রাসেলের প্রিয় ফুলগাছ
ইমরান খান রাজগ্রামের ছেলে রাসেল। ক্লাস ফাইভে পড়ে সে। বাবা রিক্সা চালক আর মা গৃহিণী। খুব বেশি উপার্জন করতে না পারলেও ছোট্ট সংসারে হাসিখুশি দিন কাটায় তাঁরা। রাত নয়টায় পড়াশোনা ও তারপর খাবার খাওয়া শেষে মা-বাবার সাথেই ঘুমিয়ে পড়ে রাসেল। পরদিন সকাল হতেই ঘুম থেকে উঠে হাতমুখ ধুয়ে সকালের খাবার খায়। তারপর সোজা স্কুলের পথে। পাশের বাড়ির সাকিব ও হাসান তার সহপাঠী ও ভাল বন্ধু। তাঁদের সাথেই প্রতিদিন স্কুলে যায় রাসেল।
ঠিক বিকেল চারটায় স্কুল ছুটির ঘণ্টার আওয়াজ শুনে সবাই দৌড়ে বের হয় বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে। স্কুলের মাঠ পেড়িয়ে রাস্তায় উঠতেই রাসেলের চোখ যায় ছোট্ট ভ্যান গাড়ির দিকে। কারণ সেই ভ্যান গাড়িতে রয়েছে কয়েক প্রজাতির মনমাতানো রঙিন ফুলগাছ। আর ফুলগাছ রাসেলের অনেক প্রিয়। ছোটবেলা থেকেই ফুলগাছের প্রতি তাঁর আলাদা টান রয়েছে। বাহারি রঙিন ফুল দেখে ভ্যানের দিকে এগিয়ে যায় রাসেল। গোলাপ ও হাসনাহেনা গাছ দুটো দেখিয়ে সেগুলোর দাম জানতে চায় সে। উত্তরে ভ্যান চালক জানায় গাছ দুটোর দাম একশত টাকা। দাম শুনে রাসেল নিশ্চুপ হয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
যেতে যেতে সে ভাবে এত টাকা তার বাবা কখনোই তাকে দিবে না। কিন্তু এই গাছ দুটো সে হাতছাড়া করতে পারবে না। বাসায় গিয়ে স্কুলের ব্যাগ রেখে হাতমুখ ধুয়ে খাবার খাওয়ার সময় ফুলগাছের কথা তাঁর বাবাকে জানায়। গাছের দাম একশো টাকা শুনে রাসেলের বাবা কিছুতেই দিতে রাজি হয়না। বাবার কথায় কিছুটা মনোক্ষুণ্ণ হলেও মনে মনে সে ঠিকই ফুলগাছের স্বপ্ন দেখে। তখন সে চিন্তা করে যে, প্রতিদিন তাঁর বাবা তাঁকে স্কুলের টিফিনে খাবার কেনার জন্য যেই টাকা দেয় সেই টাকায় টিফিন না কিনে গাছ কিনবে।
যেই চিন্তা সেই কাজ ! প্রতিদিনের টিফিনের টাকা আংশিক বাঁচিয়ে প্রায় মাসখানেকের মধ্যেই রাসেল তাঁর প্রিয় গাছগুলো কেনার জন্য একশত টাকা যোগাড় করে ফেলে। পরদিন পকেটভর্তি টাকা নিয়ে অত্যন্ত খুশি মনে বাসা থেকে বের হয়ে স্কুলে যায়। ছুটির পর সেই ভ্যানগাড়ি থেকে তাঁর পছন্দের গোলাপ ও হাসনাহেনা গাছ দুটি ক্রয় করে বাসায় চলে যায়। বাড়ির উঠানে গাছ দুটো রোপণ করে। প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার পূর্বে এবং স্কুল শেষে বাড়িতে ফিরে গাছে পানি দেয়। এখন তার পুরো চিন্তাভাবনা জুরেই শুধু ফুলগাছ আর ফুলগাছ। নিজের চেয়ে গাছগুলোর যত্ন বেশি করে রাসেল। কিন্তু মাস পেড়িয়ে গেলেও গাছে একটিও ফুলের দেখা পায়না ! সেজন্য তাঁর অনেক মনখারাপ !
দুইদিন স্কুল বন্ধ দেয় রাসেল। কবে গাছে ফুল ধরবে আর কবে তাঁর মুখে হাসি ফুটবে সেটা কে জানে ! ছেলের এমন কাণ্ড দেখে তাঁর বাবাও তাকে কড়া হুশিয়ারি জানিয়ে দেয়। ফাইনাল পরীক্ষায় রেজাল্ট খারাপ করলে গাছগুলো কেটে ফেলা হবে। এমন হুশিয়ারি শুনে খুব ভয় পেয়ে যায় রাসেল। নিজের চেয়ে বেশি ভালোবাসার গাছগুলো কেটে ফেলবে ! এটা মেনে নেওয়া যায় না। তাই পরদিন থেকে লেখাপড়ায় মনোযোগী হয় সে। পরীক্ষায় খুব ভালো ফলাফল অর্জন করে। রেজাল্ট পেয়ে আনন্দে বাসায় ফিরে দেখে তাঁর প্রিয় গাছ দুটোতে অনেকগুলো ফুল ধরেছে। এতদিন পড়াশোনার চাপে গাছের ফুল তার চোখেই পড়েনি। এদিকে ছেলের ভাল রেজাল্ট করার খবর শুনে খুশি হয়ে রাসেলের বাবা তাঁর জন্য আরো দুটি ফুলগাছ কিনে আনে। প্রিয় ফুলগাছে ফুল এবং বাবার উপহার নতুন দুটি ফুলগাছ পেয়ে রাসেল খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায়।


Post a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.