দৃষ্টি
জহির টিয়া
মায়ের ওপর অভিমান করে বাড়ি হতে বেরিয়ে পড়ে কাজল। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে দেখে চুলার ওপর ভাতের হাঁড়ি। গড়গড় করে ফুটছে আর কুয়াশার মতো ধোঁয়া হয়ে উড়ে যাচ্ছে হাঁড়ির পানি। কাজলের মন খুব খারাপ হয়ে যায়। খিদেয় পেট চো চো করছে। ঠিক টিভির ডিশ এন্টেনা চলে গেলে যেমন করে। স্কুল হতে দৌঁড়িয়ে বাড়ি এসেছিলো মায়ের হাতের রান্না খাবে বলে । মা তরকারি দিয়ে ভাত মেখে মেখে মুঠো মুঠো খাওয়াবে। কিন্তু বাড়ি এসে দেখে বিপরীত। তাতেই মায়ের ওপর ক্ষেপে যায় কাজল। মা সালেহা বেগম বারবার বললেন , 'সকালের রুটি আছে। সেটা খেয়ে একটু পানি খা বাবা। ভাত হয়ে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই।'
তবুও কাজল মায়ের ওপর অভিমান করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় অবাধ্য ছেলের মতো। কাজল তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে। ছাত্র হিসেবে সে খুব মেধাবি। স্বভাবে খুব শান্তশিষ্ট এবং ভদ্র। কিন্তু আজ কেন যে এমন করলো কাজল, তা মায়ের ভাবনায় আসে না। হয়তো খিদের জ্বালায় তার মাথায় অন্য কিছু কাজ করছিলো। আসলেই আমার দোষ, ছেলেটা সেই সকালে একটা গমের রুটি খেয়ে গেছে। খিদা তো লাগবেই। এসব ভাবতে ভাবতে রান্না শেষ করে, ছেলের খোঁজে বেরিয়ে যান সালেহা বেগম। বাড়ির পেছনের বাঁশবাগানে যেখানে নিয়মিত বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা করে। আমবাগান, বিলেরধারে, ফড়িং ধরার মাঠে বিভিন্ন জায়গায় খুঁজে হয়রান। কিন্তু কোথাও পেলেন না ছেলেকে। গাঁয়ের অনেককে জিজ্ঞেস করলেন কেউ সন্ধান দিতে পারল না। মা সালেহা বেগম খুব চিন্তায় পড়লেন। ছেলেটা অভিমান করে আবার কিছু ঘটিয়ে দিলো না তো! মায়ের মনে ভয় কাজ করতে লাগল। আরও কত কিছুই ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে মায়ের। আবার মনে মনে ভাবে, আমার কাজল তেমন ছেলে না। সে খারাপ কিছু করবে না। এই আশায় বুক বাঁধে মা সালেহা বেগম।
এদিকে কাজল বাড়ি হতে বের হয়ে একটু দূরের বিলপাড়ে একটা বরই গাছের ওপর বসে আছে। যেখান থেকে তার মা খুঁজেও গেছে কিছুক্ষণ আগে। মাকে দেখেই বরই গাছে উঠে বসে কাজল। বরই গাছে কাঁটা থাকলেও , ঠিক বসার মত একটা আসন আছে। সেখানেই কাজল বসে আছে। বসে বসে বিলের পানিতে বকের মাছ ধরা দেখছে। মাছরাঙাটা কেমন করে বিজলির মতো আকাশ হতে উড়ে এসে পানির ভেতর ছোঁ মেরে মাছ ধরছে। বিলের জলে ফুটে থাকা কচুরিপানার ফুলগুলো কিভাবে সূর্যের দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসছে। এগুলো দেখছে, আর আনন্দ কুড়াচ্ছে কাজল। ততক্ষণে পেটের খিদা হারিয়ে গেছে। মনের খিদা পূরণ করতে ব্যস্ত কাজল। এভাবেই তার অনেকটা সময় চলে যায়। দুপুর গড়িয়ে পড়েছে। হঠাৎ দেখে বিলের দিকে একটা মানুষ আসছে। মানুষটা বেশ বয়স্ক হবে। আন্দাজ করে কাজল। হয়তো তার দাদার বয়সের হবে। কাজল তার দাদাকে দেখেনি। তার জন্মের আগেই মারা যান। বুড়ো লোকটাকে দেখে, কাজল ভাবে হয়তো তার দাদা বেঁচে থাকলে এমন বয়সের হতো। ভাবতে ভাবতে কাজলের দৃষ্টি যায় আবার বুড়ো লোকটার দিকে। কিন্তু এ কী ! লোকটা মাটিতে পড়ে কেন গেলো? লোকটাকে পড়তে দেখে নিজকে নিজে প্রশ্ন করে কাজল। সে ভাবে নিশ্চয় বুড়ো লোকটার কিছু হয়েছে। দ্রুত গাছ হতে লাফ দিয়ে নামে কাজল। এক দৌঁড়ে পৌঁছে যায় বুড়ো লোকটার কাছে। পাশে গিয়ে বসে পড়ে। বুড়ো লোকটার মাথায় হাতে বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল কাজল, কী হয়েছে আপনার?
লোকটা কোনো উত্তর করতে পারল না। আবার জানতে চাইল কাজল, আপনার কি খিদে পেয়েছে?
লোকটি মাথা নাড়ল। কাজল বলল, আপনি এখানে ওঠে বসেন, আমি খাবার নিয়ে আসছি।
কাজল বুড়ো লোকটার হাত ধরে উঠিয়ে বসালো। তারপর বাড়ির দিকে রওনা দিলো।
মা সালেহা বেগম, ছেলের পথ চেয়ে দাঁড়িয়ে আছেন বাড়ির সামনের রাস্তায়। কাজল দূর থেকে লক্ষ্য করে তার মা দাঁড়িয়ে আছে। মা সালেহা বেগমও দেখতে পায়, তার বুকের ধন কাজল আসছে। ছেলেকে দেখে ভেতরের আনন্দ ছাড়িয়ে মুখে এক চিলতে হীরের হাসি বের হয় সালেহা বেগমের। দৌঁড়ে এসে, কাজল জাপটে ধরে মাকে। মা সালেহা বেগম জিজ্ঞেস করলেন, কই ছিলি রে বাজান মায়ের ওপর অভিমান করে?
-মা, তুমি তাড়াতাড়ি ভাত দাও তো এক থালা। লোকটার খুব খিদে পেয়েছে।
-কোন লোকটা রে বাজান?
কাজল মাকে সবকিছু খুলে বলল।
-মা, তুমি তাড়াতাড়ি করো তো।
-তুই খাবি না ?
-না, মা। আমি পরে খাবো। আগে লোকটার কাছে চলো। লোকটার অবস্থা খুব ভালো না।
মা সালেহা বেগম প্লেটে ভাত-তরকারি আর এক জগ পানি নিয়ে ছুটে গেলেন।
-মা, দেখো। অই যে লোকটা শুয়ে আছে।
সালেহা বেগম লক্ষ্য করে দেখে, সত্যিই তো। লোকটার কাছে গিয়ে কাজল হাত ধরে উঠালো। বৃদ্ধলোকটাকে বলল, এই যে, আপনার জন্য ভাত নিয়ে এসেছি। খেয়ে নেন।
বুড়ো লোকটি ধীরে ধীরে উঠে বসলো। কাজল তাকে উঠে বসতে সাহায্য করল। লোকটার হাত ধুয়ে দিলো।
-নিজে নিজে খেতে পারবেন? কাজল জানতে চাইল ।
লোকটা মাথা নাড়ল দিলো। ধীরে ধীরে লোকটা খেতে লাগলো। কাজল ও তার মা সালেহা বেগম পাশে বসে লোকটার খাওয়ার দৃশ্য দেখে। এক নিমেষে খেয়ে শেষ করল লোকটা। খাওয়া শেষে বুড়ো লোকটাকে কাজল বলল,
-আপনি কি আমাদের বাড়ি যাবেন? আপনার বাড়ি কোন গ্রামে?
-অই যে নদীর ওপারের গেরামে। আমি এখন যেতে পারবো। এই দিকে একটু কাজে গেছিনু। হঠাৎ করে গলা হতে বুকটা জ্বলতে শুরু করে । মনে হয় গ্যাস হয়েছে। ভাবনু, আশেপাশে বাড়ি নাই তো। এই বিলের পানি খেয়ে নিই একটু । কিন্তু বিলের কাছে আসতেই চোখে যেন আন্ধার দেখতে লাগনু। আইলের সাথে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেনু।
-কিছুক্ষণ আমাদের বাড়িতে আরাম করেন, তারপর যাবেন। কাজল অনুরোধ করল।
- না, চলে যেতে পারমু বাবা। এই বয়সে যে সুদৃষ্টি তোমার বাবা, দোয়া করি বেঁচে থাকো। তুমি না দেখলে হয়তো মরে পড়ে থাকতুম। আল্লাহ্ তোমাদের মঙ্গল করুক।
এই বলেই বৃদ্ধলোকটি ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল। কাজল ও তার মা, সেই বৃদ্ধের চলে যাওয়া পথপানে চেয়ে রইল। যতক্ষণ ওদের দৃষ্টির বাইরে না গেল।


Post a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.