রাফিজ ও মৎস্যকুমারী
জহির টিয়া
' দাদি, ও দাদি। তুমি কোথায় আছো ? '
' এই যে, তেঁতুলতলায় আছি রে দাদু। কিছু কি বলবি তুই ?'
' সারাক্ষণ তুমি শুধু তেঁতলতলায় থাকো ক্যান ? তোমার কি আর কোনো কাজ নেই ? '
'এই বুইড়া বয়সে কি কাজ আর করবো ? নাওয়া খাওয়া আর তেঁতলতলায় সবার সাথে গল্প করা।'
' সারা বছর-ই তুমি তো এই তেঁতলতলায় বসে থাকো। গাছে তেঁতুল থাকলেও না থাকলেও। কার না কার সাথে বসে বসে গল্প করো ?'
' শুনবি তাইলে ?'
' হুঁ, বলো ।'
'তুই তো জানিস আমাকে সবাই 'তেঁতুল খালা' নামে ডাকে। এই দশ গেরামের বাচ্চাকাচ্চা হতে শুরু করে যুবক-যুবতি, বুড়াবুড়ি, পশুপাখি, ভূত-পেতনি, জ্বিন-পরী, মৎস্যকুমারী সবার কাছেই আমি 'তেঁতুল খালা' নামে পরিচিত।'
'হ্যাঁ জানি তো। কিন্তু তুমি তো কখখনো মৎস্যকুমারীদের কথা বলো নি। তারা তো পানিতে থাকে তাই না দাদি ?'
'হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস। মৎস্যকুমারীরা বড় বড় নদী, সাগর, সমুদ্র সৈকতে থাকে।'
' কিন্তু আমাগো তো আশেপাশে তেমন থাকার জায়গা নাই। ওরা অতো দূর-দূরান্ত হতে এখানে আসে !'
'কেউ কেউ আসে। মৎস্যকুমারীদের তেঁতুল খুব পছন্দ। বলতে পারিস ওদের প্রিয় একটি খাবার তেঁতুল।'
'ওহ, তাই নাকি !'
'হ্যাঁ, শুন্ আরেকটা কথা। তোকে তো দাদু কখনো বলা হয় নি। এই যে আমাগো পাশের বিল, সেখানেও মৎস্যকুমারীরা থাকে।'
' কি বললে, দাদি ! আমাগো কুঠির বিলে ?'
' হ্যাঁ রে দাদু আমাগো কুঠির বিলে। দূর-দূরান্ত হতে আসতে সমস্যা হয় তো। তাই ওরা অনেকেই এখানে থেকে একটা রাজ্য গড়েছে। আর যারা মা-বাবাকে ছাড়া থাকতে পারে না। তারা কয়েকদিন পরপর আসে।'
' দাদি, তারাও কি তোমাকে 'তেঁতুল খালা ' বলেই ডাকে ?'
'হ্যাঁ, তারাও আমাকে 'তেঁতুল খালা' বলেই ডাকে।'
'চলো দাদি, চারিদিকে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। দুষ্টু মশাগুলোও মনে হচ্ছে ইনজেকশন দিচ্ছে হুল ফুটিয়ে । ঘরে গিয়ে তোমার কাছে মৎস্যকুমারীদের গল্প শুনতে চাই ।'
দড়ির খাটের ওপর শুয়ে অক্টোপাসের মতো হাত-পা দিয়ে, দাদিকে জড়িয়ে ধরে রাফিজ । দাদি নেকজানও এক খিলি পান মুখে গুঁজে শুরু করে দিলেন, 'শুন দাদু...., তোকে তো বলেছি যে, মৎস্যকুমারীদের প্রিয় খাবার তেঁতুল। তাই না ?'
' কিন্তু তেঁতুল যখন না থাকে দাদি, তখন তারা কি খায় ?'
' তারা তো শুধু তেঁতুল খায় তেমন তো না। অন্য খাবারও খায়। কিন্তু তেঁতুল ওদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় খাবার। যেমন তোর প্রিয় খাবার...... '
' ডিমের হালুয়া ।' দাদির মুখের কথা কেড়ে নিয়ে রাফিজ মুচকি হেসে বলল।
' তেমন ওদেরও । তবে শোন, যখন তেঁতুল থাকে না তখন তারা তেঁতুলপাতার ভর্তা করে খায় ।'
' ওহ, তাই তো দেখি তেঁতুল গাছের ডালে এতো কম পাতা থা--আ---আ---আ---কে ।' বাঘের মতো মুখ 'হা' করে 'হাই ' তুলতে তুলতে ঘুমের মহাসমারোহে ডুবে যাচ্ছে রাফিজ। দাদি নেকজানও মৎস্যকুমারীদের রস টসটসে গল্পে ডুবে যাচ্ছে ।
' এই রাফিজ, চলো, আমাদের সাথে ।'
' কোথায় ? কিন্তু তোমরা মৎস্যকুমারী, তাই না ?'
' হ্যাঁ, ঠিক চিনেছ ।'
' দাদির কাছে তো তোমাদের অনেক গল্প শুনেছি। দাদির বর্ণনা অনুসারে, তাই চিনতে পেরেছি। কারণ কোমর হতে মুখমণ্ডল প্রায় মানুষের আকৃতি হলেও পেছনটা মাছের মতো লেজবিশিষ্ট।'
' হ্যাঁ, কিন্তু এর আগে কখনো আমাদের দেখো নি?'
' না তো। শুধু দাদির মুখে গল্প শুনেছি । তোমরা তো দেখতে অনেক সুন্দর ! ঠিক পরীদের মতো। তোমরা এই পাঁচ জনে কে হও ?'
' আমরা পাঁচ বোন। আমাদের কোনো ভাই নেই । যাবে আমাদের সাথে। তোমাকে আমরা ভাই হিসেবে খুব আদরযত্নে রাখবো ।'
' কিন্তু তোমরা এসেছো কিভাবে ? তোমাদের তো পরীর মতো ডানা নেই ।'
'নেই, সত্য । কিন্তু আমরাও পরীর মতো উড়তে পারি। যখন প্রয়োজন হয় তখনই ডানা বের করি। দেখছো না, আমাদের এই যে মাছের মতো পাখনা। উড়তে গেলেই অটোমেটিক সেটা বড় হয়ে যায়।'
'ওহ, বুঝেছি ।'
' যাবে না আমাদের সাথে ? চলো যাই ।'
' যাবো ।'
বড় মৎস্যকুমারী কাস্তের মতো পিঠটা বাঁকিয়ে রাফিজকে তুলে উড়াল দিল। মুহুর্তের মধ্যেই শোঁ শোঁ শব্দে করতে করতে মৎস্যকুমারীরা তাদের রাজ্যে পৌঁছে গেল। রাফিজ লক্ষ্য করে, বিশাল জলরাশির ভেতর দিয়ে রকেটের মতো গতিতে ছুটছে মৎস্যকুমারীরা। অথচ তার শরীরের জলের একটু ছিটাফোঁটাও লাগছে না। চোখ মেলে চারিদিকে দেখে, ছোটবড় মাছগুলো কেমন করে সাঁতার কাটছে। মৎস্যকুমারীদের রাজ্য পৌঁছে রাফিজ আরো দেখতে পায়। তার সমবয়সী মৎস্যকুমারীরা লাল, নীল, হলুদ, গোলাপী নানান রঙের বাহারী পোষাক পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রাফিজকে দেখেই সকলে ছুটে এলো। কুশল বিনিময় করল। রাফিজ তো দেখে একেবারে অবাক ! কি সুন্দর মৎস্যকুমারীদের রাজ্য ! সারা রাজ্যে জানাজানি হয়ে গেল যে, একজন মানবসন্তান এসেছে তাদের রাজ্যে । সবাই খুশি মনে দলে দলে রাফিজকে দেখার জন্য আসতে লাগল। রাফিজও খুব আনন্দ পাচ্ছে তাদের দেখে। তারা রাফিজকে তাদের রাজ্য ঘুরে ঘুরে দেখাতে লাগল। রাফিজ দেখলো তার সমবয়সী একদল মৎস্যকুমারী রাস্তার পাশে কাঁনামাছি খেলছে। রাফিজও ওদের সাথে কিছুক্ষণ খেললো। ওদের সাথে খেলে দারুণ একটা সময় উপভোগ করল।
তারপর অনেকের বাড়ি গেল। মৎস্যকুমারীদের বিশাল বিশাল নকশা কাটা বাড়ি। ঠিক যেন তাজমহল। মুগ্ধ নয়নে চেয়ে চেয়ে দেখে রাফিজ। আর ভাবে আমারও যদি এমন একটা বাড়ি থাকতো। মৎস্যকুমারীরা অনেক মজার মজার খাবার রান্না করে খাওয়ালো। রাফিজও খুব তৃপ্তি সহকারে খেলো।
রাফিজের খবর মৎস্যরাণীও জেনে গেল। সে রাফিজকে ডেকে পাঠালো। রাফিজকে নিয়ে মৎস্যকুমারীরা পাঁচ বোন মৎস্যরাণীর দরবারে হাজির হলো। রাণী তো রাগে ফোঁস ফোঁস করতে লাগল অজগর সাপের মতো। তিনি গম্ভীর কণ্ঠে জানতে চাইলেন, 'কেন এই মানবজাতি আমাদের রাজ্যে নিয়ে এলে ? তোমরা কি জানো না অন্য কোনো রাজ্যের কেউ আমাদের রাজ্যে আসা নিষিদ্ধ। কারণ, তারা হিংস্র জাতি। তারা সুযোগ পেলে, আমাদের আক্রমণ করে। ধরে নিয়ে গিয়ে আমাদের বন্দি করে রাখে বদ্ধ পুস্কুনিতে ।'
বড় মৎস্যকুমারী নত শিরে বলল, 'রাণী মা, ভুল হয়েছে। আপনাকে না জানিয়ে নিয়ে আসা। কিন্তু রাফিজ তো ছোট্টশিশু। ও তো এগুলো বুঝে না। তাছাড়া ও তো আমাদের আত্মীয়ের মতন। আপনি সামনে, তেঁতুলের আচার নিয়ে খাচ্ছেন। তা কোথাকার আপনি নিশ্চয় তা জানেন ?'
' হ্যাঁ, তেঁতুল খালার গাছের তেঁতুল। সে তো অনেক ভালো মানুষ। তাই তাকে আমরাও ভালবাসি। কেবল তিনি চাইলেই আসতে পারেন অন্য কেউ নয়।'
' তাহলে, মানবজাতি খারাপ কেমন করে হলো ? সবাই তো আর খারাপ না। কিছু কিছু মানুষের জন্য পুরো জাতি তো আর খারাপ হতে পারে না।'
' হ্যাঁ, তোমার কথা ঠিকাছে ।'
' আপনি কি জানেন ? এই মাসুম বাচ্চাটি কে ?'
' না, জানি না। তবে সে তো মানুষেরই বাচ্চা ।'
' হ্যাঁ, সে মানুষের বাচ্চা। কিন্তু সে আমাদের সবার প্রিয় 'তেঁতুল খালা'র নাতি ।'
' ওহ, সে কথা তুমি আগে বলবে না। এসো রাফিজ এসো। না জেনে তোমাকে অনেক অপমান করলাম ।'
মৎস্যরাণী, রাফিজকে বুকে টেনে আদর করে দিলো। পাশের স্বর্ণখচিত চেয়ারে বসতে দিলো। আর সবাইকে ডেকে রাফিজকে পুরো মৎস্যকুমারীদের রাজ্য দেখাতে বললেন। সবাই সমস্বরে হুর-রা দিয়ে হাততালি দিতে লাগল। যেন আসমানের চান তারা হাতে পেয়েছে। মহা উৎসবে মেতে উঠেছে সকলে। দলবদ্ধ হয়ে মৎস্যকুমারীরা রাফিজকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। প্রথমে তাদের দর্শনীয় স্থানগুলো দেখাতে লাগল। 'ইলিবিলি হাইটেক পার্ক' সেখানে গিয়ে তো রাফিজ আসতেই চাচ্ছিল না। আরো ' ক্রিমোগিলি' পাহাড়ের নীল ঝর্ণাধারা, মৎকিমি মিউজিয়াম, এরকম অনেক অনেক স্থান ঘুরে ঘুরে দেখল । রাফিজ এগুলো দেখছে আর বেশ উপভোগ করছে।
'রাফিজ, ও রাফিজ। ভাত খেয়ে নে বাবা। অনেক রাত হয়ে আসছে।' মায়ের ডাকাডাকিতে রাফিজের ঘুম ভেঙে যায়। চোখ মেলে দেখে, সে তার দাদির পাশে শুয়ে আছে। দাদি এখনো গল্প বলে যাচ্ছে। এমন মিষ্টি স্বপ্ন দেখে, হাসতে হাসতে খাবার টেবিলে চলে গেল রাফিজ।


Post a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.