বর্ষা এলেই ভূতটা আসে
জুয়েল আশরাফ
এক ছিল আপন ভোলা ছোট্ট ভূত, নাম তার ভুতু। বর্ষাকাল হলেই আর পাঁচটা ভূতের মতো সে গ্রাম অথবা শহরে লোকজনকে ভয় দেখাতে যেত না। বৃষ্টি আর অন্ধকার নেমে এলে বাতাসে ভেসে বেড়াতে বেড়াতে চলে যেত অনেক দূরে মাঠের ধারে, ঝোপে জঙ্গলে। কখনো মানুষ দেখলে ভয় পেয়ে অদৃশ্য হয়ে যেত চুপটি করে। অন্য ভূতগুলো তাকে 'গাধা ভূত' বলত। কেউ কেউ বলত ভীতুর ডিমের ভূত। অন্য ভূতগুলো মানুষকে ভয় দেখিয়ে মজা পেত, তখন ভুতু মন খারাপ নিয়ে বটগাছে বসে থাকত।
জান্নাতদের গ্রামে মাঠের পাশে এক ঝাঁকড়া বটগাছ। গাছের সবুজ হলুদ পাতাগুলো হয়ে উঠেছে নিকষ কালো। একশ বছর আগের ঝুরিগুলো নেমে আসে কোনো চুলের মতো, আর শাখাগুলো হয়ে ওঠে লম্বা নখের খেটে খাওয়া হাড় জিরজিরে হাতের মতো। ঠিক সেদিন বটগাছে চুপটি করে ঘাপটি মেরে আছে ভুতু। আষাঢ়, শ্রাবণের ভরা বর্ষায় ওই গাছের নিচ দিয়ে লোকজন চুপচুপে ভিজে বাড়ি ফিরে। টানা তিনদিনের বৃষ্টিতে ভুতুটা বটগাছে অপেক্ষা করছে। লোকদের সঙ্গে গ্রামে যাবে। ভুতুটা আবার বর্ষাকালে একা চলতে ভয় পায়। তবু প্রতি বছর বর্ষাকাল এলেই এই গ্রামে আসে। গ্রামে জান্নাতের সঙ্গে তার খাতির। মেয়েটি খুব ভালো। তাকে আবৃত্তি শেখায়। ভূত-সমাজে গিয়ে সেই আবৃত্তি শোনায় ভুতু। ভূতের সর্দার গত বছর তাকে কবি-ভূত উপাধি দিয়েছে। এ বছর আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় ভালো আবৃত্তি করতে পারলে, তাকে শ্রেষ্ঠ ভূত-কবিতে ভূষিত করবে। শুধু একটা শর্ত, গ্রামের কোনো মানুষকে ভয় দেখানো যাবে না- এমন শর্তেই মেয়েটি আবৃত্তি শেখাতে রাজি হয়েছে। অবশ্য ভুতু এমনিতে কাউকে ভয় দেখায় না, সে নিজেই ভয় পায় মানুষ দেখলে। শুধু জান্নাতকে তার ভয় নেই। আর তার বাবাকে।
আজ জান্নাত গলা ছেড়ে বলল, 'ভুতু এলো ভয় হলো দূর, রিমঝিম বৃষ্টিতে বাজে পায়ের নূপুর।' ভুতু তার সাথে গলা মিলিয়ে বলল। একবার, দুইবার, বারবার। পড়ার সুরে বলল। আবৃত্তির ঢংয়ে বলল। ভুতুড়ে আওয়াজে বলল।
ইদানীং আলাউদ্দিন সাহেব লক্ষ্য করছেন জান্নাত একা ঘরে কার সঙ্গে যেন কথা বলে। কোনো কথা বললেই নাকে সুর করে বলবে। তার এই অভ্যাস বর্ষাকাল এলেই শুরু হয়। বর্ষাকাল মানেই ঘরে অদৃশ্য কারোর আগমন। আলাউদ্দিন সাহেব জানেন, পাশের ঘরে জান্নাত একা না, তার সঙ্গে কেউ একজন রয়েছে।
আলাউদ্দিন সাহেব হলেন জান্নাতের বাবা। ভূতে তার ভীষণ ভয়। তাই সবসময় তার হাতে থাকে একটি লোহাদণ্ড। লোহা জাতীয় কিছু সঙ্গে থাকলে ভূত আসে না, কথাটা ছোটবেলায় দাদির মুখে শুনেছেন। তার খুব ইচ্ছে করছে, জান্নাতকে ডেকে একটি লোহাদণ্ড হাতে ধরিয়ে দিতে। মেয়ে ভূতকে আবৃত্তি শেখাচ্ছে, তিনি চুপ করে থাকবেন, তা হয় না। জান্নাতের কাছ থেকে ভূতটাকে সরানো দরকার। বাড়িতে ভূতের বসবাস বরদাস্ত করতে পারছেন না।
আলাউদ্দিন সাহেব লোহাদণ্ড শক্ত হাতে ধরে রেখেছেন। করোনাকাল চলছে। অনেকদিন ধরে মেয়ের স্কুল বন্ধ। বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে দেখা নেই। দিনরাত ঘরের ভেতর একপ্রকার বন্দি। দীর্ঘ সময় কোনো মানুষ বন্দি থাকলে সেই মানুষের পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক। জান্নাত তো ছোট মানুষ। এই বয়সে বাইরে ঘুরে বেড়াতে চাইবে। খেলাধুলা করতে চাইবে। বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে চায় মন। দেশের পরিস্থিতি এখন এমন সব ছেলেমেয়ের সারাক্ষণ ঘরে থাকা লাগছে। ঘরে থাকতে থাকতে মন-মানসিকতা এলোমেলো হয়ে গেছে। হয়তো এ কারণেই জান্নাত ভূতকে আবৃত্তি শেখাচ্ছে। তিনি মেয়েকে ডাকলেন, জান্নাত এদিকে আয় তো মা।
জান্নাত এসে বাবার পাশে বসল। তিনি আনন্দ পাওয়া গলায় বললেন, এতক্ষণ কাকে আবৃত্তি শেখাচ্ছিলি?
জান্নাত বলল, ভুতুকে আবৃত্তি শেখাচ্ছি বাবা।
আলাউদ্দিন সাহেব ভুরু কুঁচকে বললেন, ভুতুটা কে?
জান্নাত বলল, ভূত। প্রতি বর্ষায় আমার কাছে আবৃত্তি শিখতে আসে।
বাবা বললেন, একটা ভূত তোর কাছে আবৃত্তি শিখতে আসে?
জান্নাত উপড়ে-নিচে মাথা নাড়ল। অর্থাৎ হ্যাঁ। তারপর বলল, কিছুদিন পর ভুতুদের কবিতা আবৃত্তির প্রতিযোগিতা হবে। সেই প্রতিযোগিতায় ভুতু অংশ নেবে।
আলাউদ্দিন সাহেব মেয়ের দিকে তাকিয়ে হতাশ গলায় বললেন, ভূতেরও কবিতা আবৃত্তি শেখা লাগে?
জান্নাত বলল, প্রতিযোগিতায় ভালো আবৃত্তি করতে পারলে সেরা কবি উপাধি পাবে ভুতু। তোমার সঙ্গে ভুতুর পরিচয় করিয়ে দিই। ডাকি ভুতুকে।
আলাউদ্দিন সাহেব বলে উঠলেন, না না, ডাকা লাগবে না। তুই শেখাচ্ছিস শেখা। আমি পরিচিত হয়ে কী করবো!
কিন্তু ভুতুকে ডাকতে হলো না। সে এসে হাজির। মড়মড় শব্দে খাট নড়েচড়ে উঠল। কোনো শিশু লাফিয়ে যেভাবে খাটে বসে, সেভাবে ধপাস করে বসা কারোর অস্তিত্ব টের পেলেন আলাউদ্দিন সাহেব। তারপরই জ্ঞান হারালেন।
দিন পনেরো পরের ঘটনা। জান্নাতের বারান্দা ঘেঁষে ছোট্ট পড়ার ঘর। সেই ঘরে একটা খাট পেতে রাখা আছে। বেশিরভাগ রাতেই সে ওই ঘরে ঘুমায়। বারান্দায় অনেকগুলো ফুলের টব। বিদেশি ফুলগাছ সবচেয়ে বেশি। দুটো বেলি ফুলের টব জানালা বরাবর চেয়ারের ওপর রাখা। রাতে ঘরের ভেতর ঢুকলে গন্ধ টের পাওয়া যায়। আজকাল মেয়ের ঘরে আলাউদ্দিন সাহেব খুব কমই আসা-যাওয়া করেন। তার ভয় হচ্ছে, ভুতু নামক ভূতটা ঘরের কোনোখানে অদৃশ্য হয়ে আছে।
জান্নাতের মুখে সেদিন শুনলেন, ভুতু প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে। সে এখন ভূত-সমাজের শ্রেষ্ঠ কবি। জান্নাত আরো বলল- 'ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না' কবির এই কথাটা ঠিক না, কিছু কিছু ফুলের গন্ধ ঘুম পাড়াতে সাহায্য করে। আর সেটি হচ্ছে জুঁই কিংবা বেলি জাতীয় ফুল। ঘুমের যে কোনো ওষুধ যেভাবে কাজ করে, জুঁই কিংবা বেলি ফুলের সুগন্ধও একইভাবে স্নায়ুতে এনে দেয় প্রশান্তি, যা ঘুম আনতে সাহায্য করে।
আলাউদ্দিন সাহেব মেয়ের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে বললেন, এই কথা তুই কার কাছ থেকে শিখলি?
জান্নাত বলল, ভুতু আমাকে বলেছে। ভুতু এখন অনেক বড় কবি।
আলাউদ্দিন সাহেব কথা গিলছেন। ভুতুটা যে নিজের ভেতরে বিজ্ঞানীদের মতো সুপ্ত প্রতিভা লুকিয়ে রেখেছে, এতদিন জানতেন না। সেদিনই জানলেন। জেনে বিস্মিত হলেন।
বাবাকে হাঁ করে তাকিয়ে মনোযোগের সঙ্গে কথা শুনতে দেখে, জান্নাত আরো বলল, ভুতু বলেছে তোমার বাবা আমার ভয়ে রাতে ঘুমাতে পারে না। তাকে বলো ফুলের গন্ধ নিতে। শ্বাস নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুলের সুগন্ধ ফুসফুস থেকে রক্তে যাবে এবং সেখান থেকে পরবর্তী সময়ে মস্তিষ্কে প্রবেশ করবে। আর মস্তিষ্কে প্রবেশের পর এই সুগন্ধ প্রশান্তি এনে চোখে সহজেই ঘুম নিয়ে আসবে। আজ রাতে ভুতু তোমার বালিশের পাশে বেলিফুলের একটা টব এনে রাখবে।
কথা শেষ করেই জান্নাত উঠে চলে গেল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে এলো। জান্নাতের পেছনে একটি ফুলের টব শূণ্যে ভেসে এগিয়ে আসতে দেখলেন আলাউদ্দিন সাহেব। অমনি তিনি জ্ঞান হারিয়ে ধপাস পড়ে গেলেন বিছানায়!


Post a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.