রহিমার গল্প
- সুমন আহমেদ
ভালোবেসে বিয়ে করেছিল মনছুরকে। বাবা মায়ের অবাধ্য হয়ে মনছুরের হাত ধরে ঘর ছেড়েছিল রহিমা। ধনী বাবার অতি আদরের একমাত্র মেয়ে রহিমা। আর দিন-এনে, দিন খাওয়া, সর্বহারা মনছুর চাচার কাছে মানুষ। শৈশবে মনছুরের বাবা মা, দুজনই সরক দূর্ঘটনায় মারা যায়।
তারপর একটু একটু করে চাচার কাছেই বড় হয়।
মনছুরের সেই ছোট্টবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রবল ইচ্ছে ছিল। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অভাব অনটনে তা আর হয়ে উঠেনি। জিএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পর- পেটের দায়ে লেগে গেল কর্মের পিছু। ভাড়ায় একটি সিএনজি চালাতো মনছুর। এইভাবে কেটে গেল কয়েক বছর। হঠাৎ একদিন মনছুরের সিএনজিতে উঠেন রহিমা। গন্তব্যে পৌঁছে নেমে গেলেন। কিছুটা পথ যাবার পর মনছুর লক্ষ করে দেখে- তার গাড়ির ভেতর একটি ব্যাগ পরে আছে। বুঝতে পারল ব্যাগটা সম্ভবত সেই মেয়েটার। ব্যাগটা দেওয়ার জন্য আবার রহিমার বাড়িতে ফিরে গেল।
-এই ব্যাগটা কি আপনার?
-কোথায় পেয়েছেন এটা?
-আমার গাড়িতে পড়েছিল।
-আপনি জানেন এই ব্যাগে কি আছে?
-সেটা আমার জানার কোনো প্রয়োজন নেই। এবার বলুন এটা আপনার কি না? আপনার না হলে আমি চলে যাবো এবং এই ব্যাগের মালিককে খুঁজে বের করতে হবে।
-হ্যাঁ এটা আমারই এবং এই ব্যাগে দুইলক্ষ টাকা আছে।
মনছুর ব্যাগটা খুলে টাকাগুলো গুনে দেখলেন পুরোপুরি দুই লক্ষ টাকা। রহিমা দশ হাজার টাকা পুরস্কার দিতে চাইলো কিন্তু মনছুর টাকা কিছুতেই নিলেন না । মনছুরের সততা দেখে রহিমা মুগ্ধ হয়ে গেল। তারপর থেকে দুজনার মধ্যে শুরু হয় ভালোবাসার সম্পর্ক। দীর্ঘ তিন বছরের ভালোবাসার ইতি টেনে সবার অবাধ্য হয়ে বিয়ে করল মনছুরকে। বিয়ের ঠিক একবছর পর রহিমা মা হতে চলেছে। আর এই দিকে মনছুর দিন দিন নষ্ট হয়ে যেতে লাগলো মাদকে আসক্ত হয়ে। গর্ভবতী রহিমাকে টাকার জন্য প্রতিদিন অমানুষিক নির্যাতন করে। মনছুরের শত
আঘাতের পরেও ফিরে যায়নি বাবা মায়ের কাছে। কোন মুখ নিয়েই বা যাবে? যাবার তো কোনো পথই খোলা রাখেনি। রহিমার পেটের অনাগত সন্তান দিন দিন বড় হতে লাগল। হঠাৎ একদিন রহিমার প্রসব ব্যথা উঠল। সাথে সাথেই পাড়া প্রতিবেশী হসপিটালে নিয়ে গেল। জ্ঞান ফিরতেই লক্ষ করে দেখে তার পাশে একটা ফুটফুটে চাঁদের কণা শুইয়ে আছে। কন্যা সন্তানের মা হলেন রহিমা; এ যেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুখ, মেয়ের চাঁদমুখ দেখে মুহুর্তেই ভুলে গেল সব দুঃখ কষ্ট। রহিমার সিজারিয়ান হয়েছিল। এক সপ্তাহ হয়ে গেল রহিমার কোনো অভিবাবক আসেনি হসপিটালের বিল পরিশোধ করতে। এদিক দিয়ে ডাক্তার নার্স রাগ দেখিয়ে মুখ দিয়ে যা আসছে তা-ই বলছেন। একজন বলছেন এই বাচ্চার বাবা কোথায়? আর একজন বলছেন, আরে এটাতো রঙ্গলীলার পাপের ফসল বাবা কোথা থেকে আসবে!
রহিমা মাথা নিচু করে চুপ করে রইলো আর চোখের জলে বুক ভাসাতে লাগলো। যার জন্য বাবা মা আত্মীয়স্বজন বিশাল অট্টালিকার সুখ বিসর্জন দিয়েছে আজ, সেই মানুষটা হসপিটালের বিল পরিশোধ করা তো দূরের কথা- স্ত্রী আর মেয়েকে একটি বারের জন্য দেখতে এলো না!
হাজারও কষ্ট বুকে নিয়ে, লজ্জা-ঘৃণায় নিজেকে আর পোষ মানিয়ে রাখতে পারল না। বেঁচে থাকার শেষ সম্বল একমাত্র মেয়েকে কোলে নিয়ে হসপিটালের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পৃথিবীকে চিরতরে বিদায় জানিয়ে চলে যায় রহিমা ও তার সাতদিনের নবজাত শিশু।


Post a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.