অসমাপ্ত এক গল্প
মোঃ তোফায়েল হোসেন
পুরুষের প্রতি তীব্র ঘৃণা যখন রক্তের আছড়ে লেখা দেখলাম নিজেকে খুব তুচ্ছ লাগল। মনে হল একজন পুরুষ হিসেবে আমিও তো এই ঘৃণার আওতায় পড়ছি। নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করি- যেখানে একজন নারীকে আকর্ষণ করবো সেখানে কেন আমাদের প্রতি রক্তে ভেজা আঙ্গুলের স্পর্শে ‘‘ছিঃ’’ শব্দটা লিখা?
মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার একদম শেষ প্রান্তে কুরমা চা বাগান। সেই বাগানের একটা ফাঁড়ি বাগানের নাম হল কুরুঞ্জি। বাগানের শেষ সীমানায় রাজকান্দি রেঞ্জের কুরমা বিটের গহীন জঙ্গল ছুঁয়ে টিলার উপর ক্ষত বিক্ষত নির্জন এক পরিত্যক্ত ব্যবস্থাপক বাংলো কালের স্বাক্ষী হয়ে এখনো দাড়িয়ে আছে। দরজা জানালার পাল্লা কবে কোথায় হারিয়ে গেছে তা সম্ভবত চৌকাঠবিহীন ফোকড়গুলোই একমাত্র জানে। আশপাশে মাইল দু’য়েকের মধ্যে বসতি দূরে থাক লোকজনেরই অস্তিত্ব নেই। সৌভাগ্য, না র্দূভাগ্য জানি না; তবে সেখানে একদিন আমার যাওয়া হয়েছিল। অতি সাধারণ বাংলো আমার কাছে অসাধারণ হয়ে ধরা দিল। আবর্জনার স্তুপে দাড়িয়ে চারপাশে চোখ দিলে প্রকৃতির অসাধারণ খেলা মন জুড়িয়ে দেয়। পূর্বে ঘন জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়ের ঢাল শুরু- বাংলোর সীমানা নির্ধারণী ছেড়া কাঁটাতার ঘেষেই। দক্ষিণে ঢেউ উঠা বিশাল টিলাগুলো সম্পূর্ণ নেড়া। পশ্চিম আর উত্তরে যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু সবুজের ঢেউ। এক কথায় বলব- আমার মতো কেউ এখানে এলে চিরস্থায়ী হওয়ার একটা আকুল আর্তনাদ জানাবে তার মন।
বাংলোর উত্তর আঙিনায় ঘাসের মধ্যে কাঠকয়লা আর বিভিন্ন পরিত্যক্ত দ্রব্যাদি দেখেই বুঝলাম এখানে মাঝে মধ্যে লোকজন বনভোজনে আসে। এমনকি সম্প্রতি এখানে কেউ বা কারা এসেছিল যারা তাদের চিহ্ন রেখে গেছে অসীম নির্জনতায় ডুবে থাকা এই পাহাড়ী বাংলোর আঙিনায়।
দেখে মনে হল লোকজন বনভোজনে আসলে নিজেদের প্রয়োজনীয় স্থান ঝাড়-মুছ দেয়। বাংলোর দক্ষিণ-পশ্চিমের একটা রুমে ঢুকতেই শির শির অনুভূতি আমার মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল। সম্পূর্ণ মেঝে পরিস্কার করে এক কোণে সব ময়লা স্তুপ করে রাখা হয়েছে। রুমের পশ্চিম পাশের দেয়াল ঘেষে মেঝেতে দেখলাম শুকিয়ে কালো হয়ে যাওয়া বেশ কিছু রক্ত। সমস্ত বাংলোর মতো এ রুমের দেয়ালেও বিভিন্ন যোগ বিয়োগ চিহ্ন আর কালো, নীল, লাল দাগ দিয়ে আকুল প্রেম কাহিনী লেখার ব্যাকুল প্রয়াস। তবে পশ্চিম দেয়ালের একটা লেখাই আমাকে থমকে দিল। ওখানে লেখা ছিল- ‘‘আজ এই নির্জন প্রকৃতিরকূলে এসে স্রষ্টার পুরুষ নামক সৃষ্টির প্রতি নিজের রক্তে আঙুল ডুবিয়ে লিখে দিলাম, ছিঃ...’’ (কাকন)’’
কাকন নামের মেয়েটি তার নামের পরে কয়েকটা সাংকেতিক সংখ্যা লিখেছে। রক্ত আর কাকনের তীব্র ঘৃণার আস্ফালন আমাকে দিশেহারা করে দিল। আমি নোটপ্যাডে কাকনের লিখাটা হুবহু লিখে নিয়ে আসলাম।
এরপর ক্ষণিকের জন্য হলেও কাকনের সাথে আমার যোগাযোগ হয়েছিল। সে কাহিনী বলতে গেলে উপন্যাস হয়ে যাবে। আপনাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে সেদিক থেকে ফিরে আসছি শুধু এ কথা বলে- সেই কয়েকটা সাংকেতিক সংখ্যা ছিল কাকনের একটা মোবাইল নম্বর। অনেক চেষ্টার পর সেই কোডটা ভাঙতে পেরেছিলাম বিধায় জানতে পেরেছিলাম তার সেই হাহাকারময় বিমূর্ত অধ্যায়।
প্রথম যেদিন ফোন দিলাম- কাকন আমার স্পষ্ট পরিচয় জানতে চাইল। আমি সাবলীলভাবেই তাকে আমার পরিপূর্ণ ঠিকানা জানালাম। তারপর সে আমার সঠিক অবস্থান জানতে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে গেল। একসময় তার গাঢ় নিঃশ্বাস আমার কানে বাজলো। বুঝলাম তাকে আমি সন্তোষ্ট করতে পেরেছি।
কাকন ফোনের মাঝেই সবসময় ঘৃণার তীর ছুড়তো আমার প্রতি। সে বলতো- আমিও একজন পুরুষ। তবে আশার আলো ছিল সে আমার ফোন ধরতো এবং কথা বলতো। তবে খুব কম।
কাকনের সাথে যখন পঞ্চম দিন কথা বলি তখন জানতে চাইলাম সেই পরিত্যক্ত বাংলোর কথা। এর আগেও তাকে জিজ্ঞাস করেছিলাম; সে আমাকে অপেক্ষা করতে বলেছিল। কিন্তু সে ক্ষণে আবার প্রশ্নটা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ক্লিক করে লাইনটা কেটে দিল! সেই শেষ। আর যোগাযোগ করা সম্ভব হল না। কাকনের ফোন সেই থেকেই বন্ধ।
তারপর সপ্তাহখানেক পর একদিন রেজিস্টার্ড ডাকে বেনামি একটা পত্র এল আমার ঠিকানায়।
খাম খুলে দেখলাম একটা ডায়রির অসমাপ্ত দু’টি পাতার ফটোকপি। খুব অভিনব কায়দায় অবশ্য তারিখটা মুছে সেখানে কাকন নামটা লেখা হয়েছে। আমার সাথে চলুন কাকনের ডায়রিটার অসমাপ্ত পাতা দু’টি পড়ে আসি।
‘‘অনেক উল্লোসিত হয়ে বন্ধুদের সাথে হামহাম জলপ্রপাত দেখতে রওয়ানা দিয়েছিলাম। কিন্তু যখন নির্জন পাহাড়ী পথে হাটা দিলাম তখন কিছুটা যেতেই প্রচণ্ড একটা ভয় জাগল মনে। শারীরিক অক্ষমতা দেখিয়ে আমি আর ইতি বেঁকে বসলাম। আমাদের নিয়ে সোহাগ, জয় আর আরিফ ফিরে আসতে বাধ্য হল। বাকীরা চলে গেল গহীণ অরণ্যের অদূরে। জয় আর আরিফ অবশ্য এর আগেও হামহাম জলপ্রপাত দেখে গিয়েছিল। আর সোহাগ ফিরে এল একমাত্র ইতির জন্য।
কলাবন বসতিতে ফিরে আসার পর সোহাগ প্রস্তাব দিল- তার চেনা এক পরিত্যক্ত বাংলোয় গিয়ে ঘুরে আসার। যেহেতু বাকীরা ফিরে আসতে অনেক সময় লাগবে সেহেতু সবাই সানন্দে রাজি হয়ে গেলাম। দ্বিতীয় গাড়ির ড্রাইভারকে সোহাগ জানিয়ে দিল- বাকীরা ফিরে আসলে কোথায় আমাদের সাথে দেখা হবে।
