পিনুর বন্ধু পুঁইগাছ-শিশুতোষ

 পিনুর বন্ধু পুঁইগাছ

    - জহির টিয়া 

ভাদ্র মাস। নদীর পানি ফুলে ফেপে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। যেদিকে তাকাই শুধু পানি আর পানি । 
পিনুদেরও বাড়ির উঠোন জুড়ে পানি। তাদের বসতবাড়িটা অন্য সবার চাইতে একটি উঁচু। তাদের গ্রামের সবার বাড়িঘর ডুবলেও পিনুদের বাড়িটা জেগে আছে। কারণ, গতবছর বাইরে হতে মাটি সংগ্রহ করে বাড়িটা উঁচু করেছিল তারা। তাতে তার বাবার বেশ কয়েক হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। তার বদলেই গ্রামের অন্যদের চাইতে একটু হলেও ভালো আছে। বাড়ির ভেতরে পানি না ঢুকলেও চারিদিকে পানি মৌমাছির মতো গনগন করছে। যে কোনো সময় বাড়ির ভেতরে হুর-রা দিয়ে ঢুকে পড়তে পারে। উঠোনটা জেগে আছে তাই গতকালকেও পিনুর বেশ কয়জন বন্ধু পানি সাঁতরে খেলতে এসেছিল। কিন্তু আজ উঠোন ডুবে যাওয়ায়, কেউ খেলতে আসেনি। মাগরিব আজানের ঠিক কিছুক্ষণ আগে, পিনু তাদের উঠোনে গিয়ে দাঁড়ায়। পানিতে পায়ের পাতা ডুবে আছে। পা দিয়ে পানিতে নাড়া দিচ্ছে, আর আনমনে বন্ধুদের কথা ভাবছে। আজ বন্ধুদের কাছ থেকে সে বিছিন্ন। গতকালকেও বেশ মজা করে খেলেছিল বন্ধুদের সাথে। পিনু এবার তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। করোনা ভাইরাসের জন্য স্কুল বন্ধুদের, প্রিয় শিক্ষকদের হারিয়েছে গত কয়েক মাস হতে। আবার কবে স্কুল খুলবে সেটাও ভরসা নেই। স্কুল বন্ধ থাকলেও পাড়ার বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা করে ভালোই সময় কাটছিল। কিন্তু আজ সেটাও হারিয়ে গেল বন্যার কারণে। 
এসব ভাবতে ভাবতে মন খারাপ করে, বাড়ির দিকে পা বাড়াতেই পিনুর কানে ভেসে এলো-
-পিনু, ও পিনু। আমাকে তোমার সাথে নিয়ে যাও।
পিনু পেছন ফিরে তাকায় । উঠোনের চারপাশে চোখ ঘুরায়। কোথাও কাউকে দেখতে পায় না। মনের ভেতরে ভয় জাগে পিনুর। ভূতটুত হবে নাকি এই ভেবে। কাউকে না দেখতে পেয়ে আবার বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। এমন সময় আবার কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে ডাক দেয়-
-পিনু আমাকে রেখে যেওনা। না হলে রাতের ভেতরেই ডুবে মারা যাবো। প্লিজ, তোমার সাথে আমাকে নিয়ে যাও।
এবার পিনু হকচকিয়ে যায়। পেছন ফিরে খেয়াল করে, ছোট্ট পুঁইগাছটা মাথা দোলাচ্ছে। পিনু একটু অবাক হয়ে ভাবছিল, পুঁইগাছ কি কথা বলতে পারে? কিন্তু পুঁইগাছটার মাথা দোলা দেখে, বুঝতে পারে এই পুঁইগাছটাই তাকে ডাকছে। উঠোনের কোণে ছোট্ট একটা পুঁইগাছ। তার গলা পর্যন্ত ডুবে আছে জলে। মাথার চার/পাঁচটা পাতা নিয়ে জেগে আছে গাছটা। তাতে একটা পিপীলিকাও দেখতে পেলো পিনু। পুঁইগাছটা তাকে আশ্রয় দিয়েছে। পিনু পা টিপেটিপে, পানি ভেঙে তার কাছে গেল। পিনু জিজ্ঞেস করল,
-তুমি কি আমায় ডাকছিলে? গাছের জীবন আছে জানি কিন্তু কথা বলতে পারে সেটা তো জানি না। আর তুমি আমার নাম জানলে কিভাবে? 
-হ্যাঁ, ডাকছিলাম। যাকে আমরা বন্ধু ভাবি, তাদের নামও জানি, কথা বলতে পারি। আর তোমার মা-বাবা, ভাই-বোন সবাই এই নামে ডাকে। প্রতিদিনই তো শুনে থাকি। 
-ওহ, এবার বুঝেছি।
-তুমি আমাকে বন্ধু করে নিয়ে যাও, প্লিজ। 
-কিন্তু তোমাকে নিয়ে কোথায় রাখবো?
-একটা ভাঙাচোরা পাত্রে করে, ঘরের চালে বা বারান্দায় রেখে দিও।
-আচ্ছা, ঠিকাছে।
পুঁইগাছের এমন কথা শুনে পিনুর মায়া লাগল। সে পানির ভেতরে হাত ঢোকায়। গাছের গোড়ার মাটিসহ তুলে নিয়ে বাড়ি গেল। একটা পুরাতন মাটির সানকিতে আরও কিছু মাটি নিয়ে গাছটা লাগিয়ে দিল। বারান্দার এক কোণাতে রেখে, প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় পানি দেয়। পিনুর যত্ন পেয়ে পুঁইগাছটি তরতরিয়ে বাড়তে লাগল। নতুন কয়েকটি ডালপালাও গজিয়েছে। ধীরে ধীরে বড় হওয়ায় নেতিয়ে পড়ছে কাণ্ডগুলো। পিনু তার বাবাকে দিয়ে কয়েকটি বাঁশের কঞ্চি কাটিয়ে আনিয়েছে গাছে ঠেস দেওয়ার জন্য। ছেলের এমন কাণ্ডকারখানা দেখে, মা-বাবা দূর থেকে মুচকি মুচকি হাসে। পিনু তার গাছবন্ধুর সাথে মজার মজার কথা বলে। হাসাহাসি করে। পিপীলিকা গান শোনায়। পিপীলিকার গান শুনে পিনুরও ইচ্ছে করে। তার মতো গান গাইতে। কিন্তু মা-বাবার সামনে, ঘরে বসে গান গাইতে লজ্জা করে তার। তবুও পিপীলিকার সাথে গুনগুন করে গান গায়। গতবছর স্কুলে গান গেয়ে পুরস্কারও পেয়েছিল সে। সেটা তার মা-বাবাও জানে। তবুও বাড়িতে গান গাইতে তার শরম লাগে। সে তার ছোট কাক্কুর কাছে গান শিখেছে। রবীন্দ্র, নজরুলের গান তার কাছে খুব ভালো লাগে। কারণ তার ছোট কাক্কু এই গানগুলোই গায়। সে এও জানে, তার কাক্কু কবিতা-টবিতা, গান-টান লেখতে পারে। পিনুর খুব ইচ্ছে, ছোট কাক্কুর মতো বড় হয়ে গান কবিতা লিখবে। গাছবন্ধুর সামনে বসে এসব ভাবতে ভাবতে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে পিনু। হঠাৎ গাছবন্ধুর কথায় ফিরে আসে সে। গাছবন্ধু তার মাথায় টোকা দিয়ে বলল,
-কি ব্যাপার, পিনু? এতক্ষণ ধরে কার কথা ভাবছিলে ?
পিনু মুচকি হাসি দিয়ে বলল,
-হ্যাঁ বন্ধু। হঠাৎ ছোটকাক্কুর কথা মনে পড়েছিল।
-উনি কোথায় গেছেন?
-একটু কাজের প্রয়োজনে শহরে গিয়েছিল কিন্তু করোনার জন্য আঁটকে গেছে। 
-ওহ। তাহলে তো সমস্যা।

দুই বন্ধু কথা বলতে বলতে, হঠাৎ পিনুর নখের আঁচড় লাগে পুঁইগাছের গায়ে। ব্যথা পেয়ে পুঁইগাছ বলল, 
-ওহ, বন্ধু! কষ্ট লাগে তো! 
-সরি, বন্ধু। বুঝতে পারিনি। ঘরের ভেতর থেকে মলম এনে লাগিয় দিচ্ছি।
-না বন্ধু, লাগবে না। এমনিতেই ঠিক হয়ে যায়। 
এভাবেই হাসিঠাট্টার ছলে পিনুর, পুঁইগাছের সাথে বড্ড সুখে দিনগুলো কাটতে লাগল। 



0/Post a Comment/Comments

Please do not enter any spam link in the comment box.

Stay connected

FACEBOOK- Fans Like
TWITTER- Followers Follow
YOUTUBE- Subscribers Subscribe

Subscribe us

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner