সোহাগ রহস্য
জুয়েল আশরাফ
নতুন বাড়িতে এসে আগের থেকে একটু বেশিই ডানপিটে হয়েছে সাদাফ। হবে না কেন? পাশেই তার খালার বাড়ি। খালাত ভাই তৌহিদ আর সে সমবয়সী। দু'জনের একসাথে খেলাধুলা, মান-অভিমান, ঝগড়া, ভালোবাসার অন্ত নেই। এ বছর দু'জনে পড়ছে ক্লাশ এইটে। আগের বাসাটিতে সাদাফ ছিল একা। খেলাধুলা কিংবা বন্ধু হবার মতোন কেউ ছিল না। এখানে এসে খালাত ভাইসহ খেলাধুলার জন্য অনেক সাঙ্গ পাঙ্গ পেয়েছে। তাই স্কুল থেকে ফিরে এসে কাঁধের ব্যাগ মেঝেতে ফেলে দিয়েই টেনিস বল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি, ছোটাছুটি, ক্রিকেট নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠবে।
এখানে খেলার জন্য মাঠ নেই, মহল্লার ফাঁকা গলিতেই খেলে সবাই। আজ ক্রিকেট খেলতে গিয়ে একটা দূর্ঘটনা ঘটে গেল। ছক্কা পেটাতে গিয়ে বলের আঘাতে জানালার কাঁচ ভেঙ্গে গেল। ভাঙবি তো ভাঙ, একেবারে খাঁন বাড়ির জানালার কাঁচ! ঝুর ঝুর কাচ ভাঙ্গার আওয়াজে সাদাফ আর তৌহিদ ব্যাট বল নিয়ে খাঁনের সীমানা ছেড়ে দৌঁড়। সঙ্গে অন্যরাও দৌঁড়াচ্ছে। ধরা পড়লে আর রক্ষা নেই। বদমেজাজি খাঁন সাহেব লোকটিকে সবারই ভয়।
অনেক দূর পালিয়ে গিয়ে বাঁচল সবাই। তৌহিদ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, মাঝে মাঝে এরকম দৌঁড় মজাই লাগে। মনে হবে খাঁন সাহেবও আমাদের সঙ্গে দৌঁড় প্রতিযোগীতায় খেলছে।
তৌহিদের কথায় সবাই হেসে উঠে গড়িয়ে পড়ে একজন আরেকজনের উপর। শুধু একজন সাবধানতার গলায় বলল, ধরা পড়লে বুঝবে ঠ্যালা।
এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে। ধরা অবশ্য পড়ে না কেউ। আগেই দলের সবাই পালিয়ে যায়। সাদাফদের পাঁচ-সাত জনের দলটি আপন আত্মীয়ের মতোন। দলের ভেতর সোহাগ নামের একটি ছেলে। ভয়ানক রাগী, জেদি, আর শক্তিশালি। কিন্তু সে বাক প্রতিবন্ধী, কথা বলতে পারে না। তার কথা হয় হাতের ইশারায়। কাউকে মুখে কিছু বলতে পারে না, কারোর উপর অভিমান হলে রাগে গোঁ গোঁ করতে থাকে। আনন্দ পেলে অনেক খুশি প্রকাশ করে। সোহাগের সাথে সাদাফের বেশ বন্ধুত্ব হয়। ছেলেটি ভীষণ দয়ালু। খেলাধুলা শেষে সবাই যখন ঘেমে-নেয়ে জিরিয়ে নেওয়ার জন্য বসবে, তখন সে নিজের পকেটের টাকায় কোল্ড ড্রিংকস সঙ্গে বিস্কুট আর চানাচুর কিনে সবাইকে খাওয়াবে।
অলিগলি ছাড়া খেলার আর জায়গা না থাকায় সবার মনে একটা দুঃখ ছিল। মধুবাগ মাঠে খেলতে হলে বহুদূর যেতে হবে। অতদূর যাওয়ার চিন্তাও তারা করতে পারে না। বাসায় জানাজানি হলে পরে গলিতে খেলাও বন্ধ করে দেবে।
সেদিন স্কুল থেকে বাসায় ফেরা মাত্রই ঝুম বৃষ্টি। এই বৃষ্টিতে ঘরে তাদের আটকে রাখবে কারোর সাধ্যে নেই। বাড়ির লোকদের ফাঁকি দিয়ে ভিজতে ভিজতে সবাই হাজির হলো গলিতে। বৃষ্টির মধ্যে যেই খেলাটা সবচেয়ে বেশি জমে, সেটা হলো ফুটবল। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ওদের কারোর ফুটবল নেই। সোহাগ ছেলেটি, যে জন্ম থেকেই বাকপ্রতিবন্ধী, সে ইশারায় বোঝাল প্রত্যেকের জামা খুলে বলের মতোন বানিয়ে ফুটবল খেলা যায়। সাথে সাথেই তার প্রস্তাবকে লুফে নিয়ে সবাই নিজেদের জামা খুলে ফেলে। সব জামা একসাথে মিলিয়ে লাইননের সুতা দিয়ে শক্ত করে গিঁট মারল। এরপর শুরু হলো খেলা। বৃষ্টিতে ভিজে কৃত্রিম ফুটবল নিয়ে দৌঁড়-ঝাপ, ছোটাছুটি! এমন মধুময় খেলার স্বাদ জীবনে সাদাফ পায়নি। সোহাগের বুদ্ধির প্রশংসা করতে থাকে সে। চরম আনন্দ পাওয়া গেছে। পুরোটাই সোহাগের কৃতিত্ব। দিন দিন সোহাগের সাথে সাদাফের বন্ধুত্ব গাঢ় হয়। সোহাগকে খুবই পছন্দ সাদাফের। সাদাফের মনে শুধু একটাই দুঃখ, ছেলেটা যদি কথা বলতে পারতো! সাদাফকেও সোহাগ খুব পছন্দ করে। মহল্লায় যদি কারোর সাথে সাদাফের ঝগড়া দ্বন্দ্ব লাগে, সোহাগ এসে তাকে উদ্ধার করবে। কারণ সোহাগ ছিল দলের ভেতর সব থেকে বেশি শক্তিশালী। একজন বোবা ছেলে, বাকপ্রতিবন্ধী হয়েও কী করে এত শক্তি শরীরে পুষে রেখেছে! ভেবে ভেবে সাদাফ অবাকই হয়। অবশ্য সে শুনেছে, বোবা মানুষের শরীরে প্রচন্ড শক্তি থাকে। সোহাগ তাকে বহু রকমের বিপদ-আপদ থেকেও রক্ষা করে নিতো। আর তার সাহসও ছিল প্রচন্ড। তার দুর্দান্ত সাহসের মোকাবেলা করার সাহস পেতো না কেউ। বড় বয়সী ছেলেরাও সোহাগের কারণে তাদের সাথে ঝামেলা করতে ভয় পেতো। সোহাগ হয়ে উঠল সাদাফের পরম বন্ধু, শক্তি, ভাই, আনন্দ।
সেদিন খেলতে এসে দেখা গেল সোহাগ আসেনি। পর পর কয়েকদিন খেলতে এসেও সোহাগের দেখা পাওয়া গেল না। সাদাফ তৌহিদকে বলল, সোহাগকে দেখছি না অনেক দিন। চল, বাসায় গিয়ে ডেকে আনি।
একটি ছেলে বলল, বাসায় গিয়ে লাভ নেই। বাসা ফাঁকা। বাড়িতে নেই।
নেই মানে? কোথায় গেছে সে?
ওরা সবাই বাসা ছেড়ে চলে গেছে।
সাদাফ ভীষণ অবাক হয়। ছেলেটির দিকে তাকিয়ে ভুরু দু'টি কুচকে বলল, চলে গেছে মানে?
ছেলেটি বলল, ওর বাবা গোয়েন্দা পুলিশ। একজন আসামীকে ধরার জন্য ওরা এখানে বাসা ভাড়া নিয়ে থেকেছে। সোহাগ বোবা না। বোবার অভিনয় করেছে। কথা বলতে পারতো। ওর বাবা বলে দিয়েছিল, যতদিন এখানে থাকবে বোবা হয়ে থাকতে।
শুনতে শুনতে সাদাফ আরও অবাক হয়। মুহূর্তেই সোহাগের উপর তীব্র অভিমান পেয়ে বসে তার। এত কিছু ঘটে গেল অথচ সে কিছুই জানে না। অন্তত যাওয়ার আগে তাকে বলে যাওয়া উচিত ছিল। সাদাফ বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে।
পেছন থেকে তৌহিদ ডেকে বলল, না খেলেই যাচ্ছিস কেন?
সাদাফ পেছনে তাকাল না। আজ তার খেলায় মন নেই। মনটা খুব খারাপ হয়েছে। সোহাগ তার সাথে রহস্য করে গেল।


Post a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.