মায়া
জহির টিয়া
মেয়েটির গায়ের রং তামাটে। পরনে ধূসর রঙের ময়লাযুক্ত জামা। মাথার চুলগুলো উসকোখুসকো খাড়া। সজারুর মতো। জল, তেলের দেখা নেই। লিকলিকে দেহগঠন। দেখে মনে হচ্ছে, কতোদিন থেকে কিছুই খায়নি। পিপীলিকার মতোন রাস্তার এক পাশ দিয়ে পিলপিল করে হাঁটছে মেয়েটি। এদিক-সেদিক তাকাচ্ছে । মুখে বিড়বিড় করে কী যেন বলছে! দেখে কিছুটা হলেও পাগলী টাইপের মতো মনে হচ্ছে। বয়স ছয়-সাত এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ হবে। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল সামান্তা। তার বয়সও একই। সে কিছুটা ভয় ভয় করে পাগলী মেয়েটার দিকে এগিয়ে গেল। পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই, চোখেচোখে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে চাচ্ছে মেয়েটি। সামান্তা বুঝতে পারে। মায়াময় দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে সামান্তা জানতে চাইলো,
-তোমার নাম কি?
মেয়েটি বোবার শুধু তাকিয়ে রইল। মুখ ফুটে কিছু বললো না। সামান্তা কয়েকবার জিজ্ঞেস করার পরও কোনো উত্তর পেলো না মেয়েটির কাছ থেকে। মুড়ির মতো শুকনো মুখখানা দেখে সামান্তার মায়া লাগলো। তারপর আবার জিজ্ঞেস করল,
-কিছু খাবে ? খিদে লেগেছে ?
এবার পাগলী মেয়েটি মাথা নেড়ে খেতে চায়, এমন সংকেত জানালো।
সামান্তা তার হাত ধরে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেল।
-মা, মা দেখো। কাকে নিয়ে এসেছি? সামান্তা তার মাকে ডাক দেয়।
মা পেয়ারা বেগম মেয়ের ডাকে তড়িৎ বেগে ঘর হতে বেরিয়ে আসে।
-কিরে, এই পাগলীকে কোথা হতে আনলি? সামান্তার মা জিজ্ঞেস করল।
-মা, তুমি কি তাকে চিনো?
-হ্যাঁ, চিনি তো।
-এর বাড়ি কোথায়?
-তোমার নানা বাড়ির পাশের গ্রামে। হাসমত আলীর মেয়ে। শুনেছি ওর জন্মের কিছুদিন আগে, ওর বাবা রোড অ্যাকসিডেন্টে মারা যায়। আর যখন ও দুই-আড়াই বছরের তখন ওর মা হঠাৎ মারা যায়। তোমার নানি একদিন বলছিল।
-মা, তুমি কি কথা বলেই যাবে? ওকে কিছু খেতে দাও। ওর খুব খিদে পেয়েছে।
-আচ্ছা, দিচ্ছিরে মা। অকে কল তলায় নিয়ে যাও। হাত-মুখ ধুয়ে আসুক।
সামান্তা কল তলায় নিয়ে গেলো। বালতিতে পানি ভর্তি করে দিলো । সামান্তা জিজ্ঞেস করল,
-গোসল করবে নাকি ?
সে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।
সাবান মাখিয়ে গোসল করালো তাকে। পরে নিজের পোশাকও এনে দিলো পরতে।
তারপর খাওয়াদাওয়া শেষ করে সামান্তা তার কাছে জানতে চাইল ,
-তুমি কি থাকবে? নাকি চলে যাবে?
আবার মাথা নেড়ে জানালো যে, সে থাকতে চায়।
-আচ্ছা, ঠিক আছে থাকো।
সামান্তা আবার জিজ্ঞেস করল,
-তোমার নাম কি? তুমি কি কথা বলতে পারো না?
তবুও সে কোনো কথা বলল না। সামান্তা ভাবতে লাগল, মেয়েটির কী নাম রাখা যায়। যেই ভাবনা সেই কাজ। সামান্তা বলল, ' আজ থেকে আমি তোমার নাম রাখলাম... মায়া।'
-তুমি কি রাজি?
মেয়েটি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।
-তবে চলো, দুজনে খেলি ওখানে। সামান্তা, মায়ার হাত ধরে নিয়ে গেল।
সামান্তা তার সব ধরনের খেলনা নিয়ে এলো। দুজনে বাড়ির উঠোনে খেলতে বসলো।
পুতুলগুলো মায়াকে ধরিয়ে দিয়ে সামান্তা বলে, 'পুতুলগুলো নিয়ে তুমি এখানে বসো।' মায়া পুতুলগুলো নিয়ে বসে পড়ে। পুতুলগুলোর মুখ-হাত নাড়ে, মাথার চুলগুলোতে বিলি কেটে দেয়। ওদিকে সামান্তা হাঁড়িপাতিল নিয়ে রান্নাবান্নার আয়োজন করে।
সামান্তা মা-বাবার একমাত্র সন্তান। তার বাবা একজন শিক্ষক। সে সঙ্গী ছাড়া একা একা খেলাধুলা করে। আজ মায়াকে পেয়ে সে খুব খুশি। খেলার ফাঁকে ফাঁকে মায়াকে নাম ধরে ডাকলে সে সাড়া দেয়। এভাবে সন্ধ্যা নামার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত খেললো তারা । এরপর মায়ের ডাকে সামান্তা ছুটে গেলো । মাকে গিয়ে বলে,
-মা, মায়া আমাদের সঙ্গে থাকুক। ও আমাদের সঙ্গে থাকতে রাজি হয়েছে।
-ওর, নাম কিভাবে জানলে? ও তো তেমন কথা বলছে না।
-মা। আমি ওর নাম রেখেছি মায়া। সুন্দর না নামটা ?
-হ, অনেক সুন্দর নাম।
এরপর পেয়ারা বেগম ভাবতে লাগল, এতিম মেয়েটা থাকুক। সামান্তারও একাকীত্ব কাটবে। তার তো খেলার কোনো বন্ধু নেই। ও থাকলে তো তেমন সমস্যাও হবে না । ভাবতে ভাবতে বলল,
-যাও, সন্ধ্যা হয়ে এলো। দুজনে হাত-মুখ ধুয়ে এসে, পড়তে বসো।
মায়ের কথা শুনে, সামান্তা খুউব খুশি হলো। খেলনাপাতি সবগুলো গোছগাছ করে রেখে দিল সামান্তা। তারপর দু'জনে হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসলো।
সামান্তা, মায়াকে স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ শেখাতে লাগল। খাতা কলম দিল তাকে। নিজে পড়ে আর মায়াকেও পড়ায়। ধীরে ধীরে মায়ারও মুখের আড়ষ্টতা ভাঙতে লাগল। দুজনের বন্ধুত্ব আরো দৃঢ় হতে লাগল। দুজনে পড়া শেষ করে রাতের খাবার খেলো। তারপর সামান্তা, মায়াকে নিয়ে নিজের বিছানায় ঘুমিয়ে পড়ল। পরের দিন সামান্তা, মায়াকে নিয়ে স্কুলে গেল। সকল বন্ধুর সঙ্গে মায়াকে পরিচয় করিয়ে দেয়। স্কুলে সবার সঙ্গে মায়া অনেক আনন্দ ফূর্তি করল। স্কুল শেষে বাড়ি ফিরে এলো দু'জনে। বিকেল বেলা আবার খেলায় মেতে রইল দু'জনে। এভাবে মায়ার স্বপ্নের মতো দিনগুলো কাটতে লাগল।


Post a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.