পরীর দেশের যাদুর ফুল
জুয়েল আশরাফ
অনেক আগের কথা। দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ প্রদেশে এক বিশাল জঙ্গল ছিল। সেই জঙ্গলের পাশে রুবামানী নামে একটি মেয়ে থাকত। বাবা মায়ের অনেক আদরের ছিল সে। কিন্তু সে দেখতে এত অসুন্দর ছিল যে, দিন-দুপুরে লোকজন তাকে দেখলে ভয়ে জ্ঞান হারাত। দেশের রাজা সিদ্ধান্ত নিল রুবামানীকে এই দেশে আর থাকতে দেবে না। তাকে জঙ্গলের দিকে তাড়িয়ে দেয়া হলো। রুবামানী মনের দুঃখে একা জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়, গাছের ফলমূল খায়, আর রাত হলে কোনো বড় গাছের নিচে ঘুমায়। একদিন রাতের ঘটনা- রুবামানী ঘুমিয়ে আছে, হঠাৎ তার কানের কাছে শব্দ এলো- 'আমাকে মুক্ত করে দাও'। সে চারদিক খুঁজতে থাকে। গাছের শেকড়ের কাছে একটা কাঁচের বোতল পেল। সেই বোতলের ভেতর একটি মেয়ের চিৎকার- 'আমাকে মুক্ত করে দাও, মুক্ত করে দাও।' রুবামানী ভীত আর অবাক হয়, ছোট্র একটি বোতলের ভেতর মানুষের চিৎকার! সে বোতলটাকে আছড়ে ভাঙল। ঠিক তখনই অবাক ব্যাপার, চারদিক আলোকিত হয়ে উঠার সাথে সাথেই অপূর্ব সুন্দর একটি মেয়ে ডানা ঝাপটে বেরিয়ে এলো। এমন ডানাওয়ালা সুন্দর মেয়ে রুবামানী জীবনে দেখেনি! সে জ্ঞান হারাল। তার জ্ঞান ফিরল পরেরদিন দুপুরে। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে সুন্দর মেয়েটি তার মাথার পাশে বসে আছে। মেয়েটি বলল, 'ভয় পেও না। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না।'
রুবামানী সাহস করে বলল, 'কে তুমি? তোমার ঘটনা কী? বোতলে কীভাবে এলে?'
সুন্দর মেয়েটি বলল, 'আমি একজন পরী। বনে বেড়াতে এসেছি। এক দুষ্টু যাদুকর যাদুর সাহায্যে আমাকে বন্দি করে এই জঙ্গলে ফেলে রাখে। আজ তোমার কারণে মুক্তি পেলাম। কিন্তু তুমি এই জঙ্গলে কেন? তোমার কী ঘটনা?'
রুবামানীও নিজের সমস্ত কিছু বলল পরীকে। সব শুনে পরী বলল, 'চলো তোমার উপায় বের করি। তোমাকে জঙ্গলে পড়ে থাকার চেয়ে মানব সমাজে ফিরে যাওয়া ভাল।'
রুবামানী বলল, 'যদি গ্রামবাসী আমাকে দেখে আর জীবিত ছাড়বে না, মেরে জঙ্গলে ফেলে রাখবে। সুখে দুঃখে যে কদিন বাঁচি, জঙ্গলেই থাকব।'
পরী বলল, 'ভয় পেও না। এই জঙ্গলের সবকিছু আমার জানা। হিল হিল কুনর আমার ভাই। সে নিশ্চয়ই তোমাকে সাহায্য করবে। সূর্য ডোবার আগেই তার কাছে যেতে হবে।'
হিল হিল কুনর থাকে নদীর ধারের পাহাড়ের পাদদেশে ঝর্নার কাছে, একটি জরাজীর্ণ গুহার ভিতরে। সূর্য ডোবা থেকে পরের দিন সূর্যাস্ত পর্যন্ত কারোর সাথে কথা বলে না। তার বয়স তিনশ চল্লিশ বছর। তারা দুজন যখন জঙ্গলের পথ দিয়ে নদীর ধারে এসে পৌছল সেই সময় সূর্য ডুবি ডুবি করছে। গুহার কাছে যেতেই গুহার মুখ আপনা-আপনি বন্ধ হয়ে গেল।
পরী বলল, 'আমাদের ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সূর্য ডোবার সাথে গুহার মুখও গেছে বন্ধ হয়ে।'
পরের দিন সূর্য উঠার সাথে সাথেই গুহার মুখ খুলে গেল। দুজনেই ভেতরে ঢুকে দেখল হিল হিল কুনর চোখ বন্ধ রেখে ধ্যানে মগ্ন। চোখ বন্ধ রেখেই সে বলল, 'স্বাগতম কেপ প্রদেশের মানুষ, স্বাগতম।'
রুবামানী অবাক হলো, পরীর দেশের সবাই তার সম্পর্কে সব জানে! পরী বলল, 'রুবামানীকে নিজের দেশে থাকার ব্যবস্থা করে দাও।'
হিল হিল কুনর একটি ফুল হাতে দিয়ে বলল, 'এই ফুলের ঘ্রাণ নাও।'
রুবামানী ফুলের ঘ্রাণ নিল। এরপর তার সামনে পরী একটি আয়না মেলে ধরল। আয়নায় তাকিয়ে রুবামানী অবাক, তার চেহারা আগের মতো নেই, সে অনিন্দ্য সুন্দরী এক মেয়ে হয়ে উঠেছে। পরীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সে গ্রামে এলো। তাকে ফিরে পেয়ে বাবা মা আনন্দে কেঁদে ফেলল। এখন আর রুবামানীর মুখ দেখে কেউ জ্ঞান হারাবে না, সে সুন্দর চেহারা নিয়ে ফিরে এসেছে। রুবামানী গ্রামে ফিরে আসার পর সারাদেশে হৈ চৈ পড়ে গেছে। তার এমন রূপ কোথাও নেই, সমস্ত মানুষ তাকে সম্মান আর শ্রদ্ধা জানাল। এরপর সে শান্তিতে থাকতে লাগল। আর মাঝে মাঝে পরী এসে দেখা করে। দুজনের মধ্যে খুব ভাল বন্ধুত্ব হলো।


Post a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.