Chayasongi short story-bengali



ছায়াসঙ্গী...
    - জুয়েল আশরাফ



ইয়াকুব সাহেবকে দেখে চমকে উঠলাম। মনে হলো অতি প্রাকৃত কোন ব্যাপার ঘটবার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমি ইয়াকুব সাহেবের দেশি মানুষ। তেরো বছর আগে একগ্রামে পাশাপাশি ছিলাম আমরা। ভাল রোজগারের আশায় নিজের ঘরবাড়ি জমি বিক্রি করে এই মফস্বলে চলে এলেন তিনি। আমিও পরিবার নিয়ে চলে আসি শহরে। এরপর আর যোগাযোগ নেই। বহু বছর পর কার কাছ থেকে আমার ঠিকানা যোগাড় করে আমার সাথে দেখা করতে এলেন। তার বেশভূষায় টের পেলাম বেশ আর্থিক স্বচ্ছলতা এসেছে। কিন্তু মুখের আদলে কোথায় যেন ভয়ংকর একটা চিন্তার ছাপ সারাক্ষণই তার চেহারার আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। প্রাথমিক আলাপেই জানালেন বাড়ি কিনেছেন, পরিবার নিয়ে সেখানেই থাকেন। বিশাল জমিদার বাড়ি। খুব অল্প টাকায় বাড়িটা কেনা হয়েছে। বাড়ি দেখাতে আমাকে এক প্রকার জোড় জবস্তি করেই এরকম অচেনা মফস্বলে নিয়ে এসেছেন। অফিস থেকে দুদিন ছুটি নিয়ে তার সঙ্গে চলে এলাম। বাড়ি দেখে আমি অবাক, মফস্বলে এরকম রাজবাড়ি এত সস্তায় পাওয়া যায়! আমি ঠাট্রার সুরে বলেই ফেললাম আপনার বাড়ি তো চমৎকার। আসেন দুজনে পাল্টাপাল্টি করি। আমার শহরের বাড়ি আপনার আর এই বাড়ি আমি নিয়ে নিলাম।

     ইয়াকুব সাহেব আমাকে অবাক করে দিলেন প্রথম রাতেই। তিনি বাড়ি পাল্টাপাল্টিতে রাজি হয়ে গেলেন। আমার ঠাট্রা বিষয়কে এত দ্রুত সিরিয়াসলি নেবেন ভাবিনি। রাতের খাওয়া শেষ করে দুজনে আরাম হয়ে বসলাম বিছানায়। তিনি নিজেই রেঁধেছেন। এই বাড়িতে আসার পর থেকেই আর কেউ নেই আমরা দুজন ছাড়া। স্ত্রী আর দুই মেয়ে তার শ্বশুরবাড়ি গিয়েছে বেড়াতে । এই বাড়িতে তাদের থাকা পছন্দ না। এজন্য ঘন ঘন বাপেরবাড়ি চলে যায় স্ত্রী। একজন চাকর ছিল তাকেও বিদেয় করে এখন নিজেই রেঁধে খান। এসমস্ত ঘরোয়া আলাপ করলেন ইয়াকুব সাহেব আমার সঙ্গে।
     রাতে শোবার আয়োজন করছি, ইয়াকুব সাহেব এসে চিন্তিত মুখে বললেন, এখন শোবেন না। বিপদ।
     বলতে বলতেই দেখি তার চেহারায় রাজ্যের সমস্ত ভয় এসে জমেছে। তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার! অমন করছেন কেন? হয়েছে কি?

     ইয়াকুব সাহেব বললেন, এই বাড়িতে আমি ঘুমাতে পারি না। ঘুমালেই বিপদ। আপনাকে কিছু সত্যি কথা বলব কাল সকালে। আপাতত আজকের রাত টুকু জেগে থাকুন। আমি পাশের ঘরে আছি। কোন কিছুর প্রয়োজন হলেই ডাকবেন আমাকে।
     ইয়াকুব সাহেব চলে গেলেন। আমি রহস্য বুঝতে তার ঘরে এসে বিচলিত হয়ে জানতে চাইলাম, আপনি এখনই বলুন। কি ঘটনা? কিসের বিপদ?

     ইয়াকুব সাহেব ভীত গলায় বললেন, একদিন রাতে আমরা সবাই ঘুমিয়ে আছি। এক খাটে জায়গা না হওয়ায় আমি রোজ একা ঘরে শুই। আমার স্ত্রী দুই মেয়েকে নিয়ে দোতলায় থাকত একটা ঘরে। এরকম একদিন রাতে সবাই ঘুমিয়ে আছি, আমার স্ত্রী টের পেল তার চুলের মুঠি পেছন থেকে কে যেন ধরে রেখেছে। আর আমার মেয়ে দুটি যে মেঝেতে পড়ে গড়াগড়ি যাচ্ছে সেদিকে আমার স্ত্রী এগোতে পারছে না। হঠাৎ সে উপরে তাকিয়ে দেখে দশ এগারো বছরের একটা মেয়ে ফাঁসিতে ঝুলছে। এই দৃশ্য দেখে আমার স্ত্রী জ্ঞান হারাবার আগে আর একটা ভয়ংকর দৃশ্য দেখল, সে দেখতে পেল ফাঁস দিয়ে ঝুলে থাকা মেয়েটিই তার চুলের মুঠি ধরে রেখেছে। স্ত্রী জ্ঞান হারাল। 

পরের দিন স্ত্রীর মুখে আমি সব শুনে এলাকার আশেপাশে কাউকে পেলাম না যে বিষয়টা নিয়ে কারোর সঙ্গে আলোচনায় যাব। একজন প্রবীন লোককে পাওয়া গেল। যিনি এই বাড়ীর মোটামুটি ইতিহাস জানেন।  তিনি বললেন, এই বাড়ীতে এক জমিদারের দুটো জমজ মেয়ে ছিল। সেই জমিদারের নারী নেশা ছিল তীব্র। প্রতিদিন তার ঘরে নতুন নতুন নারী আসতো। এক এক রাতে এক একজনকে সে ব্যবহার করত। সব দেখে জমিদারের স্ত্রী মুখ বুজে চুপ করে থাকতেন। একদিন টিকে থাকতে না পেরে নিজের শরীরে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করেন। জমিদার তখন জমজ মেয়ে দুটির একটিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেন, অন্য জনকে গলা টিপে মাড়েন। সকালে খবর প্রচার করতে থাকেন আমার স্ত্রী পাগল হয়ে গেছে, সে নিজেও মরেছে আমার মেয়ে দুটিকেও মেরে রেখে গেছে। এই খবর সবাই বিশ্বাস করে নিল। জমিদার পুরো বাড়িতে একা থেকে গেলেন। তার আর কোনো বাঁধা আপত্তি ঠেকল না। সে স্বাধীন মতো একের পর এক মেয়েকে ভোগ করতে থাকেন। একদিন জমিদার রাতের বেলায় দেখেন তার মেয়ে দুটি বিছানায় বসে তার পা টিপে দিচ্ছে। এমন ঘটনার পর জমিদারের মাথা খারাপ হয়ে গেল। কিছুদিনের ভেতরেরই সে উন্মাদ হয়ে গেল। তার আত্মীয়রা বাড়ী বিক্রি করে দিয়ে তাকে নিয়ে চলে গেল দূরে। যিনি এই বাড়ীটা কিনে নিলেন তার স্ত্রী ছিলেন পোয়াতি।  জমজ বাচ্চার মা হলেন। 

এলাকার লোকজন আশ্চর্য হয়ে বলাবলি করতে লাগল ঠিক জমিদারের মেয়ে দুটির মতো চেহারা। তারা অনেক বছর থাকলেন। এগারো বছর যেতে না যেতেই একদিন রাতে বাবা মা দেখলেন মেয়ে দুটির একজন ফাঁস দিয়ে উপড়ে ঝুলছে, অন্যজন মরে পড়ে আছে মেঝেতে। লোকটির স্ত্রী পাগল হয়ে গেলেন। এবং পাগল অবস্থাতেই নিজের শরীরে সে আগুন ধরিয়ে মারা গেল। এই ঘটনার পর এলাকার লোকজন বলাবলি করতে থাকে এই বাড়িতে অশুভ আত্মার বাস। লোকটি পাগল স্ত্রীকে দাফন করে দিয়ে এই বাড়ী ছেড়ে বিদেশ চলে গেলেন। কিন্তু বাড়ী তিনি বিক্রি করলেন না। আমি কেয়ারটেকার হয়ে এই বাড়ীতে এলাম। তখনও বিয়ে করিনি। দুই বছরের মাথায় বিয়ে করে ফেললাম। আমার ঘরেও জমজ মেয়ে এলো। বয়স্ক লোকজন যারা ছিলেন তারা আমার মেয়েদের দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকতেন, আর বলতেন তোমার মেয়ে দুটি এই বাড়ীতে আগে যে দুটি জমজ মেয়ে ছিল ঠিক তাদের মতো চেহারা হয়েছে। 

আমার স্ত্রী এই বাড়ীর ঘটনা সব শুনেছেন আগেই। সে মেয়ে দুটিকে নিয়ে এই বাড়ী ছেড়ে চলে যাবার জন্যে প্রতিদিন আমাকে জোড় করতে থাকে। আমি তার কথায় কান দিলাম না। তার বিশ্বাস হয়ে গেল এই বাড়ীতে যে কোনো স্ত্রী লোকই থাকবে তার জমজ সন্তান আসবে এবং সেই সন্তানের বয়স এগারো হতেই মারা যাবে। আমার মেয়ে দুটির বয়স তখন মাত্র নয়। আমার স্ত্রীকে পাগলের মতো চিন্তাভাবনার জন্যে খুব বকতাম। একদিন সে প্রস্তাব করে মেয়ে দুটিকে নিয়ে চলে যাবে, থাকার ইচ্ছে যখন আমি একাই যেন থাকি। স্ত্রীকে খুব বোঝালাম একদিন। সে বুঝ মানবে না। তখন আমার স্ত্রীকে শায়েস্তা করার জন্যে আমার বন্ধুকে আমি নিজেই ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে বলতাম ঘরে পুরুষ-মানুষ আসে কোথা থেকে। অথচ আমি ঠিকই জানি আমার স্ত্রী খুব ভালো মেয়ে। আমার ইচ্ছা ছিল দুই একদিন এমন করলেই আমার স্ত্রী আমার বাধ্য হয়ে যাবেন। আমি যা বলবো তাই সে শুনবে। এই বাড়ীতে বিনে পয়সায় থাকতে পারছি, কোথাও এমন সুবিধা পাব না। কিন্তু যা ভেবেছিলাম তার উল্টো হলো। 

ভাইজান আপনাকে আমার স্ত্রী সম্পর্কে মিথ্যা বলেছিলাম। সে আসলে বেঁচে নেই, সেও আমার মিথ্যা অপবাদ সহ্য করতে না পেরে নিজের শরীরে আগুন ধরিয়ে মারা গেল। এখন আমি অপেক্ষায় আছি। সামনের মাসেই আমার মেয়ে দুটির এগারো বছর পূর্ণ হবে। এখন আমি ইচ্ছে করলেও মেয়ে দুটিকে নিয়ে এখান থেকে চলে যেতে পারি না, কোথায় যেন একটা অশুভ শক্তি আমাকে আর আমার মেয়ে দুটিকে ধরে আছে শক্ত করে। সামনের মাসে দেখবো কি ঘটে আমার মেয়ে দুটির জীবনে। আপনি আমার জমজ মেয়ে দুটিকে দেখতে চান? ওরা উপরের ঘরে আছে। দুজনকে 'আয়াতুল কুরছি' পড়িয়ে শুইয়ে রেখে এসেছি।
     এই পর্যন্ত বলেই ইয়াকুব সাহেব থামলেন। আমি শুধু এই টুকুই বললাম, আজকের রাতটুকু আপনি শুধু আমাকে আপনার ঘরে আশ্রয় দিন। সকাল পর্যন্ত একা একটা ঘরে অপেক্ষা করার মতো সাহস আমার নেই।




0/Post a Comment/Comments

Please do not enter any spam link in the comment box.

Stay connected

FACEBOOK- Fans Like
TWITTER- Followers Follow
YOUTUBE- Subscribers Subscribe

Subscribe us

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner