ছবির মানুষ-ছোট-গল্প

 ছবির মানুষ

     - জুয়েল আশরাফ 



'জানি রাগে টং হয়ে আছো। রাগ করো না। আমি আজ সারাটা দিন খুব ব্যস্ত ছিলাম। এখন পর্যন্ত খাই নি। তুমি খেয়েছ?'
ছবির মানুষ কথা বলে না। ছবির মানুষটি যদি কথা বলতো, মীরা জানে কী বলতো-
ছবির মানুষ: আমার সামনে থেকে দূর হ। আমার কাছে আসবি না।
মীরা: আমাকে তুই-তুকারি করছো কেন? আমি তোমার বউ!
ছবির মানুষ: একদম চোপ। বউ বউ করবি না। বউশালা চেনোস? এক লাথি মেরে বউশালায় পাঠিয়ে দেব।
মীরা: খুব ব্যস্ত ছিলাম গো। আসো কপালে একটা চুমু খাই।
ছবির মানুষ: তোর চুমুর গুষ্ঠি।
মীরা ছবির মানুষটির ঠোঁটে চুমু খেল। আবেগে তার চোখ ভিজে উঠেছে। ছবির মানুষটির ঠোঁট পোঁকা-মাকড়ে খেয়ে গেছে কবেই! পোঁকা মাকড়ের সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য হলো চোখ। ছবির মানুষটির চোখের দিকে তাকিয়ে সে আঁৎকে উঠল, এই সুন্দর চোখ দুটি প্রথমেই খাওয়া হয়েছে নিশ্চয়ই। মীরা অস্ফুট স্বরে বলল, 'তোমার ছেলের বিয়ে হলো গো। দোয়া কোরো।'
ছেলের আজ বৌভাত। অনুষ্ঠানের আজ ধকল গেল সারাটা দিন মীরার ওপর দিয়ে। শেষ হওয়ার পরও গোছাতে গোছাতে রাত দুটো বাজল। সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই বন্ধ ঘর থেকে রিনরিনে চুড়ির আওয়াজ পেলেন মীরা। বাসরের জন্য এই ঘরটাকে সাজানো হয়েছে। ছেলের নতুন বউ। মৃত্যুর চার বছর আগেই দোতলায় ঘর তুলে রেখে গিয়েছিলেন স্বামী। একমাত্র ছেলে বলে কথা!
পাশে সংলগ্ন বাথরুম। তারপর ঢালা বারান্দা। এককোণে ডাইনিং স্পেস। অনুষ্ঠানের বাড়তি তরকারিগুলো ফ্রিজে রাখতে আসছিলেন মীরা। কাজের লোক, ড্রাইভারদের কাল দিয়ে দেওয়া যাবে। হাঁটুর ব্যথায় সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হয়। জিরোবার জন্য থামতেই আচানক ছেলের গলা ভেসে এলো-
'এর আগে কাউকে মন দিয়েছিলে তুমি?'
ভালো লাগা আর অস্বস্তি দুটোই প্রবল হয়ে চেপে ধরল মীরাকে। বুক ধড়ফড় করছে। উফ, ছেলেটার কান্ডজ্ঞান নেই। দরজাটা নিশ্চয়ই ভালো করে আটকায়নি।
দ্রুত পায়ে বারান্দা পেরিয়ে ডাইনিং স্পেসের দিকে চললেন মীরা। এখন যদি কেউ কান পাততো? ভাগ্য ভালো বোন আর ননদের মেয়েরা কেউ আশেপাশে নেই। আপন মনে হেসে ফেললেন মীরা।
ডাইনিংঘর সংলগ্ন খোলা ছাদ ভেসে যাচ্ছে জোছনায়। আজ পূর্ণিমা। ছাদের দরজাটা বন্ধ করতে গিয়ে চোখে পড়ল ছবির মানুষটি দাঁড়িয়ে। সাদা পাঞ্জাবিতে ওসমানকে দারুণ দেখাচ্ছে।
'তুমি এখানে? তোমার তো ছবির ফ্রেমে থাকার কথা।!'
ওসমান ডান হাত পিছনে লুকোতেই মীরা বুঝলেন সিগারেট ধরিয়েছে।
'আবার ওসব ছাইফাই খাচ্ছ? তোমার না বারণ!' হাঁপানির রুগি!' 
ওসমান হাতটা সামনে নিয়ে এলেন।
'আজকের দিনটায় ছাড়ো। এই একটু সুখটান।'
স্বামীর চোখে মিনতি।
গুচ্ছ গুচ্ছ হাস্নাহেনা ফুল ফুটেছে। ছাদের কার্নিশে ঝুলে পড়েছে জুঁই ফুলের ডাল। সব ফুলেরই একটা নিজস্ব গন্ধ আছে। জুঁই ফুলের দিকে এগোলেন মীরা। কী সুন্দর সাদা ফুল! গন্ধটা ধক করে মগজে এসে লাগল। হাঁটুর ব্যথার জন্য ছাদে খুব একটা আসা হয় না। তাই চোখে পড়েনি।
ওসমান সিগারেটটা ছুড়ে ফেলল। মীরা হাঁফ ছাড়লেন।
'চলো নীচে। রাত কত হল খেয়াল আছে? এমনিতেই অনিয়ম চলছে কদিন ধরে।'
'দাঁড়াও। আর একটু।'
'ছাদের বাতাসে ঠান্ডা লেগে যাবে কিন্তু।'
'একটা কথা ছিল, শুনবে?'
'ঢং যত।' গজগজ করতে করতে দাঁড়ালেন মীরা। ফিনিক দেওয়া চাঁদের আলোতে বহুদিন বাদে সেই পুরানো ওসমানকে যেন এক ঝলক দেখলেন!
ওসমানের বয়স আটান্ন হলেও মন ছিল তরতাজা। কাছে এসে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরলেন।
'ছাড়ো। কেউ দেখে ফেললে? বুড়ো বয়সে এসব হচ্ছে কী!'
'একটা প্রশ্নের উত্তর দেবে?'
কৌতূহলী চোখে তাকালেন মীরা।
'বিয়ের আগে কাউকে মন দিয়েছিলে তুমি?'
'ওমা! তেত্রিশ বছর আগের কথা মনে আছে? সব ভুল। তুমি এখন কেবলি ছবি।'
বারান্দায় দাঁড়িয়ে মীরা। জোছনায় ধুয়ে যাচ্ছে চরাচর। চাঁদের সাম্পান বেয়ে বেয়ে কোথায় যেন পৌঁছে গেলেন মীরা। 
পাগলের মতো আমাকে তুমি ভালবেসে গেছো ওসমান। সংসার জীবনে আমার অনিচ্ছাকৃত অবহেলাকে কেন্দ্র করে তুই-তুকারি গালিগালাজ করতে আমাকে। তোমার ওসব আচরণে আমি ভেতরে ভেতরে এক ধরনের সুখ পেতাম। সেই সুখ থেকে বঞ্চিত রেখে আমাকে একা ফেলে কোথায় চলে গেলে!
রাত গভীর। চাঁদ ঢলেছে। হাস্নাহেনার গাঢ় গন্ধ ডুবে আছে চারপাশ। বাসর ঘরে রিনরিনে চুড়ির আওয়াজ। ছবির মানুষটি নেই কোথাও!


0/Post a Comment/Comments

Please do not enter any spam link in the comment box.

Stay connected

FACEBOOK- Fans Like
TWITTER- Followers Follow
YOUTUBE- Subscribers Subscribe

Subscribe us

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner