আজ সে অনেক দূরে,,
আজহার মাহমুদ,,
অনেকদিন হলো তাকে দেখি না। তার কথা রোজ মনে পড়ে। বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে বেশি বেশি মনে পড়ে। সবচাইতে বেশি মনে পড়ে রাতে। কখনও কখনও বালিশ ভিজে যায়।
হুম, অশ্রুতেই ভিজে। শত অশ্রুতেও আজ দেখা পাই না তার। আগে তাকে এক পলক দেখার জন্য গণি মিয়ার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম। গণি মিয়ার দোকানটা তার বাড়ির সামনেই। বাড়ি থেকে সে বের হলেই আমি দেখতে পাই। এভাবে কত দেখা করেছি তার সাথে। সে আমাকে দেখলেই বাড়িতে চলে যেত। অনেক সময় না দেখার ভান করে রিকশায় উঠে যেত। ভাবছেন আমাকে অপছন্দ কিংবা সহ্য করতে পারে না। কিন্তু আসলে তা নয়।
দু'বছর আগেই তার বিয়ে হয়েছে। বিয়ের দু'সপ্তাহ আগেও আমি ছিলাম তার পৃথিবী। তার স্বপ্ন আর ভালোবাসার সবটুকুতে ছিলাম আমি। হঠাৎ করেই সব তছনছ করে সে রাসেলকে বিয়ে করে ফেললো। বাবা মায়ের চাপেই বিয়েটা করেছে। তবে সেটাও আমাকে জানায়নি। চুপিচুপিই সব সেরেছে। রাসেল তার ফুফাত ভাই। ছোট বেলায় নাকি তাদের বিয়ে হওয়ার কথা পাকাপাকি ছিল। সে কাজটা ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই সেরে ফেললো। এসব আমি তার বান্ধবী রেশমি থেকে জানলাম। জানার পর ফোন দিলাম। অনেক কিছু বললাম তাকে। যা আমার জায়গায় অন্য কেউ থাকলেও বলতো। কিন্তু সে কোনো উত্তর দেয়নি। আমিও রাগে আর কথা বলি নাই। তবে এর একমাস পরেই আর থাকতে পারছিলাম না। ফোন দিয়েছিলাম। নম্বর বন্ধ। তার বান্ধবীর কাছে চাইলাম তার কাছে জানতে পারলাম তাকে মোবাইল ব্যবহার করতে দেয় না শ্বশুর। তাই সবকিছু খোঁজ নিয়ে তার শ্বশুর বাড়ির পাশে গিয়ে প্রতিদিন দাঁড়িয়ে থাকতাম।
একদিন তাকে দেখলাম। সেও আমাকে দেখলো। কিন্তু কিছু না বলে আবার বাড়ি ফিরে গেল। আমিও একপলক দেখে আবার ফিরে আসতাম। এভাবেই জীবন চলছে। আমি জানি সে আমাকে দেখলে লজ্জা পায়। তার নিজের প্রতি নিজের ঘৃণা হয়। এজন্যই আমার সামনে সে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারে না। আমার চোখে চোখ রাখতে পারে না। সেটা আমি বুঝি। আর এজন্যই সে আমাকে দেখলে পালিয়ে যায়। তবে তাকে দেখতে গিয়ে কখনও সমস্যায় পড়তে হয়নি। এলাকার কেউ কখনও আমাকে কিছু বলেনি। তার স্বামীর সাথেও দেখা হয়। সেও কখনও সন্দেহ করেনি। হতে পারে সে কাউকেই আমার কথা বলেনি। যাইহোক, এভাবে রোজ দেখতে যেতাম তাকে। মাঝে মধ্যে দেখতে না গেলে আমার কেমন কেমন লাগে। আর অনেক সময় ব্যস্ততা আর ঝামেলায় পড়ে দু'চারদিনও যাওয়া হয় না। তখন তার বান্ধবী আমাকে বলে, কি ব্যাপার কয়েকদিন মনে হয় যাচ্ছো না। একথা রেশমি জানার কথা নয়। নিশ্চয় সে বলেছে।
আমি জানি সে এখনও আমাকে ভালোবাসে। যদিও অন্যজনের সংসারে। তাই আমি কখনও ওর সাথে কথা বলার চেষ্টাও করিনি। এমনভাব নিয়ে তাকে দেখতে যেতাম যেন আমি আজও তার উপর রেগে আছি। কিন্তু গত কয়েকমাস ধরে তাকে আর দেখছি না। গতবছরের শুরুরদিকে শুনলাম সে নাকি প্রেগনেন্ট। শুনে কষ্ট লাগলেও তার জন্য দোয়া করতাম সবসময়। সে যেন সুস্থ থাকে সে জন্য নামাজ পড়তাম রোজ। মাঝখানে তার শরীর ভালো না থাকার কারণে দেখা হতো। সে বাসা থেকে বের হতো না। অনেক সময় আমি বুঝতাম সে আমার জন্যই বের হয়েছে। তখন তার অবস্থা দেখে সত্যি কষ্ট লাগতো। এরপর মাঝখানে আমিই আর যেতাম না। কারণ আমি কয়েকদিন না আসলে সে আর বের হবে বলে মনে হয় না। আমিও প্রায় দু'মাস কষ্ট করে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। এরপর আবারও যেতে শুরু করলাম। টানা চারদিন গেলাম। প্রতিদিন গণি ভাইয়ের দোকানের সামনে থেকে তাকে না দেখে ফিরে আসতে হয়। কাউকে কিছু জিজ্ঞেসও করতে পারছি না। কারণ সন্দেহ করতে পারে। দু'মাস পর টানা কয়েকদিন এসেও দেখা পাচ্ছি না তার।
এতোদিন তাকে না দেখে আমি কীভাবে থাকছি সেটাও বুঝতে পারছি না। বাধ্য হয়ে রেশমিকে ফোন দিলাম। জিগ্যাস করলাম তার কথা। সে চুপ। কোনো উত্তর দিচ্ছে না। এভাবে দু'দিন ফোন দিলাম তার কোনো উত্তর নেই। ফোন বন্ধ করে দেয়। আমার সন্দেহ হয়। কোনো সমস্যা হয়েছে হয়তো। নাকি বাসা পরিবর্তন করে ফেলেছে। আমাকে জানাতে নিষেধ করলো হয়তো সে। তবুও আমি গণি মিয়ার দোকানে রোজ যাই। আজও গিয়ে দাঁড়ালাম। গণি মিয়ার সাথে এতোদিন যেতে যেত বেশ একটা ভাব জমে গেলো। গণি মিয়া আজ তার এক বয়স্ক বন্ধুকে বলছিল, বেচারা মেয়েটা খুব ভালো ছিল। কখনও কোনো রং কিছু দেখিনি। এতো অল্প বয়েসে মারা গেল! আহা!
আমি বেশ চমকে গেলাম কার কথা বলছে? কে অল্প বয়সে মারা গেল। জিগ্যেস করলাম, চাচা কে মারা গেল?
গণি মিয়া বললো, আমার দোকানের সামনেই মেয়েটার বাসা। রাসেলের বউ। বাচ্চা জন্ম দিয়ে সে মারা গেলো। ডেলিভারির সময়। শুনেই আমি বিচলিত। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলাম না। গণি মিয়া কিছুটা আঁচ করতে পেরেছে। আমি তাড়াতাড়ি বাসায় চলে এলাম। বুকে ধড়ফড় ধড়ফড় করছে। শান্তি লাগছে না। বাসায় এসে রেশমিকে আবার ফোন দিলাম। সে এবারও ধরলো না। আমি তাকে মেসেজ দিয়ে সব বললাম। কিছুক্ষণ পর সে ফোন করলো। সে ওদিক থেকে কান্না করছে। আমি চুপ। কথা বলতে পারছি না। প্রায় কয়েক মিনিট এভাবে গেল। আমি বললাম, আমাকে একথা জানাওনি কেন?
রেশমি বললো, আমাকে সে মৃত্যুর আগে বলে গিয়েছে তার মৃত্যুর সংবাদ যেন তোমায় না বলি। তাহলে তুমি অনেক কষ্ট পাবে। এমনিতে তোমার জীবন থেকে দূরে গিয়ে তোমায় অনেক কষ্ট দিয়েছি। এখন পৃথিবী থেকে চলে গেছে জানতে পারলে তুমি অনেক কষ্ট পাবে। তাই জানাতে না করেছে। কিছুক্ষণ চুপ করে রেশমি আবার বলে, সে মারা যাওয়ার আগে আরও বলেছে, তাকে যেন তুমি ক্ষমা করে দাও। সে তোমাকে সবসময় ভালোবাসতো। মৃত্যুর আগেও তোমায় ভালোবেসেছিল তোমায়।
আমি রেশমির ওসব কথা আর শুনতে পারছিলাম না। মোবাইল রেখে দিয়েছি। পারছি না সইতে। কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। ডিপ্রেশনের সর্বোচ্চ স্থানে আমি। মোবাইলটা আছাড় দিতে ইচ্ছে করলো। আছাড় দিলাম। বিষ খেতে ইচ্ছে করলো। বিষও খেলাম। তারপরের কথা আর জানি না। শুনলাম বাবা-মা আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। আমি এখন সুস্থ। তারা জানতে চায় কেন এমন করেছি। আমি কিছুই বলতে পারছিলাম না। এখনও কিছুই বলিনি। কখনও বলতেও পারবো না। সেদিন থেকে এখন পর্যন্ত আমি বোবার মতোই আছি। অনেকে আমাকে দেখে মানসিক রোগীও বলে। বাসা থেকে বের হই না। শুধু মনের ভেতর একটা কথাই আসে, আজ সে অনেক দূরে। কতদিন তাকে দেখি না।


ধন্যবাদ
ReplyDeletePost a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.