কৃপণের বিপদ-রম্য গল্প

 কৃপণের বিপদ

জুয়েল আশরাফ

পরিবার এবং আত্মীয়স্বজনের মধ্যে সফিকের মতো কৃপণ ব্যক্তি দ্বিতীয় কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তিন বছর পর দেশে ফিরেছে। একেবারেই খালি হাত, স্যুটকেস কিংবা ট্রলি জাতীয় কোনো ব্যাগ সঙ্গে আনেনি।
     আত্মীয়স্বজনরা জিজ্ঞেস করল, ও সফিক, বউ মেয়ের জন্য কী কী আনলা?
     সফিক নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল, বিদেশ থেকে জিনিস এনে কী লাভ? আমাদের দেশের জিনিসই বিদেশ যায়। তারপর স্টিকার লাগায় মেইড ইন অমুক দেশ, তমুক দেশ।
     আজ থেকে তিন বছর আগে স্ত্রী আর এক বছরের মেয়েকে রেখে সফিক জাপান গিয়েছিল। মেয়ে এখন কত বড় হয়েছে! খুশিতে আত্মহারা সফিক মেয়েকে কোলে নিতেই মেয়ে দিল ঠাস করে গালে থাপ্পড়। হতভম্ব সফিক গাল ধরে স্ত্রীর দিকে ফ্যাল ফ্যাল চোখে তাকায়।
     লিলি বলল, তোমাকে কোনোদিন দেখেনি। হঠাৎ কোলে নিয়েছো তাই বিরক্ত হয়েছে। অনু পুরুষমানুষ পছন্দ করে না। দুদিন পরই ঠিক হয়ে যাবে। অনু, ইনি তোমার বাবা। বাবাকে থাপ্পড় মারে কেউ?
     মেয়ে অনু তার মায়ের পেছনে দাঁড়িয়ে সফিকের দিকে তাকাচ্ছে। সফিক ব্যথিত হলো। মেয়ে তাকে চিনতে পারছে না। অবশ্য দোষ তারই। এই না-চেনার পেছনে তিনিই দায়ী। ইন্টারনেট যুগে ভিডিওকলে পরিবারের সবার চেহারা দেখে কথা বলার মতো সহজ মাধ্যমকেও সে এড়িয়ে গেছে। লিলি কতবার বলেছে কৃপণতা ছেড়ে একটি ভালো মোবাইল কিনে মেয়ের মুখটা দেখো। কিন্তু সফিক মেবাইল কিনেনি। এনড্রয়েড মোবাইল কিনে মেয়ের মুখ দেখা দূরে থাক, বরং বিশেষজ্ঞ ভঙ্গিতে মোবাইল থেকে যে রশ্মি বের হয়, চোখের জন্য ক্ষতিকর দিক বিশ্লেষণ করে গেছে।
     সারা দিন চলে গেল মেয়ে একটি বারের জন্য কাছে এলো না। শুধু দূর থেকে তাকিয়ে দেখল, আর মাঝে মাঝে দৃষ্টিতে বিরক্ত ভঙ্গি প্রকাশ করল। সফিক মেয়ের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট পড়ল- 'অচেনা লোক বাড়ির ভেতর ঢোকায় সে খুব বিরক্ত।'
     রাতে শোবার সময় একটা ছোট্ট ঘটনা ঘটে গেল। সফিক এর জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলো না। অনু ঘুমিয়েই ছিল। ঘরের ভেতর হালকা হলুদ আলো জ্বলছে। আবছা সেই আলোতে মেয়ের ঘুমন্ত মুখ দেখা যায়। বহু দিন পর স্ত্রীকে কাছে পেয়ে প্রেম ভালোবাসায় ডুব দিলো সফিক। আচমকা কার পায়ের লাথি খেয়ে স্ত্রীর ওপর থেকে ছিটকে বিছানা থেকে গড়িয়ে গেল মেঝেতে। তাকিয়ে দেখে, নিজেরই মেয়ের লাথি খেয়ে খাট থেকে পড়ে গেছে।
     অনু কান্না জড়ানো গলায় বলল, ওই লোকটা আমার আম্মুকে মারছে কেন?
     এই কথায় লিলি হাসিতে ফেটে পড়ল। তার হাসির কারণে খাট কেঁপে কেঁপে উঠছে। সে মুখে হাত চাপা দিয়ে হাসি থামাতে চেষ্টা করছে। 
     সফিক মেঝে থেকে উঠে আর দাঁড়ায়নি। হতভম্ব আর বিচলিত হয়ে বসে থাকল। মেয়ের আচরণ যদি প্রাত্যহিক এই ধারায় চলতে থাকে তাহলে খুব শীঘ্রই তাকে বিদেশ ফিরে যেতে হতে পারে!

0/Post a Comment/Comments

Please do not enter any spam link in the comment box.

Stay connected

FACEBOOK- Fans Like
TWITTER- Followers Follow
YOUTUBE- Subscribers Subscribe

Subscribe us

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner