ভূত ধরার ফর্মূলা-শিশুতোষ

 ভূত ধরার ফর্মূলা

জুয়েল আশরাফ 


ঘুম থেকে উঠেই পাখাল ভাই ঘোষণা করল, আমি ভূত ধরার ফর্মূলা আবিস্কার করেছি। 
শুনেই আমরা ছোটরা 'থ' বনে গেলাম। এখন বর্ষাকাল। চারদিকে অথৈ পানি। ডোবা, নালা, খাল, বিলে পানির সাথে এসেছে কৈ টেংরা পুঁটি শিং মাগুর সহ কত্ত কত্ত মাছ! বরশির টোন ছাড়াই কীভাবে মাছ ধরা যাবে, পানির সব মাছ জালে উঠবে- এই ফর্মূলা আবিস্কার না করে তিনি ভূত ধরার ফর্মূলা নিয়ে বসেছেন।
পাখাল ভাইকে আমরা চিনি জন্মের পর থেকে। গাছের পাতা হাল্কা বাতাসে নড়ে উঠলেই ভয়ে দৌঁড়ে পালাবেন। দেখাদেখি কিছু না বুঝে আমরাও তার পিছু দৌঁড়ই। কোনো কিছুর ছায়া দেখতে পেলেই হুটহাট চমকে উঠেন। সন্ধ্যার পর যতবার বাথরুমে যাবেন দাদিকে দরজার বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখেন। কোনো ভুতুড়ে গল্প শোনার পর এই ভাদ্র মাসের তাল পাকা গরমেও তিনি কম্বল জড়িয়ে ভয়ে গুটিশুটি মেরে শুয়ে থাকেন। এমন ভীতু ছেলে ভূত ধরার ফর্মূলা আবিস্কার করেছে, বিশ্বাস করতে পারছি না।
গত বছর পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে এসেছে- 'তোমার জীবনের ভয়ের একটি ঘটনা উল্লেখ করো'। পাখাল ভাই পরীক্ষার খাতায় কী লিখে এসেছেন জানি না। রেজাল্টের দিন ফলাফল শূণ্য। পাখাল ভাই উদাস গলায় বলল, 'ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছি না। পরীক্ষা তো ভালই দিয়ে ছিলাম। যিনি খাতা দেখেছেন তিনি বোধহয় ভূত ভয় পান। আমার ভুতুরে লেখাগুলো পড়ে বুঝতে পারেননি।'
ভয়ের রচনায় পেলেন ফেইল নম্বর। এই লোক যদি ভূত ধরার গবেষণায় নামে তাহলে ভূত-সমাজ কী যে লজ্জিত হবে মনে করতেই আমার ফিক করে হাসি পেলো।
পাখাল ভাই বিরক্ত হয়ে বলল, এই হাসি ধরে রাখিস। আমার আবিস্কারের ফর্মূলা দিয়ে যখন দু'একটা মামদো ভূত ধরবো তখন দৌঁড়ে পালিয়ে যাস না।
আমরা বললাম, পাখাল ভাই, বর্ষাকাল তো প্রায়ই শেষ, এখন ভূতের আনাগোনা নেই। সামনের বর্ষায় গবেষণা করবেন, বর্ষায় একটা উৎসব থাকে ভূতের।
পাখাল ভাই আমাদের জ্ঞান দিয়ে বললেন, যারা ভূত ভয় করে তাদের জন্য আমার ফর্মূলা না, আমার ফর্মূলা তাদের জন্য যারা সাহসী দলের।
আমরা সবাই পাখাল ভাইয়ের সাহসের উন্নতি দেখে চমৎকৃত হলাম। কিন্তু তিনি কিরকম ফর্মূলা আবিস্কার করেছেন জানার আগ্রহে প্রশ্ন করি।
পাখাল ভাই গবেষক হাসি হাসেন। যেন কোনো রহস্য লুকিয়েছেন হাসির আড়ালে। 
পনেরো দিন পর, একদিন বিকেলে পাখাল ভাই আমাদের সবাইকে মাঠে ডেকে সমবেত করলেন। শুরুতেই একটি ছোট্ট বত্তব্য দিলেন- প্রিয় ছোট্ট ভাইয়েরা, তোমরা জেনে আনন্দিত হবে আমি এখন ফর্মূলা দিয়ে ভূত ধরার গবেষণায় ব্যস্ত সময় পার করছি। ইদানিং ভূতগুলো মানুষকে ভয় দেখাচ্ছে না, কারণ তারা নিজেরাই আমার বানানো ফর্মূলার ভয়ে ভীত। ভূতদের সময়টা খারাপ যাচ্ছে। আমার এই ছোট্ট ফর্মূলা দিয়ে মেছোভূত গেছোভূত মামদোভূত ধরার চেষ্টা চলছে। খুব শীঘ্রই এদেরকে ধরে তোমাদের সামনে হাজির করব। ভূত ধরে গিনিশ বুকে নাম করতে পারব না, তবে পাড়ার নাম রওশন করব একদিন। আমার ফর্মূলা দিয়ে আজ আমি একটি মামদো ভূতের ছানা ধরে ফেলেছি। সেই আনন্দে তোমাদের সবাইকে ভোম্বলের দোকানের চটপটি খাওয়াব।
আমরা সবাই খুশিতে গদ গদ হয়ে হাতে তালি বাজালাম। পাখাল ভাইয়ের জয় হোক ধ্বনি তুললাম। ভোম্বলের দোকানের চটপটি খাওয়া শেষে সবাই বিদায় নিয়ে চলে গেল। আমি আর পাখাল ভাই সন্ধ্যার নির্জন রাস্তা ধরে বাড়ির দিকে হাঁটটছি। আমাদের দু'জনের বাড়ি কাছাকাছি। পাখাল ভাই আমার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছেন। তার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো অজানা ভয়ে তিনি ভীষণ ভীত আছেন। আমি বললাম, ভূতের ছানা তো ধরলেন আমাদের কবে দেখাবেন পাখাল ভাই?
পাখাল ভাই কাঁপা গলায় বললেন, কথা বলিস না। চুপচাপ হাঁট। এই রাস্তাটা ভালো না। সন্ধ্যা হলেই ওরা সব রাস্তায় নেমে আসে।
কারা?
প্রশ্ন করে জবাব পেলাম না। শুধু তাকিয়ে দেখলাম পাখাল ভাইয়ের মুখ ভয়ে রক্তশূণ্য দেখাচ্ছে।
দশ দিন চলে যাওয়ার পরও আমরা ভূত টুত দেখতে পেলাম না। একদিন পাখাল ভাইকে বললাম, দেরি সহ্য হয় না। কোনোদিন ভূত দেখিনি, ভূত দেখব আশায় রয়েছি।
পাখাল ভাই স্কুলের হেন্টু স্যারের মতো মুখ বিকৃতি করল। বলল, একটু সবুর কর। সবুরের বৃক্ষ তিক্ত কিন্তু ফল অতি চমকদায়ক।
গুণীজনদের বাণী আওড়াতে পেরে পাখাল ভাইকে বেশ আরাম পেতে দেখা গেল। সবুরে আমাদের সমস্যা নেই, ফর্মূলা দিয়ে নতুন নতুন ভূত ধরা হলেই পাখাল ভাই আমাদের দুদিন পর পরই ভোম্বলের দোকানের চটপটি খাওয়াচ্ছেন। আমাদের দিন ভালই যাচ্ছে। পাখাল ভাই কোথায় ভূত ধরে চলেছে, ভূত ধরে বোতলে না কোথায় রাখছে, ফর্মূলা দেখতে কেমন এসব জানার আগ্রহ নিয়ে আমরা তিনমাস অতিক্রম করলাম। এই তিনমাসেও কিছুই জানা গেল না। তাই বলে আমাদের চটপটি খাওয়া বন্ধ নেই। সবই চলছে ঠিকঠাক। শুধু পাখাল ভাইয়ের ভূত ধরার ফর্মূলা দেখতে পেলাম না।
পাঁচ মাস পর আমাদের সবুরের বাঁধ গেলভেঙে। বছরের অর্ধেক চলে যাচ্ছে কিন্তু ফর্মূলা বা ভূত দেখার নামগন্ধ নেই, আমরা সবাই পাখাল ভাইকে ধরলাম। আমাদের বলতেই হবে ঘটনা কী। 
পাখাল ভাই আমাদের আশ্বস্ত করার উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখলেন- মহল্লার প্রিয় ভাইয়েরা আমার, তোমরা নিশ্চিত জেনে এসেছো বহুদিন ধরেই আমার ফর্মূলার কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। ভূতপেত্নী, ঝেঁওপেত্নী, দেওপেত্নী ধরার ফর্মূলা নিয়ে কাজ করছি আমি। তোমরা পূর্ব থেকেই অবগত আমি একজন ভূত বিশেষজ্ঞ। তোমরা জেনে আরও আনন্দিত হবে ভূত-সমাজের যাদুঘরে আমার ফর্মূলা নেওয়ার জন্য ভূতের সর্দারের সাথে আমার একটি গোপন বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে আমি দশ লাখ টাকার বিনিময়ে ফর্মূলা দেওয়ার জন্য চুক্তিপত্রে সই করেছি। তাই তোমাদের জন্য আজীবন ভোম্বলের দোকানের চটপটি ফ্রি!
এত বড় আনন্দের খবর অার আমরা কিছুই জানি না। পাখাল ভাইয়ের ফর্মূলা ভূতেদের যাদুঘরে রাখা হবে! দশ লাখ টাকার চটপটি খেতে পারবো আমরা! আনন্দে সবাই জোড়ে হাতে তালি বাজালাম।
পাখাল ভাই বলল, আর কিছুদিন অপেক্ষা কর। ভূতদের দৈনিক পত্রিকায় আমার ছবিসহ নাম ছাপা হবে, ভূতেরা আমার সম্পর্কে জানবে। আমি ভূত ধরার কতো বড় ওস্তাদ টের পাবে।
এত বড় প্রাপ্তি, অপেক্ষা তো করতেই হয়। বছর শেষ হয়ে এলো। ভূতদের পত্রিকা, ফর্মূল, যাদুঘর কিছু জানা গেল না। 
একদিন সবাই মিলে পাখাল ভাইয়ের বাসায় গিয়ে দেখি তিনি বিছানায় কাথা জড়িয়ে শুয়ে আছেন।দাদি মাথায় পানির পট্টি ধরে রেখেছেন। আমাদের দেখে একগাল হাসলেন। আমি বললাম, কী হয়েছে পাখাল ভাইয়ের?
দাদী বলল, আমার সাদা শাড়িটা ছাদে শুকাতে দিয়ে ছিলাম। বাতাসে উড়ে এসে পাখালের জানালায় আটকে যায়। সাদা শাড়ি দেখে ভূতটুত ভেবে ভয়ে অস্থির। জ্ঞান হারিয়েছিল, শরীরে জ্বর। ভূতটার শরীরে জ্বর এখন।
বলতে বলতে দাদি খিল খিল করে হেসে উঠলেন। আমরাও হেসে উঠি একসাথে। শুধু পাখাল ভাই চোখে মেলে বোকার মতোন তাকিয়ে থাকলেন।

0/Post a Comment/Comments

Please do not enter any spam link in the comment box.

Stay connected

FACEBOOK- Fans Like
TWITTER- Followers Follow
YOUTUBE- Subscribers Subscribe

Subscribe us

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner