মুক্ত ডানার পাখি,,
খন্দকার নূর হোসাইন,,
গতকাল ডিম ফেটে বেরিয়েছে ব্লু। তার কোনো ভাই-বোন নেই। বাবা-মায়ের ভালোবাসা তাই সবটুকুই পাচ্ছে সে। তার গায়ের রং সবুজ; তবু মা তার নাম রেখেছে ব্লু । তার জন্মের পর কলোনির অনেক পাখিই তাকে দেখতে এসেছিল। টিয়া পাখির বাচ্চা সে, সবাই একটু বেশিই স্নেহের চোখে দেখছে ওকে। উত্তর-দক্ষিণে বয়ে চলা ছোট নদীর দুই পাশে আকাশ ছোয়া পাহাড়। পাহাড়ি ঢালে গড়ে উঠেছে বড় বড় গাছের সারি। পর্বতের পাদদেশে বেড়ে ওঠা প্রকান্ড এক গাছের কোটরে ওদের বাসা। আম্মুর কাছে গল্প শুনেছে ব্লু; তার আব্বুর বন্ধু কাঠ ঠোঁকরা তাদের এ বাসা তৈরি করে দিয়েছিল। ব্লু এখনো ওড়া শেখেনি। ওদের বাসার সাথে প্রশস্ত ব্যাস বিশিষ্ট গাছের ডাল বেরিয়েছে । কোটর থেকে বেরিয়ে ওখানে এসে দাঁড়িয়ে থাকে ব্লু। কলোনির বকগুলো ওর সাথে প্রায়ই দেখা করতে আসে। ওকে গল্প শুনায়। আর কলোনির কাক কাকুর কাছে সব খবরা খবর পাওয়া যায়। সে নানা দেশে ঘুরে, লোকালয়ে যায়, নানা দেশের নানা রকম খবর সে জোগাড় করে আনে। ব্লুর আব্বু-আম্মু এখনো ফিরে আসেনি। এখন বিকেল। সূর্যটা পশ্চিম আকাশে হেলে, শেষ বিকেলের আলো ছড়াচ্ছে। ব্লু দাঁড়িয়ে আছে সেই ডালের ওপর। সোনালী রবির লালচে আলো তির্যকভাবে এসে পড়ছে ওর গায়ে। এই ডালে বসে পাহাড়, নদী সহ দূর দিগন্তের অনেককিছুই দৃষ্টি গোচর হয় । পর্বত উপত্যকা পেরিয়ে দূর দিগন্তে বাক নিয়েছে নদীটা। ব্লু ভাবে, সে ওড়া শিখলে গোটা তল্লাট উড়ে বেড়াবে, ঘুরে দেখবে বিশ্ব চরাচর । কা কা কা করতে করতে কাক কাকু পাশ দিয়েই উড়ে যাচ্ছিল। ওকে দেখে এগিয়ে এল কাক কাকু । গাছের লম্বা ডালটায় বসে ব্লুকে বলল, ‘কি ব্যাপার বৎস, একা একা দাঁড়িয়ে কি ভাবছ?’ ‘কিছুনা, বাহিরের প্রকৃতি দেখছি, কত্ত সুন্দর!তুমি তো অনেক দেশে ঘুরে বেড়াও; বলোতো, ঐ যে নদী বয়ে চলেছে, নদীর শেষ কোথায়?’ ‘দক্ষিণে সাগর৷ নদীটা সাগরে পড়েছে। আর উত্তরে অন্য নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। এদিক দিয়ে গেলে মানুষের বসতি পাওয়া যাবে।’ একটু থামল কাক, তারপর আবার বলল, ‘তা বৎস, তোমার ওড়ার কী খবর?’ ‘ডানায় এখনো পালক উঠেনি ভালোভাবে। আব্বু বলেছে দেরি হবে উড়তে৷’ ‘উড়া শিখলে তবেই স্বস্তি , জানো, লোকালয় থেকে দুষ্ট লোকেরা আসে। তারা পাখির ছানাদের ধরে নিয়ে বাজারে বিক্রি করে দেয়। পাখির যে ছানারা উড়তে পারেনা, তারাই ঐ লোকদের শিকার হয়। এই ক’টাদিন সাবধানে থাকবে কেমন?’ বলেই কা কা কা করতে করতে চলে গেল কাক কাকু । কাক কাকুর কথা শুনে চোখ বড়বড় করে তাকালো ব্লু৷ মনে মনে রাগও হলো কাক কাকুর ওপর। দুঃসংবাদ দেওয়া ছাড়া কি তার কোন কাজ নেই? কাকের কথা ভালো না লাগলেও পরদিন সকালে এর সত্যতা দেখতে পেল ব্লু। সে তখনও বাসায় ঘুমিয়ে ছিল, ওর আব্বু-আম্মু ততক্ষণে খাবারের খোঁজে চলে গিয়েছিল। হঠাৎ বাহিরে পাখিদের চিৎকার চেচামেচি শুনে ঘুম ভেঙে গেল ব্লুর। সেই সাথে ওদের বাসা ধারণকারী গাছটা নড়ে উঠল। কি হয়েছে তা দেখতে বাহিরে যেতেই আঁতকে উঠল সে৷ একটা মানুষ গাছ বেয়ে ওদের বাসার দিকে উঠে আসছে। কাক কাকু এমন মানুষের কথাই তো বলেছিল। ভয় পেয়ে গেল ব্লু, দৌড়ে বাসার মধ্যে চলে গেল সে ৷ কিন্তু শেষ রক্ষা হলোনা। তাকে ধরে একটা খাঁচায় ভরা হলো৷ ঠিক সেই সময়, কোথা থেকে যেন ওর আব্বু উড়ে এল, দুষ্ট লোকটার মাথায় ঠোকর দিতে উদ্যত হলেন তিনি; তবুও লোকটা ব্লুকে ছাড়লোনা৷ ব্লুকে নিয়ে অনেকদূর চলে এল লোকটা, দূর থেকে দেখলো ব্লু, ওর আম্মু মুখে খাবার নিয়ে ফিরে এসেছে, সেটা আর খাওয়াতে পারলোনা ওকে৷ মুখ থেকে খসে পড়ল খাবারটি। এক সময় তাদের কলোনি ছেড়ে আরো অনেকদূর চলে এল লোকটা। বক ও কাক কাকুর ডাকটাও আস্তে আস্তে বাতাসে মিলিয়ে গেল৷ আব্বু-আম্মুর অবয়ব মুছে গেল দৃশ্যপট থেকে। ব্লুর সাথে সেদিন আরো অনেক পাখির ছোট ছোট ছানা ধরা পড়েছিল। সবগুলোই ছিল উড়তে না পারা ছানা। সেদিনই বিকেলে বাজারে তোলা হলো ওদের৷ ব্লুকে একটা লোক কিনে নিল। বড় খাঁচায় ভরে তাকে বাড়ির বেলকনিতে রাখা হলো। তারপর থেকেই বাড়ির পিচ্চি একটা ছেলে, সব সময় ওর খাঁচার কাছে ঘুরঘুর করতে লাগল। ছেলেটা নানা কথা শোনায় ওকে, যেগুলো একদম ভালো লাগেনা ব্লুর৷ এখানে আসার পর থেকে হরেক রকমের মজাদার খাবার দেওয়া হচ্ছে ওকে। বাবা-মা ছেড়ে বন্দি জীবনে মজাদার খাবার কারো ভালো লাগে? ব্লুর খু্ব কষ্ট হয় ওর আব্বু-আম্মুর জন্য। ওকে ধরে আনার দিন আব্বু-আম্মুর চোখে পানি দেখেছিল সে। বেলকনির এই পরিবেশটাও অসহ্যকর৷ কলোনিতে সে কত সুন্দর জায়গায় ছিল! এখন ওগুলো মনে হলে দম বন্ধ হয়ে আসে ব্লুর। এভাবেই কেটে গেল কয়েকমাস। একা একা ভালো লাগেনা ব্লুর। অনেকদিন সে কোনো পাখি বন্ধুকে দেখেনি৷ হঠাৎ একদিন ভাগ্যক্রমে তার কলোনির কাক কাকুর সাথে দেখা হয়ে গেল৷ নানা দেশে ঘুরে বেড়ানোর সুবাদে এদিক দিয়েই কোথাও যাচ্ছিল সে। ব্লুকে দেখে চিনতে ভুল হয়নি তার৷ যদিও এতদিনে ব্লু বেশ বড় হয়ে গেছে। ডানাগুলোতেও পালক উঠেছে। কাক কাকুকে দেখে খুব ভালো লাগল ব্লুর। অনেকদিন পর পরিচিত কাউকে দেখে মনটা ভিজে গেল। প্রথমেই ব্লু প্রশ্ন করল, ‘আব্বু-আম্মু কেমন আছে? তারা আমাকে এখান থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছেনা কেন?’ ‘তোমার আব্বু-আম্মু ভালো আছে, কিন্তু সারাক্ষণ মন মরা হয়ে থাকে ওরা। তোমাকে অনেক খুঁজেছে, কোথাও পায়নি। আমি আজ তোমাকে পেলাম৷ মন খারাপ করোনা। আমি তোমার আব্বু-আম্মুকে নিয়ে আসব এখানে৷’ ‘সত্যি বলছো?’ খুশিতে লাফিয়ে উঠে বলল ব্লু। কিন্তু পরেক্ষণে বলল, ‘তুমি আমাকে এখান থেকে বের করে নাও না কাকু! আমি তোমার সাথে চলে যাই।’ ‘সে ক্ষমতা আমার থাকলে এতক্ষণে তাই করতাম বৎস। তুমি মন খারাপ করোনা। আমরা চেষ্টা করব তোমাকে ছাড়ানোর। আজ আসি, আমাকে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে।’ পরদিন কাক কাকু সত্যিই তার আব্বু-আম্মুকে নিয়ে এসেছিল। ব্লু আব্বু-আম্মুকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। আব্বু-আম্মু ওকে শান্ত্বনা দিয়েছিল। এরপর থেকে প্রতিদিন কাক কাকু বা আব্বু-আম্মু ওর সাথে দেখা করতে আসত ৷ তারা ওকে ওড়া শেখার কৌশল শিখিয়ে দিত। ব্লু ওদের কথামত খাঁচাতেই উড়ার প্যাকটিস করত ৷ আগের চাইতে সময়গুলো ভালো যাচ্ছে ব্লুর। প্রায় প্রতিদিনই আব্বু-আম্মুর সাথে দেখা হচ্ছে। এখন আর একা একা মনে হয়না নিজেকে। বাড়ির শাওন নামের পিচ্চি ছেলেটার সাথেও বেশ খাতির জমে উঠেছে। পিচ্চি ছেলেটা ওকে মানুষের ভাষা শিখিয়েছে। ব্লু এখন মানুষের ভাষায় অনেক কথাই বলতে পারে। পিচ্চি ছেলেটা ওর খু্ব ভালো বন্ধু হয়ে গেছে এতদিনে । প্রতিদিন সকালে উঠেই সে ব্লুর কাছে ছুটে আসে। ব্লুকে নিয়ে বেশি ব্যাস্ত থাকে বলে মাঝে মাঝে ওর আম্মুর কাছে বকাও খায় সে। আজ সকালে উঠে পিচ্চি ছেলেটাকে দেখেনি ব্লু। ছেলেটার মা আজ ব্লুকে খাবার দিয়ে গেছে। অনেক পরে ছেলেটা বেলকনিতে এল। পিচ্চিটাকে দেখে আজ অবাক হলো ব্লু। ওর মাথায় একটা কাপড় বাঁধা। সবুজ রঙের মাঝখানে লাল রঙের বৃত্ত। পিচ্চিটার আব্বু বলল, বিজয় দিবস কেমন উদযাপন করলে তোমরা?’ ‘খুব ভালো আব্বু৷ প্রথমে কোরআন তিলাওয়াত, তারপর জাতীয় সংগীত গেয়েছি আমরা। শহীদদের জন্য দোয়া করার পর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছে।’ ‘বেশ ভালো।’ ‘আচ্ছা আব্বু, স্যাররা বলল আজকে নাকি আমরা পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়েছিলাম । এটা কি সত্যি?’ ‘হ্যাঁ, সত্যি ৷’ ‘পাকিস্তানিরা আমাদের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিল, তাই না আব্বু?’ ‘হ্যাঁ, কিন্তু এখন তো আমরা স্বাধীন৷’ ‘আমরা কেন স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিলাম আব্বু?’ ‘কারণ, স্বাধীনতা সকল প্রাণের মৌলিক অধিকার। পরাধীনভাবে বেঁচে থাকার কোন গৌরব নেই, নেই কোন স্বার্থকতা।’ ‘পাকিস্তানিরা খুব অন্যায় করেছিল, তাইনা আব্বু? তারা আমাদের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল।’ ‘হ্যাঁ, এগুলো তো জানা কথা।’ ওর খাঁচার কাছেই কথা বলছে শাওন ও তার আব্বু, তাই একান্ত বাধ্য হয়েই ওদের কথা শুনছে ব্লু। বিরক্ত লাগছে ওদের কথায়৷ কিন্তু শাওনের পরবর্তী কথায় আগ্রহী হয়ে উঠল ব্লু। শাওন বলল, ‘তাহলে আব্বু, আমরাও তো অন্যায় করছি৷’ ‘কি অন্যায়?’ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল শাওনের আব্বু। ‘ঐ যে, টিয়া পাখিটাকে খাঁচায় আটকে রেখেছি। তার বাবা-মার থেকে দূরে সরিয়ে তার স্বাধীনতাকে আমরা কেড়ে নেইনি?’ একটু ভাবল শাওনের আব্বু। বললো, ‘তাই তো, ওভাবে ভাবলে এটা অন্যায়ই হয়।’ ‘আব্বু আমি ওকে ছেড়ে দিতে চাই, বেচারা কেমন মনমরা হয়ে থাকে খাঁচার মধ্যে।’ ‘ওকে ছেড়ে দিলে কার সাথে খেলবে?’ ‘আমার খেলার অনেক বন্ধু আছে, অযথা ওকে বন্দি করে কষ্ট দিতে চাইনা৷ তারও তো আমাদের মতো স্বাধীনভাবে বাঁচতে ইচ্ছে করে।’ কথাগুলো বলে চোখ মুছল শাওন৷ শাওনের আব্বু শাওনের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল, ‘খুব সুন্দর উপলব্ধি। আমি খুশি হলাম তোমার কথা শুনে। সবারই স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার আছে, ওকে মুক্ত করে দাও। তোমাকে অন্য খেলনা কিনে এনে দেব।’ শাওন আর দেরি করলোনা এগিয়ে গেল খাঁচার দিকে। ব্লু এদিকেই তাকিয়ে ছিল, এবার সে কথা বলে উঠল, ‘আমার মতো আরো অনেক পাখি এই শহরে খাঁচায় বন্দি। তাদের কি হবে?’ ‘তুমি চিন্তা করোনা, আমার স্কুলের বন্ধুদের নিয়ে এ ব্যাপারে গণসচেতনতা সৃষ্টি করব।’ খুশিতে দুই পাখা উচিয়ে ব্লু বলে উঠল, ‘শাওন.... ই... জ দ্যা গ্রে...এ্যা...ট।’ ব্লুর ভাঙা ভাঙা কথায় হা হা করে হেসে দিল শাওন ও ওর আব্বু। খাঁচা থেকে ওকে বের করে আনল শাওন। শেষবারের মতো হাত বুলিয়ে দিল ওর পালকে৷ ব্লু ওর পালক দিয়ে শাওনের গালটা ঘষে দিল। শাওন মুক্ত করে দিল ব্লুকে৷ ব্লু গোটা ঘরে উড়ে একবার চক্কর দিল, তারপর বেলকনির বাহিরের পেয়ারা গাছে গিয়ে বসল৷ ব্লুর আব্বু-আম্মু আগেই এসে সবকিছু দেখছিল। ব্লু আর একবার তাকাল শাওনের দিকে। মলিন একটা হাসি ফুটে উঠেছে তখন ওর মুখে। ছেলেটাকে ছেড়ে যেতে খারাপ লাগছে ব্লুর৷ দীর্ঘদিন এক সাথে থেকে মায়া হয়ে গেছে। কিন্তু উপায় নেই। যেতেই হবে৷ পাখা নেড়ে ওকে বিদায় জানাল ব্লু। এবার আব্বু-আম্মুর সাথে উড়াল দিল কলোনির পথে। পেছনে ফিরে আর তাকালোনা ব্লু৷ সে আজ মুক্ত ডানা পেয়েছে। (সমাপ্ত)


Post a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.