একটি শোক সংবাদ-ছোট গল্প

 একটি শোক সংবাদ

    সুমন আহমেদ 

সাদা মেঘের ভেলায় ভেসে যাচ্ছে শরতের যুবতী আকাশ। অঙ্গে জড়িয়েছে নীল ফিনফিনে শাড়ি, তিতাস পাড়ে হিমেল হাওয়ায় দুলছে প্রেমময় কাশফুল; সুখের উচ্ছ্বাসে ভাসছে বৈতরণীর শান্ত দু'কূল; পাখা মেলে উড়ছে প্রজাপতি। নীলাঞ্জনা তোর মনে আছে? এমন শরতের পড়ন্ত বিকেলে
তুই আর আমি- দুজন দুজনকে করতাম চিঠি আদান-প্রদান। একদিন তোকে চিঠি দিতে গিয়ে হাতেনাতে তোর বাবার হাতে ধরা পড়ে গিয়েছিলাম। সেদিন তোর ডাকাত বাবা আমাকে কী ধোলাই না দিয়েছিল! তোর ভিলেন বাবাকে আমি অসম্ভব ভয় পেতাম, মাঝেমধ্যে ভাবতাম সব বাবারা বুঝি এমনই হয়। ভয়কে জয় করে তবুও বারংবার ছুটেছি তোর পিছু। জীবনটা তখনই খুব বেশি ভালো ছিল- যখন ছোট্ট ছিলাম,
দুজন ছিলাম দুজনার খেলার সাথী। বড় হয়ে যেন দুজনার দূরত্বটা বেড়ে গেল; এখন কাছে আসা যেন- দুঃসাহস। মধ্যবৃত্ত পরিবারের ছেলে আমি; তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে আমি সবার বড়। বাবা স্কুল মাষ্টার, বাবার সামান্য বেতনের ও টিউশনির টাকা দিয়ে আমাদের চার ভাইবোনের পড়াশোনার খরচ এবং সংসার চলে।
ছোট্ট বোনটাকে জন্ম দিতে গিয়ে মা মারা যান। আমাদের কথা ভেবে বাবা আর দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। এই সমাজের বিশিষ্ট শিল্পপতি নীলাঞ্জনার বাবা হামিদ সাহেব। তিনি দুটি গার্মেন্টস ও একটি জুটমিলের মালিক। বামন হয়ে যেন আকাশের চাঁদ ধরার স্বপ্ন দেখছি জেগে-জেগে; ভুলেই গিয়েছিলাম আকাশ জমিনের দূরত্বের ব্যাবধান। নীলাঞ্জনার বাবা হামিদ সাহেব আমাদের সম্পর্ক কিছুতেই মেনে নেননি। তার বন্ধুর ছেলের সাথে নীলাঞ্জনার বিয়ে ঠিক করলেন, ছেলে সফ্টওয়্যার ইন্জিনিয়ার, কানাডায় থাকেন। বিয়ের কিছুদিন আগে- নীলাঞ্জনার বিয়ের কথা শুনে উন্মাদ হয়ে যাই আমি; কী করিব, কোথায় যাবো কিছুই ভেবে পাচ্ছি না। হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম নীলাঞ্জনাকে নিয়ে পালিয়ে যাবো। পালাতে গিয়ে নীলাঞ্জনার বাবার লোকজনের হাতে ধরা পরে যাই। নীলাঞ্জনার বাবার লোকেরা সেদিন খুব মেরেছিল আমায়। সাথে সাথেই হসপিটালে বর্তি করাতে হয়েছে। 
সাতদিনের মাথায় কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর পুলিশের হাতে তুলে দেন আমাকে। চার দেয়ালের এই বন্দী জীবনে আমি যেন আজ বড্ড অসহায়। প্রিয় মানুষটা সারাজীবনের জন্য পর হয়ে যাবে, ভাবতেই শরীরটা শিউরে উঠছে। হঠাৎ নীলাঞ্জনার বান্ধবী তমা এসে হাতে একটা চিঠি দিয়ে বলল- নীলাঞ্জনা পাঠিয়েছে। তমার কাছে জানতে চাইলাম নীলাঞ্জনা কেমন আছে; আমার
কথার কোনো জবাব না দিয়ে মুহুর্তেই তমা চলে গেল। তমা চলে যাওয়ার পর চিঠির ভাজ খুলে পড়তে শুরু করলাম-

প্রিয় নীলাঞ্জন...
জানি ভালো নেই- তবুও বলছি কেমন আছিস? 
তোকে ওরা খুব মেরেছে... তোর অনেক কষ্ট হচ্ছে তাই না? জানিস আমারও খুব কষ্ট হচ্ছে, মনে হচ্ছে বুকের ভেতরের হৃদপিন্ডটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। ওরা তোকে চার দেয়ালের মাঝে বন্দী করে রেখেছে। জানিস আমাকেও ঘরের ভেতর আটকে 
রেখেছে, তোর কাছে কিছুতেই আসতে দিচ্ছে না। নীলাঞ্জন, আগামীকাল বাদ জুমা আমার বিয়ে; আগামীকাল বিয়ের পালকি চড়ে যাবো ঠিকই- তবে লাল-বেনারসি পড়ে নই, সাদা কাফনের কাপড় পড়ে। নীলাঞ্জন, তুই আমাকে ক্ষমা করে দিস; আমি পারবো না, তোকে ছাড়া অন্য কাউকে স্বামী বলে মেনে নিতে। অন্যের গলের মালা হওয়ার চেয়ে তোর নামের মালা হয়ে মরে গিয়েও তোর মাঝে বেঁচে থাকতে চাই অনন্তকাল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার বাঁধভেঙে রাত শেষে হলো ভোর; ভোর হওয়ার সাথে-সাথেই প্রিয় মানুষটির নাম ধরে- 
মসজিদের মিনারের মাইকের ধ্বনিতে উচ্চারিত হচ্ছে; বাতাসে-বাতাসে ছড়িয়ে যাচ্ছে- একটি শোক সংবাদ। 

0/Post a Comment/Comments

Please do not enter any spam link in the comment box.

Stay connected

FACEBOOK- Fans Like
TWITTER- Followers Follow
YOUTUBE- Subscribers Subscribe

Subscribe us

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner