অসময়-ছোট গল্প

 অসময়

হাবীব হোসেন

বিয়ের তিন বছর পর বিথীর সাথে দেখা হওয়ার সাথে সাথেই আবির চমকে উঠলো। পলাশপুর থানার ওসি হিসেবে জয়েন করার দু'বছরে কোন আসামীকে দেখে আবির এর আগে কখনো এতোটা চমকায়নি। আবির বরফ শীতল গলায় বললো, "বিথী তোমার এমন অবস্থা কিভাবে হলো ?"

বিথীর চুল এলোমেলো। ঘাড় নিচু করে রেখেছে। আবিরের কথায় ঘাড় সামান্য ও নাড়লো না। মনে হচ্ছে বিথী কিছুই শুনতে পায়নি। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেন্ট্রি বললো, "স্যার পাগল মাইয়্যা তাই চুপ কইরা আছে। কিছু জিগাইলে ও চুপ থাকে, না জিগাইলে ও চুপ থাকে।"

আবিরের শরীরটা কেঁপে উঠলো। কাঁপা গলায় বললো, "প্লিজ বিথী বলো- এমন অদ্ভুত পরিস্থিতির সামনে তোমাকে দাঁড়াতে হলো কেন ?"

বিথীর হাতে লকার লাগানো। পাশে সেন্ট্রি হাবিবুর রহমান দাঁড়িয়ে আছে। আবির পলাশপুর থানায় ওসি হিসেবে জয়েন করার পর হাবিবুর রহমান বেশিরভাগ সময় আবিরের সাথে সাথে থাকে। ঘন কথা বলা হাবীবুরের মুদ্রা দোষ। আবির যে কোন প্রশ্ন করার সাথেই তার মুখ চলতেই থাকে। ধমক দেওয়া আগ পর্যন্ত মুখ বন্ধ হয় না। হাবীবুর তাচ্ছিল্যর ভঙ্গিতে বললো, "বললাম না স্যার এইটা পাগল মাইয়্যা, যতোই প্রশ্ন করেন লাভ হইবো না। এই মাইয়্যা মুখ খুলবে না।"

আবির নিজকে স্থির রাখার চেষ্টা করলো। জানার আগ্রহ আবিরকে মুহূর্তের মধ্যেই অস্থির করে তুলেছে। আবির দ্রুত গলায় বললো, "বিথীকে আমাদের থানায় নিয়ে এসেছ কেন ?" 

"স্যার দেহি মাইয়্যার নাম ও জানেন। এতোক্ষণ তো খেয়াল করি নাই। কারণটা হলো, মাইয়্যাটারে সেন্ট্রাল জেল থেকে আমাদের পলাশপুর থানার হাজতে পাঠিয়েছে তিন বছরের জন্য। তিন বছর পর মাইয়্যাটা মুক্তি পাবে। স্যার বুঝেনই তো, খুনের আসামীদের কেউ রাখতে চায় না। এই হাজত থেকে ওই হাজতে ট্রান্সফার করে দেয়।" 

আবির চুপ করে রইলো। প্রচন্ড মাথা ব্যাথা আর অস্থিরতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে চেয়ার টেনে বসলো। বিথী সহ আরো কয়েকটা মেয়েকে হাজতের মহিলা সেকশনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যাদের সবাইকে কিছুক্ষণ আগেই গাড়িতে করে সেন্ট্রাল জেল থেকে ট্রান্সফার করা হয়েছে।

গভীর রাত, পাশে আবিরের স্ত্রী ঘুমিয়ে আছে। হঠাৎ বিথীর কথা মনে পরতেই আবিরের ঘুম ভেঙ্গে গেলো। আবিরের মনে পড়লো সেই দিনগুলো কথা, যখন বিথীর সাথে কথার বলার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা বাসার নিচে অপেক্ষা করেছে। তখন আবিরের একটাই চাওয়া ছিল, বিথীকে নিজের করে পাওয়া। সর্বশেষ যেদিন বিথীর বিয়ে হয়ে যায় তখন আবির মনে মনে বলেছিল - পুরো একজীবনে যেনো বিথীর সাথে আর একবার হলে ও দেখা হয়। 

হাবীবুরকে পাঠানো হয়েছিল বিথী সম্পর্কে বিস্তারিত সকল তথ্য জেনে আসার জন্য। বিথীর শাহবাগের বাড়ি থেকে বিস্তারিত সব তথ্য নিয়ে দু'দিন পর হাবীবুর থানায় ফিরে আসলো।  আবিরের কাছে এসে হাবীবুর উৎকণ্ঠা গলায়  বললো, "স্যার আপনার বাড়ি কুমিল্লায় আর মাইয়্যাটার বাড়ি শাহবাগ হওয়ার পরে ও আপনি মাইয়্যাটাকে কিভাবে চিনেন ?"

আবির নরম গলায় বললো, "ঢাকা ভার্সিটিতে পড়া অবস্থায় আমি তাদের বাসায় টিউটরিং করাতাম। বিথীর ছোট ভাইকে পড়াতে গিয়ে বিথীকে ভালো লাগে। সেই ভালোলাগা আমাকে প্রচন্ড দুর্বল করে দিয়েছিল। অন্যান্য রিলেশনে  ভালোলাগা থেকে ভালবাসার শুরুটা হয়, কিন্তু আমি শুরু করতে পারিনি। এর আগেই আমাকে মিথ্যা অভিযোগের কারণে টিউশনীটা ছেড়ে দিতে হলো।"

হাবীবুর করুন গলায় বললো, যতোটুকু জানতে পেরেছি মেয়েটা বিয়ের ছ'মাসের মাথায় তার স্বামীকে খুন করে। খুন করার কারণ অব্যশি কেউ বলতে পারেনি।

আবির চেয়ার থেকে উঠে দৌড়ে বিথীর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। বিথী এলোমেলো চুলের ফাক দিয়ে আবিরের দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এই কাঠিন্যর ভেতরেই এক অদ্ভুত মায়া ফুটে রয়েছে। যে মায়ার রুপ  ভালবাসার মানুষ ছাড়া কেউ ধরতে পারবে না।

0/Post a Comment/Comments

Please do not enter any spam link in the comment box.

Stay connected

FACEBOOK- Fans Like
TWITTER- Followers Follow
YOUTUBE- Subscribers Subscribe

Subscribe us

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner