বর্ষার কদম অথবা নীলাঞ্জনা
সুমন আহমেদ
বর্ষা এলেই ভেঙে যাই বুকের পাজর! আষাঢ়ের বৃষ্টিতে ভিজে যায় অসহায় বুকের জমিন; বারবার মনে পড়ে যায় হারানো সেই সুখের স্মৃতিগুলো। মনে পড়ে যায় নীলার কথা আর একসাথে
কাটানো সেই সুখময় মূহুর্তগুলো। নীলা হয়তো এখন ভুলেই গেছে আমার কথা, ভুলে গেছে বর্ষার স্মৃতি। নীলা তোমার মনে আছে তুমি আমি একই শ্রেণিতে পড়তাম। প্রথম শ্রেণি হতে দশম শ্রেণি পর্যন্ত তোমার সাথে ছিল আমার স্কুল জীবনের পথচলা। তুমি বরাবরই পড়াশোনায় ভালো ছিলে আর আমি ততোটাই খারাপ। তবুও তোমার আমার বন্ধুত্বে এতটুকুও দূরত্ব ছিলো না। একসাথে স্কুলে যাওয়া, রোজ-রোজ টিফিন ভাগ করে খাওয়া আর বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে কাকভেজা হয়ে বাড়ি ফেরা। তুমি কদম ফুল ভিষণ পছন্দ করতে, সব ফুলের চেয়ে কদম তোমার প্রিয়। বর্ষা এলেই কদম ফুলের বাইনা করতে; আর আমি
প্রতিদিনই তোমাকে গুচ্ছ-গুচ্ছ কদম এনে দিতাম। এমনই এক বর্ষার পরন্ত বিকেলে তুমি আমি নৌকা নিয়ে ঘুরতে বেড়িয়ে ছিলাম আমাদের চিনার বিলে। হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল, প্রচন্ড বৃষ্টি; ভয়ে তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলে। আর আমিও তোমাকে...। সেদিনের পর থেকে বুকের ভেতর তোমাকে নিয়ে এক অন্যরকম অনুভূতি শুরু হয়ে গেল। তোমাকে নিয়ে আমি
যেন দিনদিন ভাবনার শহরে হারিয়ে যাচ্ছি...। কিছুদিন পর জানতে পারলাম তুমিও আমাকে নিয়ে ঠিক একই ভাবনা ভাবছো। একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে তুমি আমার
হাতে একটি ভালোবাসার চিরকুট দিয়েছিলে আর সেদিনের পর থেকে দুজনের মধ্যে শুরু হয়ে গেল জীবনের এক নতুন অধ্যায়।
তুমি আমাকে চিঠি লিখতে আর আমিও তোমাকে নিয়মিত চিঠি লিখতাম। দুজন- দুজনকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম।
২
আমাদের একটি ঘর হবে- সুখের ঘর; সেই ঘর আলোকিত করে তোমার কোল জুড়ে থাকবে একটি কন্যা সন্তান- তার নাম রাখবো নীলাঞ্জনা... তোমাকে মা বলে ডাকবে আর আমাকে
বাবা। ভুলেই গিয়েছিলাম এ যেন বামন হয়ে আকাশের চাঁদ ছোঁয়ার অসম্ভব স্বপ্ন। চিঠি আদানপ্রদান করতে গিয়ে একদিন তোমার বাবার হাতে ধরা পড়ে গিয়েছিলাম- তোমার মনে আছে
নীলা সেদিন তোমার ডাকাত বাবা আমাকে লাঠি নিয়ে পুরো গ্রাম দৌঁড়িয়ে ছিল, আর সেদিনের পর থেকে তোমার বাবার ভয়ে আমিও মুরগির মতো ডিম পাড়তে শুরু করলাম। তোমার সাথে
কথা বলা আর চিঠি আদানপ্রদান তো দূরের কথা তোমাদের বাড়ির আশপাশেও যাওয়ার সাহস হয়নি আমার। কিছুদিন পর তোমার বাবা তোমার বিয়ের উদ্যোগ নিলেন। একের পর এক পাত্রপক্ষ আসেন তোমাকে দেখতে। হঠাৎ একদিন শুনতে
পেলাম তোমার নাকি বিয়ে ঠিক হয়েছে অনেক বড় ঘরে; ছেলে শহরে অনেক বড় সরকারি চাকরি করেন- মাস শেষে মোটা অংকের টাকা মাইনে পায়; আর আমি দরিদ্র বাবার অসহায়
একজন বেকার ছেলে। তাই তোমার বাবা আমার সাথে বিয়ে তো দূরের কথা ওনার বাড়ির চাকর হিসেবেও রাখতে রাজি নন। ছোটবেলা থেকেই অভাবের সংসারে বড় হয়েছি; জন্মের পর-পরই মা মারা গেলেন। বাবা আবার দ্বিতীয় বিয়ে করেন। সৎমা'র সংসারে অত্যাচার আর নির্যাতন ছাড়া কিছুই পাইনি এক জীবনে।
সৎমা'র অত্যাচারের যন্ত্রণায় মাঝে মধ্যে ইচ্ছে হতো মায়ের কাছে চলে যেতে; মা হয়তো ভালোই আছেন দূর আকাশে রাতের তারা হয়ে। যেদিন থেকে নীলার সাথে পথচলা শুরু হয় সেদিন
থেকেই ভুলে গেছি এক জীবনের সমস্ত দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা আর মানুষের শত অবহেলা। দেখতে দেখতে প্রিয় মানুষটা পর হয়ে যাবার দিন চলে এলো, পৃথিবীর বৃহত্তম ভূমিকম্প যেন বুকের
ভেতরটা এলোমেলো করে দিচ্ছে, আকাশটা ধসে-ধসে পড়ছে শব্দহীন, পায়ের নিচে থরথর করে কাঁপছে মৃত্তিকা- এক পৃথিবী শূন্যতা আকড়ে ধরছে বুকের বা পাশে! মনে হচ্ছে এক্ষুণি যমদূত
ছিনিয়ে নিয়ে যাবে বহুদিনের পোষা প্রাণ পাখী। তিনটি শব্দের বন্ধনে জড়িয়ে, অচেনা-অজানা পৃথিবী আপন করে চলে গেলো নীলা একটি সুখের গন্তব্যের প্রত্যাশায়। বর্ষা এলেই নীলার কাছে চিঠি লিখি- আকাশের ঠিকানায়...
প্রিয় নীলা,
কেমন আছো তুমি? হয়তো ভালোই আছো পৃথিবীর বৃহত্তম সুখময় সুখের সংসারে স্বামী সন্তান নিয়ে! আমি কিন্তু ভালো নেই; ভালো নেই আমার পাগল প্রেমিক মন! তুমিই বল তুমি ছাড়া কি আমি কখনো ভালো থাকতে পারি?
না, তুমি ছাড়া আমি কখনোই ভালো থাকতে পারিনা। আমার ভালো থাকার তুমি নামের সূর্যটা যে ডুবে গেছে বর্ষার কোনো এক অমাবস্যার কালো আঁধারে। জানো, তুমি চলে যাবার পর কত বর্ষা গত হয়ে গেলো আজও অবধি ভেজা হয়নি আষাঢ়ের বৃষ্টিতে, নৌকায় চড়ে ঘোরা হয়নি কোনো পরন্ত বিকেলে! নীলা আজ তুমি নেই তবুও তোমাকে খুজে পাই- শাপলা শালুকের মিছিলে, কদম কেয়ার অফুরন্ত ভালোবাসায় আর স্কুল লাইফের ফেলে আসা সেই শৈশবে। নীলা, কদম ফুল কি তোমার এখনও প্রিয়? নাকি
ভুলে গেছো প্রিয় কদমের কথা? নাকি ভুলে গেছো বর্ষার স্মৃতি? হয়তো কদম তোমার এখনও প্রিয়; হয়তো এখনও আষাঢ়ের বৃষ্টিতে ভেজো- অচেনা হাত ধরে।


Post a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.