি ওড়ার আনন্দে
জুয়েল আশরাফ
'আমি তখন তোদের চেয়েও খানিক ছোট, ফটরফটর কথা বলতে শিখে গিয়েছি তখন...।'
রকি পাখাল ভাইয়ের দিকে বিরক্ত হয়ে তাকাল। ওর দৃষ্টিতে পরিস্কার লেখা- 'চারবার পরীক্ষা দিয়ে পাশ করেছেন। আর দুটি বছর থাকলে স্কুল ব্যাগ কাঁধে নিয়ে আমাদের সাথী হতে পারতেন। নিজেকে কত বড় ভাবেন? তালগাছ সমান?' রকির নীরব কথাগুলি শুধু আমিই পড়তে পারি। তাই একটু ভড়কে গেলাম। ও আবার ঝামেলা না করে, শান্ত রাখতে ওর পিঠে হাত বোলালাম। আমরা এসেছি পাখাল ভাইয়ের কাছে ঘুড্ডি বানানো শিখতে। পাড়ায় পাখাল ভাইয়ের ঘুড্ডি বানানোর কৃতিত্ব জানতে পারলাম খোশালের কাছে। তাই খবর পেয়েই চলে আসি আমরা। আমরা বলতে আমি, রকি, খোশাল, ছানি আর গালিব। রকি তো আসতেই চাইছিল না। ওর ধারণা পাখাল ভাই কাজের চেয়ে অকাজ বেশি করবেন। নিজে যা না তা নিয়েই বাহাদুরি। বিশ্ব পন্ডিতি লোক, সবজান্তা এমন ভাবখানা মুখের। এমন মানুষের কাছ থেকে বিনা পয়সায় চিড়ার মোয়া পাওয়া গেলেও খাওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু খোশালটা একপ্রকার জোড়তোড় করেই ধরে নিয়ে এলো। ভালো ঘুড্ডি বানাতে হলে পাখাল ভাইয়ের হাতের জুড়ি নেই। আর এসেই আমরা প্রথমে খেলাম ধমক। পাখাল ভাই প্রচন্ড গর্জে উঠে বললেন, 'কী গ্রাম্য পোলাপান তোরা! ঘুড়িকে ঘুড্ডি বলিস? ঘুড়ির মান-সম্মান সব খাবি।'
ঘুড়িকে ঘুড্ডি বলতেই আমরা আরাম পাই। তাতে তার মানসম্মান থাক ছাড়া যাক, আমাদের কিছু আসে যায় না। কিন্তু এই কথা জোর গলায় পাখাল ভাইকে আমরা বলতে পারি না। কারণ আমাদের কাজ উদ্ধার দিয়ে কথা। শব্দ ব্যবহারের প্রতিযোগীতা আমাদের কাজ না।
পাখাল ভাই বললেন, 'আমি ছিলাম পাড়ার দস্যি, হাড় ডানপিটে, কিন্তু ঘুড়ি ওড়ানোয় রাজা। আমার হাতের বানানো মাঞ্জা দেওয়া সুতোয় ওড়ানো ঘুড়ি আকাশে রীতিমতো রাজ করত।'
খোশাল খুশিতে গদগদ হয়ে জানতে চাইল, পাখাল ভাই আপনে কয়ডা ঘুড্ডি চিৎপটাং করতেন?'
এই প্রশ্ন না করাই খোশালের জন্য ভাল ছিল। যেমন আগ্রহ নিয়ে জ্বলজ্বল চোখে জিজ্ঞেস করেছে, প্রশ্ন করার পর ধমক খেয়ে মুখ পেঁচার মতো হয়ে গেল। পাখাল ভাই বিরক্ত মুখে বললেন, 'নাহ্ তোদের নিয়ে আর পারছি না। ঘুড়ি বানানো শেখানোর আগে তোদের শব্দ ব্যবহার শেখাতে হবে। ঘুড়িকে ঘুড্ডি বলবি না। ঘুড়ি।'
আমরা সবাই চুপ করে থাকলাম। শুধু রকি কটমট চোখে পাখাল ভাইয়ের দিকে তাকাচ্ছে। বেলুনের ভেতর বাতাস বেশি ঢুকলে ফেটে যায়, ভয় হচ্ছে রকির রাগ কখন জানি পাখাল ভাইয়ের ওপর ফেটে পড়ে। ধৈর্য্য ধরে ঘুড্ডি তৈরির অপেক্ষায় আছে সবাই। কখন ঘুড্ডি হবে, কখন ওড়াব, বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে- সেদিকে খেয়াল নেই। পাখাল ভাই আছেন নিজের কীর্তি নিয়ে বক্তৃতায় ব্যস্ত।
'যা বলছিলাম শোন, আমার ঘুড়ি সত্যি সত্যি রাজ করত। বিকেলের শেষে দেখা যেত, আকাশে রাজের ঘুড়ি পতপত করে একা উড়ছে। একা। চিৎপটাং হওয়ার ভয়ে কেউ আমার সাথে ঘুড়ি ওড়াত না। বুঝলি?'
রকি ত্যাদরামি সুরে বলল, 'বুঝলাম। রাজের মতো ওড়াতে গেলে আমাদের কী কী করতে হবে বলেন এবার।'
রকির মুখে 'রাজ' কথাটায় পাখাল ভাই যেন আরাম পেলেন। খুশি গলায় বললেন, রাজের মতো ঘুড়ি ওড়াতে গেলে, যা করতে হবে, সেসব ফন্দিফিকির এখন বলব তোদের। ঘুড়ি কেনার সময় অবশ্যই লম্বা যে ঘুড়ির শিরদাঁড়া কাঠিখানি, তা দেখে নিতে হবে সবার আগে। কাঠির দুই দিকের ডগা হতে হবে মাঝের অংশের তুলনায় একটু সরু। মাঝখানটা তাই বলে বেশি মোটা হলে ঘুড়ি উড়তে বেশি হাওয়া লাগবে। ব্যাপারটা মানুষের মেরুদন্ডের মতোই, তার সঙ্গে কাঠির অনুপাতের অঙ্কটা একটু করে নিস মনে মনে। আর বাঁকা যে ধনুকের মতো কাঠি, তাকে হতে হবে সরু, হালকা কিন্তু শক্তপোক্ত। ঘুড়ির ভারসাম্য সে-ই রক্ষা করবে।'
এখানে পাখাল ভাই একটু থামলেন। চিন্তিত মুখে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'হ্যাঁ রে, সরু, শক্তপোক্ত, ভারসাম্য শব্দ দিয়ে বোঝাতে গিয়ে কি একটু কঠিন করে ফেললাম? আমার আবার সস্তা শব্দ মুখে আসে না।'
শব্দের আবার সস্তা দাম বুঝলাম না। রকি ফিসফিস করে বলল, 'স্কুলে বাংলা পরীক্ষায় নকল করে ধরা খেয়েছেন। আর আমাদের কাছে বাংলায় পন্ডিতি...।' আমি রকির মুখ চেপে ধরলাম। পাখাল ভাইয়ের কানে গেলে সর্বনাশ।
পাখাল ভাই আয়েশ করার ভঙিতে বললেন, 'এবার পালা সুতা পরানোর। একে ভাবা যেতে পারে ঘুড়ির পেশি! হাওয়ায় ভাসার সময় এই সুতাই মেরুদন্ডকে সঞ্চালনা করবে। ঘুড়ির যেদিকটা মসৃণ, সেদিকে, ধনুক কাঠি আর লম্বা কাঠির ঠিক ক্রসের জায়গায় গিঁট পরিয়ে সেখান থেকে কাঠিকে দুই-তৃতীয়াংশ মাপ নিবি। প্রথম প্রথম স্কেল দিয়ে মেপে নিবি, এরপর আস্তে আস্তে চোখে দেখেই মাপ বুঝে যাবি। সেই জায়গায় পড়বে আরেকটা গিঁট। এবার এমনভাবে সুতার মাপ নিতে হবে যেন, সেই সুতার মাঝখানটা টেনে ধরলে একটা সমবাহু ত্রিভুজ তৈরি হয়। এরপর সুতার ওই বিন্দু থেকে ঈষৎ নিচে লাটাইয়ের সুতার গিঁটটা বাঁধতে হবে। ভেবে দেখ, কত অঙ্ক, বিজ্ঞান ঢুকে রয়েছে ভিতরে।'
খোশাল বলে উঠল, 'খাইছে আমারে! একটা ঘুড্ডির ভেতর এত অঙ্ক বিজ্ঞান ঢুইকা থাকলে আমরা ঘুড্ডি ওড়ামু কখন? থুক্কু ঘুড়ি!'
ঘুড়ির ওপর বিশাল বক্তৃতা দিতে পেরে পাখাল ভাইয়ের চোখ চক চক করতে থাকে। মনে হলো বালিশ এনে দিলে আনন্দে এই মাঠেই, ঘাসের ওপর ঘুমিয়ে পড়তেন।
পাখাল ভাই হাই তুলতে তুলতে বললেন, 'যা হোক, আসল কাজ শেষ। অনেক সময় সুতার ভারে ঘুড়ির ভারসাম্য নষ্ট হয়। সেজন্য কিছু টোটকাও রয়েছে। সুতার ওই মাঝখানটা ধরে মাটি থেকে তুললে যদি মাথার দিকে হেলে যায়, তবে নিচের দিকে মাপ বুঝে গিঁট মারতে হবে। তেমনই নিচে হেলে থাকলে উপরের দিকে গিঁট।'
খোশাল বলল, 'হ গিট্টু মারুম।'
'যদি ডানদিকে হেলে থাকে তবে ওই ধনুক কাঠির বামদিক বরাবর কাগজের ছোট টুকরো মুড়ে দিতে হবে, একে বলে "কানি"। কান মুড়ে দেওয়া থেকেই এসেছে এই শব্দ।'
অনেকক্ষণ পর রকি মুখ খুলল। ফিসফিস করে আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল, 'একদম বিশ্বাস করবি না। বানিয়ে বানিয়ে বলছে।'
পাখাল ভাই খোশ মেজাজে বললেন, 'তাহলে আর কী, এবার ওড়া ঘুড়ি, ওড়া আকাশে।'
খোশাল উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, 'হ ঠিক কইছেন পাখাল ভাই। একদম ঠিক কথা। আপনের কথামতো ঘুড্ডি বানাইতে পারলে আমাগো ঘুড্ডি আকাশে রাজ করব।' এরপর শব্দ ব্যবহার মনে পড়ায় জিভ কাটল। তারপর বলল, 'অনেকক্ষণ বইসা থাকতে থাকতে মাঞ্জাটা ধইরা গেছে।'
হঠাৎ যেন কোনো কিছু মনে পড়ায় পাখাল ভাই বললেন, 'কেউ যাস না। ঘুড়ির ব্যাপারে আরও কিছু বাকি আছে।'
পাখাল ভাই রহস্যময় হাসি হাসলেন। যেন গোপন কিছু বলবেন। খোশাল বসে পড়ল। 'তোরা কী ভাবছোস আমি বোকা পাখাল নাকি? মাঞ্জার কথা বলব না? কাচের গুঁড়ো লাগিয়ে কাটাকুটি, কাটাকাটির খেলা করে কত ঘুড়ি শেষ করে দিলাম। আমার ঘুড়ি নিয়ে আমি একাই রাজ করতাম আকাশে।'
রকি বলল, 'আচ্ছা পাখাল ভাই আমার কিছু প্রশ্ন আছে। মাঞ্জা শব্দটা কোথ্থেকে এসেছে?'
পাখাল ভাই সিরিয়াস ভঙিতে বললেন, 'কোমরকে কেউ কেউ অশুদ্ধ ভাষায় মাজা বলে, কেউ কেউ মাঞ্জা বলে। যেমন একটু আগে খোশাল কোমরকে মাঞ্জা বলল। মাঞ্জা শব্দটি এভাবেই এসেছে।'
'ঘুড়ি- শব্দটি কোথ্থেকে এসেছে?'
'ঘড়ি থেকে ঘুড়ি শব্দের উৎপত্তি।'
'লাটাই শব্দ কোথ্থেকে এসেছে?'
'গলায় যেই টাই পরা হয়, সেই টাই থেকে লাটাই শব্দ।'
পাখাল ভাইয়ের উত্তরগুলো শুনে আমরা আর নিজেদের ধরে রাখতে পারলাম না। বিকেল বেলায় এসেছিলাম ঘুড়ি ওড়াবার আনন্দে, ঘুড়ি ওড়ানো হলো না, কিন্তু নরম ঘাসের ওপরে খিলখিল করে হাসতে হাসতে একজন আরেকজনের উপর গড়িয়ে গেলাম গোধুলীর মাঠে।


Post a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.