ড্রাইভারসহ গাড়ি কুরুঞ্জি চা বাগানের যেখানে ত্যাগ করতে বাধ্য হলাম সেখান থেকে প্রায় পাঁচ মিনিট হাটতেই পৌঁছে গেলাম ময়লা আর ধূলা বালিতে ডুবে থাকা এক পরিত্যক্ত বাংলোয়। তবে টিলাটার উপরে পৌঁছার পরই প্রকৃতি আমাদের জন্য তার অসাধারণ সৌন্দর্য্য উন্মুক্ত করে দিল। আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখলাম সবুজ অরণ্যের ঢেউ ওঠা বিশাল অঞ্চল।
যখন বাংলোর উত্তর বারান্দা গাছের ডাল দিয়ে ঝেড়ে মুছে পরিস্কার করে বসে সাথে করে আনা হালকা নাস্তা খেয়ে শেষ করলাম তখন হঠাৎ করেই ইতি আর সোহাগ আমাদের কাছে একটু সময় চাইল। তারা একা একটু ঘুরবে দক্ষিণের নেড়া টিলাগুলোয়। আমরা সবাই তাদের সম্পর্কের কথা জানতাম বিধায় মুছকি হেসে তাদের বিদায় দিলাম।
কিছুক্ষণ পর জয় ভিতরের একটা রুমে ঢুকে গেল। মিনিটখানেক পরেই বেরিয়ে এসে বলল- সে একটা জিনিস আবিষ্কার করেছে। আমরা যদি ভিতরে যাই তবে আমরাও দেখতে পারব। আমি আগ্রহ দেখালাম। সে আমাদের নিয়ে গেল বাংলোর দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের একটা রুমে।
তারপর আর বর্ণনা করা আমার দ্বারা সম্ভব নয়। কি লিখব? কি লিখার আছে? কি লিখার থাকে তারপর? দুইটা পশু আমার কথা, অনুরোধ, যুক্তি, ভয় সব অমান্য করে আমাকে ক্ষত বিক্ষত করলো। আমার সমস্ত শক্তি দিয়েও তাদের থামাতে পারলাম না। ব্যথায় ভরে গেল মন, রক্তে ডুবে গেল শরীর, ঘৃণায় ভরে গেল অস্তিত্ব।
অথচ এই জয় ছিল আমার খালাত ভাই। আমি চেয়েছিলাম এই নির্জন বাংলোর নির্জন প্রকৃতি আর এই অরণ্যকে স্বাক্ষী রেখে তাকে আজই বলব- ভালোবাসি তোমায়। কিন্তু এখন যদি বলতে হয় কিছু তবে ‘‘ছিঃ’’ ছাড়া আর কিছুই বলার নেই।
নিজের লজ্জা নিজেই ঢেকে রেখে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলাম। সবার প্রশ্নবোধক দৃষ্টির উত্তরে বলেছিলাম- হুচট খেয়ে অনেক উঁচু থেকে পড়ে গিয়েছিলাম।
আমার মিথ্যে কথাগুলো সত্য করতে হায়েনাগুলো কি সুন্দর তাল মিলিয়ে বন্ধুত্বের অভিনয় করে গেল...।’’
কাকনের ডায়রির পাতা এতটুকুই ছিল। তবে অপর পৃষ্ঠায় আমার জন্য একটা উপদেশ দিয়েছিল কাকন। সে লিখেছিল- ‘‘মনুষত্য ঠিক রেখে নিজের মন ও দেহের ব্যাকুলতাকে অন্য মন ও দেহে নিয়ে যাও; দেখবে অনেক ফুল ফুঁটে অপেক্ষা করছে তোমার জন্য। আর যদি মনুষত্য হারিয়ে নিজের মন ও দেহের আকুলতা অন্য মন ও দেহে চাপিয়ে দাও; তবে, হে পুরুষ! ‘‘ছিঃ’’ ছাড়া আর কিছুই পাবে না’’


Post a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.