টিকটিকি-ঠিকঠিকি
- জুয়েল আশরাফ
কাটা লেজের দিকে তাকিয়ে টিকটিকি মশায় হো হো হো করে হেসে উঠল। ঠিকঠিকি অবাক হয়ে বলল, হাসছো কেন?
টিকটিকি বলল, একটা পুরানো ইতিহাস মনে পড়ে হাসি পেল।
-কীসের ইতিহাস?
-ওই যে দেখো জানালার কাছে, পাজি ছেলেটা দাঁড়িয়ে। ওর বন্দি দশা দেখে হাসি পাচ্ছে।
ঠিকঠিকি দরদ গলায় বলল, থাক হেসো না। ওদের মানুষদের করোনার ভয়। বাইরে বেরোনো বারণ। কারোর সাথে মিশতে পারে না। স্কুলে যেতে পারে না। শপিং করতে পারে না। বন্ধুদের সাথে খেলা পর্যন্ত বন্ধ। তাই তো মন খারাপ নিয়ে ঘরে বন্দি।
টিকটিকি বিজয়ীর হাসি হেসে বলল, হতচ্ছাড়াটার জন্য উচিত হয়েছে। ওর এই পরিণামে আমি খুব খুশি।
ঠিকঠিকি জিজ্ঞেস করল, তুমি ওর ওপর এত রাগ কেন?
টিকটিকি বলল, আমার কাটা লেজটা দেখেছো? লেজ কাটা যাবার কারণে টিকটিকি-সমাজে আমি মুখ দেখাতে পারি না। মান সম্মান আর থাকল না। এই অবস্থার জন্য পাজি ছেলেটা দায়ী।
ঠিকঠিকি বলল, এর জন্য ছেলেটা দায়ী থাকবে কেন?
-ঘটনা কী ঘটেছিল শোনো, সুস্বাদু একটা পোকা খাওয়ার জন্য আমি দেয়াল-দেয়ালে ছুটছিলাম। পোকাটার পিছু দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে হাঁপিয়ে উঠি। ক্লান্ত হয়ে থেমে যাই। অধিক ক্লান্তির কারণে ঝিমুনি এসেছিল। ঘুম ঘুম ভাব। দেয়াল ঘেষে ছিল পাজি ছেলেটার পড়ার টেবিল। হাতে লাঠি নিয়ে পাজিটা আমাকে পেটাবার জন্য কখন যে এগিয়ে এসেছে, খেয়ালই করিনি। যখন টের পেলাম, দৌঁড়ে পালাবার জন্য ছুটছি, ঝড়ের গতিতে আঘাত এলো আমার লেজের ওপর। নিজের জীবন তো বাঁচল। কিন্তু লেজটা হারালাম চিরতরে। লেজের মায়া ভুলতে পারছি না। এই দূরবস্থার জন্য দায়ী ওই পাজিটা। ওর বন্দি দশা দেখে আমি হাসব। চিৎকার করে হাসব।
বলতে বলতে টিকটিকি খিলখিল করে হাসতে থাকে। ঠিকঠিকি কথা বাড়ানোর আর সাহস পেল না। এগারো মাস ধরে টিকটিকির সাথে সংসার, তার রাগ সম্পর্কে জানে। ভয়ানক রেগে গেলে টিকটিকি রাগে খিলখিল করে হাসে, সারাদিনেও সেই হাসি থামানো যায় না।
ঠিকঠিকি চলে গেল দুপুরের খাবার আয়োজন করতে। আয়োজন তেমন কিছু না, গতকালকের জমানো অনেক খাবার রয়ে গেছে। তা দিয়েই আজকের দিন চলে যাবে। সকালে চারটা তেলাপোকা দুজনে ভরপুর খেয়ে সুন্দর ব্রেকফাস্ট হয়েছে। দুপুরের লাঞ্চের জন্য কিছু মাছি মাকড়সা খেয়ে নিলেই হবে। আর রাতের জন্যও চিন্তা নেই। ডিনারের জন্য একটা আস্ত টেরমেটস বরাদ্দ আছে। কাজেই আজ খাবার সংগ্রহের জন্য দৌঁড়-ঝাপের দরকার নেই।
দুপুরে খেয়েদেয়ে টিকটিকি আরামের জন্য ঠিকঠিকির লেজের ওপর মাথা রাখে। শুয়ে শুয়ে গল্প শোনে। মানুষের গল্প। মানুষের করোনা নিয়ে গল্প। ঠিকঠিকি বলে, কী আজব রোগ হয়েছে মানুষের। সংক্রামক। ছুঁয়ে দিলেই নাকি রোগ হয়! সাবান-পানি দিয়ে বারবার হাত ধোয়া লাগে। হাঁচি এলে মুখ ঢেকে রাখতে হয়। জনসমাগম উপেক্ষা করতে হয়।
টিকটিকি জিজ্ঞেস করল, এই করোনার বাড়ি কই? কোথ্থেকে আসছে?
ঠিকঠিকি উত্তর দেয়, বিদেশী রোগ। বিদেশ থেকে আসছে। আমাদের মতো এদেরও কোনো দেশে ঢুকতে পাসপোর্ট ভিসার দরকার হয় না।
টিকটিকি হাই তুলতে তুলতে বলল, কতোদিন থাকবে এরা?
ঠিকঠিকি বলে, তা তো জানা নাই। তবে দ্রুত এই রোগ বিদায় হোক। দেখছ তো ছোট্ট ছেলেটা সারাদিন ঘরে আটকা পড়ে থাকে। বাইরে যেতে পারে না। খেলতে পারছে না। ছেলেটার জন্য আমার খুব মায়া হয়। করোনা যদি কোনো পোকামাকড় হতো তাহলে আমি সব করোনা খেয়ে সাবাড় করে দিতাম। ছেলেটা আর ওর ছোট বোনটা, দুজনেই বাইরের পৃথিবীতে ঘুড়ে বেড়াতে পারতো।
টিকটিকি ঠিক ঠিক করে বলল, হ ঠিক বলছো। ছেলেটার জন্য আমারও এখন খুব মায়া হচ্ছে।
ঠিকঠিকি আনন্দ গলায় বলল, চলো আমরা দুজন মিলে ওদের ভাইবোনদের কিছু বিনোদন দেওয়ার চেষ্টা করি। এতে ওদের বন্দি জীবন কিছু হলেও আনন্দে কাটবে।
টিকটিকিও উৎসাহের সঙ্গে বলল, হ্যাঁ চলো। আমরা ওদের আমাদের সঙ্গীত শোনাব। টিকটিকি-সঙ্গীত।
দুজনেই এলো পড়ার টেবিলের কাছাকাছি। ছোট্ট মানুষ দুটিকে গান গেয়ে শোনাবে। কিন্তু টিকটিকি থমকে গেল। ঠিকঠিকি বলল, কি হলো? হাঁটছো না কেন?
টিকটিকি বলল, পেটে মোচড় দিচ্ছে। পেটে ব্যথা হচ্ছে। দুপুরে খাবারটা বেশি খেয়ে ফেলেছি।
বলতে বলতেই টিকটিকি পায়খানা করে দিল। ঠিকঠিকি দেখল, কালো রঙের সেই পায়খানা গিয়ে পড়েছে ছোট্র মেয়েটার হাতের ওপর। নাকের কাছে নিয়ে জিনিসটার গন্ধ শুঁকতেই মেয়েটার চোখমুখ বিরক্তিতে কুঁচকে গেল। ছোট্ট ছেলেটি জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?
মেয়েটি বলল, কী বিশ্রী দুর্গন্ধ!
ছেলেটিকে বলতে শুনল, দাঁড়াও, খবর করে ছাড়ব!
ঠিকঠিকি আঁৎকে উঠে বলল, সর্বনাশ হয়ে গেছে!
টিকটিকি বলল, কী হলো?
-ভাগো তাড়াতাড়ি। জলদি ভাগো।
-ওদের গান শোনাবে না?
-রাখো তোমার গান, আগে তো জীবন বাঁচাও। পালাও জলদি!
ঠিকঠিকির কথা শেষ না হতেই টিকটিকি দেখল, তার কানের কাছে ঝড়ের বেগে সা সা আওয়াজে লাঠির মতো একটা...।
'ও মাগো!' চিৎকার দিয়েই টিকটিকি দৌঁড়, সাথে ঠিকঠিকিও। দুজনেই দৌঁড়াচ্ছে।
টিকটিকি গানের সুরে বলল,
আর যাব না মানুষের বাড়ি
মানুষগুলো বাড়াবাড়ি
রাগলে দেয় লাঠির বাড়ি
মানুষের সঙ্গে আড়ি ।।
ঠিকঠিকি বলল, ঠিক ঠিক ঠিক।


Post a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.