আমি এবং তিনি-শিশুতোষ

 আমি এবং তিনি

খায়রুল আলম রাজু    


১ 
দিনটা শুক্রবার। সময়টা ডিসেম্বর মাস।  ছুটির দিন। স্কুলও বন্ধ। কিন্তু লাইব্রেরী খোলা। সেদিনের বিকেলটা ছিল রূপকথার মতো। হয়তো এমনই একটি বিকেল আমি খুঁজছিলাম। নয়তো এমনই একটি বিকেল আমি চেয়েছিলাম। কী ছিল সেই বিকেল জুড়ে? কী পেয়েছিলাম সেই বিকেলে? যা পেয়েছি তা পাওয়ার কথা ছিল না। যা পেয়েছি হয়তো পাওয়ার প্রয়োজন ছিল। নয়তো আমি পেলাম কেনো? সাথীরাও পেয়েছিলো ঠিকই; কিন্তু ওরা চিনতে পারেনি! আমি চিনতে পেরেছি এটা হয়তো ভাগ্য ছিল। না, এটা হয়তো আমার প্রাপ্য ছিল। না, আমি কোনো বিখ্যাত ব্যক্তির দেখা পাইনি। কিন্তু উনার সৃষ্টি পেয়েছি। পুরোটা নয়, টুকরো। টুকরো কেনো? পুরোটা তবে কতটুকু বড়? টুকরো তবে কতটুকু ছোট? এসব আমি ভাবতে পারি। মাপতে পারি না! কিন্তু হ্যাঁ, আমি একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা পড়ছিলাম। সত্যি হলো এটাই যে, আমি এক বইপোকা। ভীষণ বইপোকা। পত্রিকা তেমন পড়ি না ঠিক। কিন্তু সেদিন পড়ছিলাম। হঠাৎ করে চোখ জোড়া চমকে গেলো! শিশুতোষ পাতায় চোখ জোড়ানো একটি কিশোর কবিতা। মনমাতানো একটি কিশোর কবিতা। ঝংকারময় ছন্দের একটি কিশোর কবিতা। কবিতাটি হলো এমন, 

বাবা এবং মা
ফারুক নওয়াজ   

মা যদি হয় স্নেহের আঁধার মা যদি হয় আদর... 
মা যদি হয় হিম-সকালে ওম মাখানো চাঁদর... 
মা যদি হয় কোলটি জুড়ে  ঘুমপাড়ানো আসন... 
বাবা তখন দুষ্টু খোকার পড়তে বসার শাসন। 

এমন বিকেল আমি প্রতিদিন খুঁজি। এমন কবিতা আমি প্রতিদিন চাই। কিন্তু হঠাৎ করে সেই দিন আসে না। হঠাৎ করে এমন বিকেল আসে না। হঠাৎ করে কেউ পত্রিকা পড়ে না। হঠাৎ করে এমন কবিতা কেউ পড়ে না। আমি হঠাৎ করেই পড়েছি। আমি হঠাৎ করেই পেয়েছি। আমি হঠাৎ একদিন এমন বিকেল চাই না। আমি প্রতিদিন এমন  হঠাৎ একটি বিকেল চাই। পুরো মাস, পুরো বছর জুড়ে চাই। যে কবিতা আমাকে জাগিয়ে তোলেছে। যে কবিতা আমায় লিখতে শিখিয়েছে সেই কবিতা আমি প্রতিদিন পড়ি। ততোটাই পড়ি যতোটা কেউ পড়ে না! ততোটাই দেখি যতোটা কেউ দেখে না। পড়তে পড়তে আমি চাঁদের মতো জেগে থাকি। ফুলের মতো জেগে থাকি। রাত থেকে রাতভর... ঘুমহীন।  দেখে দেখে আমি—পুলকিত হই। ছন্দের তালে—পথ ভুলো হই। তবুও হঠাৎ একদিন চাই—কবিতার মতো সুন্দর।
                            
২ 
ঘুমিয়ে আছি। আম্মু ডাকছেন, “শুভ, এই শুভ...শুভ...।” স্কুলে যাবি না? ওঠ জলদি। এতো সময় কেউ ঘুমায়? আজকাল এতো ঘুম কিসের? কান টেনে বললেন আম্মু,“রাত জেগে কবিতা লিখছিলি, টেবিলে কি এসব?” আমি বলতে পারি না। কথার খেলায় নিরুত্তর। সেদিন আর স্কুলে যাওয়া হলো না।  টেবিলে বসে পড়তে বসেছি। মন বসে না! খেলতে যাবো — ভাল্লাগে না। কবিতাটি পড়ছি। সেই বিকেলের কবিতা। সেই থেকে শুরু নতুন জীবন। কবি ও কবিতার জীবন। ছন্দ ও শব্দের জীবন। তাল, লয়, মাত্রা, পর্ব ও বৃত্তের জীবন। আম্মুরও এসব ভাল্লাগে। ছড়া পড়তে, কবিতা পড়তে। আমার ভাল্লাগে— লিখতে। ছড়ার মতো করে ছড়া—লিখতে।কবিতার মতো করে কবিতা—লিখতে। কিন্তু তেমন পারি না। আম্মু বলতেন, “চেষ্টা কর, চেষ্টার মৃত্যু নেই। চেষ্টাই একদিন স্বপ্ন জয়ের কেতন হয়।” বাণীটা আমার কাছে রত্নতুল্য। হিরের মতো দামীও বটে। সেদিন থেকে শুরু টুকিটাকি লেখালেখির। হিজিবিজি কত কিছুই না লিখেছি। আম্মু ছিলেন প্রথম পাঠক। পড়েই লাফিয়ে উঠতেন আর বলতেন, “বাহ বাহ, দারুণ সুন্দর! অভিনন্দন।” আম্মু যেনো পুরো শিশুর মতো। তবুও আমার ভাল্লাগ তো। একদিন কবিতা লিখলাম এমন, 

মায়ের কাছেই হাতেখড়ি আর 
মায়ের কাছেই শুরু—
হয়তো মা'ও ছিলেন আমার 
পদ্য লেখার গুরু!                       
    

ছড়াটি পড়েই আম্মু মুখে হাসির বন্যা। আকাশ সমান আনন্দ! জড়িয়ে ধরে বললেন, “তুই পারবি, তুই পারবি। একদিন তুই অনেক বড় হবি।” আম্মুর কথায় হেসে কুটিকুটি হতাম। লুটিয়ে পড়তাম বিছানায়। শিশির যেমন লুটিয়ে পড়ে—সবুজঘাসে। ধীরে ধীরে ছড়া লেখাটা আয়ত্তে আসে।টুকিটাকি  ছড়ায় ভরে যায় টেবিলপাড়ের খাতাগুলো। স্বপ্নের শুরুটা এভাবেই হলো। মায়ের উৎসাহ আর অনুপ্রেরণার ভিড়ে। শিশুর মতো হাসির ভিড়ে। ফুলের মতো হাসির ভিড়ে। চাঁদের মতো হাসির ভিড়ে মা তখন নতুন স্বপ্নের সঙ্গী আমার। এক পাহাড় অনুপ্রেরণা। এক সাগর উৎসাহ আর পথ চলার বন্ধু...
এমন স্বপ্ন জীবন  আসতো না, যদি না ওই বিকেলটা আসতো। হয়তো এমন একটি স্বপ্নের শুরুর জন্যই,  ওই বিকেলটা উপহার ছিল এক জীবনে। তারপর ২০২০ সালের বইমেলায় আমাদের প্রথম দেখা।  বাকীটা স্বপ্নের মতোই স্বপ্নিল...

0/Post a Comment/Comments

Please do not enter any spam link in the comment box.

Stay connected

FACEBOOK- Fans Like
TWITTER- Followers Follow
YOUTUBE- Subscribers Subscribe

Subscribe us

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner