নির্মম বাস্তবতা
সুমন আহমেদ
পৃথিবীর নির্মম বাস্তবতাটা মেনে নিতে পারেননি মনছুর মিয়া। তাইতো উন্মাদ বদ্ধ পাগল হয়ে আজও অবধি রাস্তায়-রাস্তায় খুঁজে বেড়ান একমাত্র আদরের মেয়ে মিতুকে। মায়ার পৃথিবী ছেড়ে যে একবার চলে যায়- পৃথিবীর নিয়ম ভেঙে সে আর কোনোদিনই ফিরে আসে না। আর কোনোদিনই ফিরে আসবে না মিতু বাবার কোলে। মিতু কেবল এখন দূর আকাশের তারা হয়ে জ্বলে রাতের বুকে। সেদিন একমাত্র মেয়ে মিতুকে জন্ম দিতে গিয়ে মিতুর মা মারা যান। এক পৃথিবী হারিয়ে আর এক পৃথিবীকে বুকে আগলে ধরে একটু-একটু করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেন মনছুর মিয়া। মেয়ের গায়ে একটু দুঃখের ছায়া লাগতে দেবে না বলে দ্বিতীয় বিয়ে অবধি করেননি সে। অতি সামান্য একজন দরিদ্র দিনমজুর মনছুর মিয়া। অভাব অনটনের সংসারে, মেয়ের চাওয়ার কাছে বাবা যেন বিশাল আকাশ; কোনোদিন কোনোকিছুর অভাব বুঝতে দেয়নি মেয়েকে। না চাইতেই সমস্ত পৃথিবী এনে দিতো পায়ের কাছে। মিতুর বয়স তখন ৭বছর; মিতু দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। একদিন স্কুলের প্রধান শিক্ষক, সকল ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে বললেন- আগামীকাল যেন সকল ছাত্র-ছাত্রীদের মা বাবা উপস্থিত থাকেন। বাবার বুকে মাথা রেখে, মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়ানির গান শুনে প্রতিনিয়ত ঘুমানোর দীর্ঘ
দিনের অভ্যেস মিতুর। সেদিন রাতে বাবাকে বললেন- বাবা, স্যার বলেছেন আগামীকাল তোমাকে আর মাকে নিয়ে স্কুলে যেতে। বাবা, অ-বাবা মা কোথায়?
হঠাৎ এই প্রথম মেয়ের মুখে তার মা কোথায় প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বড় অসহায় আজ মনছুর মিয়া। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে কান্না শুরু করলেন। মিতুকে কোলে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে বাড়ির উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালেন; আকাশপানে তাকিয়ে মিতুকে বললেন- মা'রে... ঐযে তারাগুলো দেখছিস; ঐখানে তোর মা। তুই যেদিন লেখাপাড়া করে বড় হয়ে মানুষের মতো মানুষ হবি, সেদিনই তোর মা ফিরে আসবে; তোর মা আসার সময় টাকা-পয়সা সোনা-গহনা জামাকাপড় আরও কতকিছু নিয়ে আসবে! তখন আর আমাদের কোনো অভাব-অনটন থাকবে না। সেদিন দু'চোখের পানি ছেড়ে-ছেড়ে মনছুর মিয়া মেয়েকে মিথ্যে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। দেখতে দেখতে মিতু বড় হয়ে গেল। এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার তিনমাস পর, পরীক্ষার রেজাল্ট আসে। পরীক্ষায় মিতু জিপিএ ফাইভ পেয়েছে।
দীর্ঘদিনের পোষা একটি গাভী ছিল মনছুর মিয়ার। মেয়ের পরীক্ষার রেজাল্টের আনন্দে সেই গাভীটি বিক্রি করে পুরো গ্রামে মিষ্টি বিতরণ করেন। মনছুর মিয়া প্রতিনিয়ত স্বপ্ন দেখতেন। তার মেয়ে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে একদিন অনেক বড় হবে; গ্রামের সব মানুষ তার মেয়েকে নিয়ে গর্ব করবে আর বলবে এটা মনছুরের মেয়ে আমাদের মনছুরের। স্বপ্ন পূরণের প্রত্যাশায় কিছুদিন পর মিতুকে কলেজে ভর্তি করালেন; মিতু প্রতিদিন কলেজ থেকে বিকেল চারটা থেকে পাঁচটার মধ্যেই বাড়িতে চলে আসে; কিন্তু আজ সন্ধ্যা ৭টা বেজে গেল, এখনও মিতু বাড়িতে ফিরেনি। অবশেষে মনছুর মিয়া মেয়ের খোঁজে বেড়িয়ে পড়লেন, কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না মিতুকে। মিতুর সকল বন্ধু বান্ধবী এবং আত্মীয় স্বজনদের বাসাতেও খোঁজ নিলেন। সারারাত পাগলের মতো খুঁজলেন কিন্তু কোথাও পাওয়া যায়নি মিতুকে। ভোরের সূর্য উদয় হওয়ার সাথে-সাথেই রেললাইনের পাশে অসংখ্য মানুষ; মনছুর মিয়া সামনে এগিয়ে গেলেন। মানুষের ভিড়ে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। অনেক কষ্টে ভিতরে গিয়ে ঢুকলেন। গিয়ে দেখেন- ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে আছে তার একমাত্র আদরের মেয়ে মিতু, মিতুর মৃত দেহ। কে বা কারা যেন গণধর্ষণ করার পর মেরে ফেলে রেখে গেছে। মনছুর মিয়ার চিৎকারে থরথর করে আকাশ কেঁপে উঠলো, বাতাসে-বাতাসে ছড়িয়ে যাচ্ছে বুকফাটা কান্নার ধ্বনি। আকাশের সব রঙ হারিয়ে একমুঠো ছাই হয়ে গুমরে-গুমরে কাঁদছে পৃথিবী; ভোরের সূর্যটা আজ চিরতরে হারিয়ে গেল রাতের বুকে। সেদিনের পর থেকে; একজীবনের সমস্ত সঞ্চয় হারিয়ে উন্মাদ বদ্ধ পাগল হয়ে আজও একটু একটু করে বেঁচে আছে মনছুর মিয়া শুধু তার একমাত্র আদরের মেয়েকে ফিরে পাবার প্রত্যাশায়।


Post a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.