বাবার পাঞ্জাবী-ছোট গল্প

 বাবার পাঞ্জাবী

খায়রুল আলম রাজু


বাবা শব্দটা ছোট্ট হলেও অর্থটা পাহাড় সমান। কোনো অর্থ দিয়েই এই শব্দের সঠিক মূল্যায়ন  হয় না। কেননা বাবা মানে দন্ডায়মান বটবৃক্ষের মতো শীতল স্পর্শ, কাঠফাঁটা রোদে বরফগলা ছায়া। এই কথাগুলোকে অংকের মতো সাজিয়ে আমি সূত্র হিসেব করে করে বাবাকে বিশ্লেষণ করি, বাবা সত্যিকার অর্থেই তুলনাহীন। সেই ছেলেবেলা হতে এই অবধি, বাবাকে আমি খুব কাছ থেকেই দেখেছি। এক খন্ড সবুজ পৃথিবীতে বাবাই আমার পরম বন্ধু, স্বার্থের সম্পর্কে বাবা পরম আত্বীয়। ছেলেবেলায় বাবা ছাড়া আমার বড্ড একা লাগতো। পরবর্তীতে একা একা পথচলা, একা  থাকাটাও বাবার কাছেই শেখা।আমি যখন একটু একটু বুঝতে পারি বাবা তখন পরবাসী। বাবাকে ছাড়া কতোটা দিন যে পার করেছি, হিসেব নেই। বাবা বিদেশে থাকলেও প্রতিদিন কথা বলতেন আমার সাথে, মায়ের সাথে, বোনের সাথে, ভাইয়ের সাথে। হঠাৎ একদিন আলমারি খুলে দেখি বাবা বিদেশ যাওয়ার সময় ভুল করে নতুন পাঞ্জাবী ফেলে গেছেন। আমি তখন নেড়েচেড়ে পাঞ্জাবী দেখছি আর কাঁদছি। মা আমাকে বললেন, কাঁদিস কেনো? আমি বললাম, বাবাকে বড্ড মনে পড়ছে।
মা তখন কিছু একটা বলার আগেই আঁচলে মুখ লুকালেন। এটা আসলে লজ্জা  না জল মোছার বাহানা ছিল, আমি বুঝে উঠতে পারিনি। রাতে যখন বাবা ফোন করেন তখন পুরো গল্পটা বাবাকে খুলে বলি। বাবা বললেন দেশে আসলে নিয়ে যাবো, আপাতত তুমি পাঞ্জাবীটা যত্ন করে রেখো। এভাবেই কেটে গেলো তিনটে বছর। বাবা দেশে এলেন। বাবাকে পেয়ে সে কী হৈ-হুল্লোড় আমার!
আমি তখন অনেকটা বড় হয়ে গেছি। যে আমিটা  বাবার হাত ধরে স্কুলে যেতাম সেই আমি এখন একা একা কত্তো কিছুই পারি। বাবার সাথে কেটে গেলো দুটো  মাস। একদিন শুক্রবারে নামাজে যাওয়ার সময় বাবা আলমারি খুলে দেখেন পাঞ্জাবীটা ধূসর ফেঁকাসে হয়ে গেছে। সেদিনও পাঞ্জাবী টা বাবা পড়েননি। বললেন এটা থাক, তুই বড় হয়ে পড়বি।
আমি বললাম, আমি কবে বড় হবো? 
বাবা বললেন, যখন তুই যুবক হবি।
-তারপর?
-তারপর পাঞ্জাবীটা যখন তোর গায়ে লাগবে, বুঝে নিবি তুই বাবা আমি ছেলে!
আমি হাসলাম, লজ্জায় মুখ লাল হয়ে এলো। তারপর বললাম ছেলের পাঞ্জাবী বাবার গায়ে লাগলেই বাবা ছেলে আর ছেলে বাবা হয়ে যায় বুঝি?
বাবা তখন এক গাল হাসলেন। বললেন নামাজে চল, পরে বলবো। হাসি খুশির ভিড়ে কখন যে,  সময় ঘনিয়ে এলো ঢেরই পাইনি। আবারও বাবা চলে যাবেন। বিদায় যে কতোটা বেদনার তা কেউ বোঝে না। সেদিন তীব্র শীত উপেক্ষা করে সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠলাম। নাশতা খেয়ে গাড়ি করে চললাম ঢাকার পথে। গন্তব্য  হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। বিমান বন্দরে গিয়েই বুকটা আর্তনাদ করে কিছু যেনো বলতে চাইছে; কিন্তু পারেনি। বাবার চলে যাওয়ার দৃশ্যপট দেখছি আর কাঁদছি। অনুমান করলাম কেউ যেনো আমার শূন্য দেহটা রেখে প্রাণটা ছিনিয়ে নিচ্ছে! বাবাও ফিরে ফিরে আমাকে দেখছেন। মামা আমাকে জড়িয়ে ধরে শান্ত্বনা দিয়ে বললেন, চল দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই, বোস এখানে বোস। 
বসে বসে পুরো তিনটা মাসের প্রতিটা মুহূর্ত আমায় আরও বেশি কাঁদাচ্ছিল। প্রায় ত্রিশ মিনিট পর বাবার ফোন এলো।
-বিমান পাঁচ মিনিট পর ছাড়বে, সবার খেয়াল রাখিস, মন দিয়ে লেখাপড়া করিস, ভালো থাক।
আমি বললাম, আবার কবে আসবে?
-তুই যেদিন আমার বাবা হবি ঠিক তখন!
আমি কাঁদো কাঁদো গলায় বললাম, পাঞ্জাবী  কি সত্যি তবে রেখে গেছো?
বাবা হ্যাঁ বলতেই, পাশে কেউ বলছেন স্যার বিমান এখনই আকাশে উড়বে সিটবেল্ট বাঁধুন আর দয়া করে ফোনটা বন্ধ করুন। বাবা বললেন, রাখি রে, কথা হবে পড়ে, বাড়ি ফিরে যা।
আমি কেঁদে কেঁদে পুরোটা পথ এলাম। বাবার কথাগুলো বার বার মনে ভেসে উঠছিল। কিছু দিন যেতেই সব আগের মতো হয়ে গেলো। ধীরে ধীরে সময় আমাকে চমৎকার একটি মুহূর্ত উপহার দিলো। আমি আলমারি খুলে দেখি পাঞ্জাবী, আমার গায়ের সাথে এঁটে গেলো। বাবাকে বললাম, আমি বাবা হয়ে গেছি। বাবা হাসলেন। আমি বললাম, তো কবে আসবে?
-দু বছর পর। অপেক্ষা করো আসবো।
দিন যায়, মাস যায়,অবশেষে বছর পেরিয়ে গেলো। দু'বছর পর বাবাকে বললাম দু'বছর কেটে গেলো, আসবে না?
বাবা বললেন, আসবো আরও কিছু দিন পর।
এভাবে চলে গেলো প্রায় ছয়টা মাস। বাবাকে আসার কথা বললেই বলেন কিছু দিন পর আসবো। আমি বললাম, কয়টা দিনে কিছু দিন হয়? 
বাবা বললেন, জানি না। মাকে বললাম, মা কত দিনে কিছু দিন হয় বলতে পারো? 
আমার উত্তর কারোর কাছেই পাইনি। কিছু দিন, কিছু দিন করে পাঁচ বছর পর বাবা দেশে এলেন। এখন আর সেই ছোট্টটি আমি নেই। নেচে নেচে আর হৈ-হুল্লোড়ও করতে পারি না। তবে বাবার জুতো জোড়া খুলে পায়ে আমার স্যান্ডেল পড়তেই বাবা বললেন, এবার দেখি তুই আমার বন্ধু হয়ে গেলি!
আমি তো হতবাক! জিজ্ঞেস করলাম কেনো?
বাবা বললেন, ছেলের জুতো বাবার পায়ে লাগলেই বাবা-ছেলে বন্ধু হয়ে যায়। 
আমি হেসে কুটিকুটি। বাবাও হাসলেন। ঘরের সবাই হাসলো। আমি দৌঁড়ে আলমারি খুলে পাঞ্জাবী পড়ে বাবার সামনে আসলাম।
ওরে মা! বাবা তখন আমাকে বাবা বলে ডাকতেই বাড়িতে সবার সে কি হৈ-হুল্লোড়।

0/Post a Comment/Comments

Please do not enter any spam link in the comment box.

Stay connected

FACEBOOK- Fans Like
TWITTER- Followers Follow
YOUTUBE- Subscribers Subscribe

Subscribe us

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner