সুস্থ শহর-ছোট গল্প

 সুস্থ শহর

জারিন তাসনীম রুকু



সকাল সাড়ে সাতটা। ঘুম থেকে উঠেই আসিফের কান অবধি কিছু কথা এসে বেঁধে যাচ্ছে। অহনা চিল্লাচ্ছে। আসিফের কাছে এসব নিত্যদিনকার ঝঞ্ঝাট।
আসিফ খানিকটা উচ্চ কন্ঠে বললো, এই প্রতিদিনকার খ্যাচখ্যাচানিটা আমি আর নিতে পারছি না।
-ছেড়ে দাও, নিও না, কে নিতে বলেছে? কে ধরে রেখেছে? অহনা তীক্ষ্ণ  দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো।
পাচঁ বছর আগে, আরো পাঁচ বছর আগের একটি সম্পর্কের পূর্ণতা দিতে সংসার জীবন শুরু করেছিলো অহনা আসিফ। আজ তার ইতি কাটার দিন। স্বাক্ষরিক ইতিটা আজ। তবে কোর্ট কাচারি ওসব তো থাকছেই তারপর আবার তাদের কথামতে কিছুদিন একসাথে থাকা, যেটা আসিফ অহনা কেউ মানবে না। স্বাক্ষরিক অর্থে ১৬ মার্চ, ২০২০ সাল। সব শেষ ১৭ তারিখ টা গেলে ১৮ তে অফিসিয়াল কাজে পা বাড়াবে। এরপর সব স্মুথলি ডান লিগ্যাললি হাজব্যান্ড ওয়াইফ এর যেই তকমা টা লেগে আছে মুছে যাবে। সব প্ল্যানমাফিক চলতে চলতে আটকে গেলো।
ফজরের নামায শেষে অহনা ছাদের কিনার ঘেষে দাঁড়িয়ে সকাল দেখছে। আসিফ পিছন থেকে এসে বললো, তোমার কফি...।
অহনা কফিতে চুমুক দিতে দিতে বললো, তোমার এই কফিটার প্রতি দিনকে দিন আসক্ত হয়ে যাচ্ছি।
আসিফ ঠোঁটের কোনায় এক চিলতে হাসি এনে বললো, ভেবেছিলাম কী ঠিক সাতাশ টা দিন আগে যার সাথে ডিভোর্সটা হয়েই যাচ্ছিলো তাকেই এর মাঝে আবার ভালবাসতে শুরু করবো, সকাল বেলা উঠে তার জন্য কফি বানাবো।
অহনা স্মিতহাস্যে বললো, শুভ নববর্ষ আসিফ।
আসিফ খানিকটা হতভম্ব হয়ে বললো, আজ ১৪ এপ্রিল জানি, কিন্তু আজ যে পহেলা বৈশাখ সেটা গুলিয়ে ফেলেছিলাম। ১৪ই ফেব্রুয়ারী ভালোবাসা দিবস না দিয়ে অন্য কোনো একটা তারিখ দিতে পারতো।
অহনা বললো, আমি একদম গুলিয়ে ফেলি না।দিনগুলা খুব বিশেষ হয়ে গেছে আসিফ। ভাবো একবার সাতাশটা দিন আগের সময়টা কী এমন ছিল। 
-আচ্ছা তুমি না হয় আগের বৈশাখের দিনটা কেমন কেটেছিল ভাবো। তোমার ভার্সিটির প্রোগ্রাম সকাল সকাল তুমি শাড়ি পরে বেড়িয়ে গেছিলে,আর হাফ বেলা ঘুমিয়ে আমি আমার প্রাইভেট সেক্টরের ডিউটি পালন করতে গেছিলাম।
-বরং ওর চেয়ে এই দিনগুলোই তোলা থাক যেখানে বাইরে না গিয়েও সকালটা এত সুন্দর হয়।
আসিফ অহনার দিকে তাকিয়ে বললো, কিচ্ছুই না শুধু একটু মিসঅ্যান্ডার্স্ট্যান্ডিং, লাগতো সময় আমরা ভেবেছিলাম ডিভোর্স পেপার।
অহনা বললো, তোমার পুরানো অভ্যেস টা থেকেই গেছে না...? সকাল হলে রবীন্দ্র সঙ্গীত শোনা।
-অনেকদিন অভ্যেসটাকে ভুলে গেছিলাম, তুলে রাখা অভ্যেসগুলোকে গভীর থেকে বের করে ধুলো মুছে ঝকঝকে করে তুলছি
-আমিও তোমার পুরোনো অভ্যেস?
-আগের দিনগুলোতে তোমায় কফি খাইয়েছি বলে মনে পরে না।
-তা ঠিক। আগের প্রেমটা অন্যরকম ছিল। সকাল সকাল তোমার গাওয়া 'হয়তো তোমারি জন্য' গানটা তখন অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল।
-হ্যাঁ। তুমি খানিকটা আমার কাছে নিত্যদিনের সুরেলা কন্ঠ, যাকে ভুল করে টনসিল ভাবতে শুরু করেছিলাম।
রোদ পরেছে...
আসিফ বললো, দু'জন মিলে রান্না করি না অনেক দিন। করবে?
দু'জন মিলে ঘটি বাটি ধরে গরম ভাত, ডাল আর সাথে ইলিশ ভাপা করে দুপুরের খাবারটা খেয়ে ফেললো।
-শাড়ি পরবে না, অহন?
অহনা আঁতকে উঠলো অনেকগুলো বছর পর পরিচিত মুখে পরিচত ডাক শুনল।
-কতগুলো বছর পর ডাকলে হিসেব আছে??
-হিসেব করে কিছু কী হয় অহন...! এই যে ভালোবাসাটা  হিসেব করে করা যায়? ঘুরেফিরে তোমার এডওয়ার্ডের বই এর ম্যাথ গুলোই হয়তো বা শুধু হিসেব কষে করা সম্ভব বুঝলে?
অহনা সাদা শিফনের শাড়ির সাথে সিঁদুর লাল রঙের মখমলের ব্লাউজ পরেছে। আসিফ ওর পায়ে আলতা পরিয়ে দিচ্ছে।
আসিফ অহনার দিকে তাকিয়ে বললো, মনে হচ্ছে খুব পবিত্র একটা সম্পর্ককে চারপাশ দিয়ে লাল রঙের কোটেশন দিয়ে দিচ্ছি।
-রঙটা ভালোবাসার। কোটেশন না বলে ভালোবাসা বললেও চলতো।
আসিফ এর হাতে আলতার রঙ পরেছে। আসিফ বললো, হাতটা ধুয়ে আসছি।
অহনা আসিফ এর হাত ধরে বললো, পবিত্র সম্পর্কের  চারপাশের ভালোবাসার রঙই তো।থাক না হয়, সম্পর্কটা তো আমাদেরই।

বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা। অহনা চায়ের কাপটা আসিফের দিকে বাড়িয়ে দিলো। আসিফ চায়ের কাপটা ধরে বললো,এক কাপ চায়ে আমি তোমাকে চাই...
-অনেকদিন পর সুর তুললে।
-সুরে বেসুরে আমি তোমাকে চাই...
অহনা হাসছে, প্রচন্ড মায়াবী চোখে চেয়ে আছে আসিফের দিকে।
আসিফ বললো, সেদিন সরকার লকডাউন না করলে ডিভোর্স পেপারটা নিয়ে আমরা ফাইনাল ডেস্টিনেশন অবধি চলে যেতাম।
-বুঝতেই পারতাম না সম্পর্কটার ভীত মজবুত আছে। শুধু ওপরটা খষে গিয়েছিলো একটু। শুধু মেরামত লাগতো, আমরা তো উপড়ে ফেলছিলাম
-সম্পর্কের ভীতটাতো সময়টুকু পেয়ে ঠিক হয়ে গেলো। শহরটা সময়টা পেয়ে আগের মতো সুস্থ হয়ে উঠবে তো!
-ইনশাআল্লাহ। 
প্রায় রাত তিনটা। অহনা আসিফ তাহাজ্জুদের নামায আদায় করছে দু'জনের মোনাজাত জুড়ে একই দোয়া- শহরটা সুস্থ হয়ে যাক, বিহঙ্গের মতো পাখা মেলে উড়ে বেড়াক ভালোবাসা।

0/Post a Comment/Comments

Please do not enter any spam link in the comment box.

Stay connected

FACEBOOK- Fans Like
TWITTER- Followers Follow
YOUTUBE- Subscribers Subscribe

Subscribe us

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner