বুদ্ধিমান লিথুন
জহির টিয়া
লিথুন ক্লাশ থ্রি-তে পড়ে। বাড়ি হতে কিলোখানিক দূরের এক প্রাইমারি স্কুলে। বাড়ি ও স্কুলের মাঝখানে একটি ছোটো খাল আছে। খালের ওপর বাঁশের সাঁকো। সেটাই পারাপারের একমাত্র ভরসা ওই এলাকার মানুষের। স্কুলে যাওয়া-আসার খুব অসুবিধা হয় ছাত্র-ছাত্রীদের। মাঝেমধ্যে সাঁকো হতে পা পিছলে পড়ে যায় কেউ কেউ। তখন আর সেদিনের মতো স্কুলে যাওয়া হয় না। একপাড়ের মানুষ যেতে শুরু করলে অন্য পাড়ের মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তাতে প্রচুর সময় নষ্ট হয়। এলাকার জনপ্রতিনিধিরা বারবার কথা দেয়, শীঘ্রই একটা ব্রিজ তৈরি করা হবে। কিন্তু কেউ কথা রাখে না।
লিথুন নিয়মিত স্কুলে যায়। সে একটু বদমেজাজি ও চঞ্চল প্রকৃতির। সহজে কাউকেই ভয় পায় না। বাড়ির আশেপাশের সমবয়সী ছেলেমেয়েরা তাকে খুব ভয় পায়। তার চেয়ে কয়েক বছরের বড় ছেলেমেয়েরাও ভয় করে। কোনো কারণে, তাকে কেউ রাগিয়ে তুললে, সুযোগ পেলেই মেরে বাড়ি পালিয়ে যায়। এই নিয়ে বাড়িতে তার মা-বাবার কাছে প্রায় অভিযোগ আসে। সে বিনা কারণে কাউকে মারেও না। তার এই গুণটা আছে। কিন্তু স্কুলের জীবন পুরোটাই বিপরীত। কারো সাথে প্রয়োজনের বেশি কথা বলে না। কারো সাথে মারামারিও করে না। তার বন্ধু হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র । তার মধ্যে শিপন সবচেয়ে কাছের, ভালো বন্ধু। ছাত্র হিসেবে মোটামুটি। এমন ছাত্রদের স্যারেরা একটু কমই চিনেন। যারা খুব ভালো বা খুব দূর্বল ছাত্র, ওদের বেশি চিনেন স্যারেরা।
একদিনের ঘটনা, লিথুনের স্কুলে যেতে দেরি হয়। তা-ও আবার পারাপারের অসুবিধার জন্য। শ্রেণিকক্ষের একেবারে শেষ বেঞ্চে জায়গা পায় সে। তার বেঞ্চে আর কেউ নেই। তাছাড়া সেদিন তার বন্ধু শিপনও আসেনি। সে আসলে অবশ্যই লিথুনের পাশে গিয়ে বসত। তাই সে একটু মন খারাপ করে বসে ছিল ।
প্রথমেই বাংলা স্যার ক্লাশে এলেন। এসে, কুশল বিনিময়ে স্যার জিজ্ঞেস করলেন,
-তোমরা কেমন আছো?
-আলহামদুলিল্লাহ, আমরা ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন, স্যার ?
ছাত্র-ছাত্রীরা সমস্বরে জিজ্ঞেস করল।
-আলহামদুলিল্লাহ, আমিও ভালো আছি।
এরপর স্যার স্টুডেন্ট হাজিরা খাতা বের করেন। ক্রমিক নং ধরে ডাকতে শুরু করলেন। সবাই একে একে ইয়েস স্যার বলছে। লিথুনের ক্রমিক নং ২৫, সেও ইয়েস স্যার বলল। কিন্তু স্যারের কান অবধি ভালোভাবে পৌঁছাল না। স্যার পুনরাই ডাকলেন। তাতেই লিথুন দাঁড়িয়ে গেল। স্যার জানতে চাইলেন,
-এই তোমার নাম কি ?
-লিথুন। ভয়ে ভয়ে উত্তর করে লিথুন।
-কী হয়েছে তোমার? মনখারাপ কেন?
লিথুন স্যারকে সব কথা খুলে বলল।
-ওহ, এই কথা।
স্যার দেখলেন, তৃতীয় বেঞ্চে একজন ছাত্র বেশি বসে আছে। তখন একজনকে উঠিয়ে লিথুনের পাশে বসতে বললেন।
ক্লাশ শেষে স্যার চলে গেলেন। লিথুন ছাড়া সকল ছাত্র-ছাত্রীরা শ্রেণিকক্ষ হতে বেরিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়েছে । অন্য স্যার ক্লাশে না আসা পর্যন্ত সবাই বারান্দায় দাঁড়িয়ে হইচই করে। কিন্তু লিথুন প্রয়োজন না হলে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায় না। লিথুন আনমনে ক্লাশেই বসেছিল। হঠাৎ পেছনের দরজাটার দিকে তাকাতেই দেখে, একটা নীল রঙের চকচকে কলম পড়ে আছে। সে ওঠে গিয়ে কলমটা নিয়ে এলো। কলমটা তার খুব পছন্দ হলো। তাছাড়া তার নীল রঙটাও বেশ পছন্দ। সে সবসময় বলপয়েন্ট কলম দিয়ে লেখে। তার গরীব বাবা, তাকে দামী খাতাকলম কিনে দিতে পারে না। তাতেও তার কোনো আফসোস নেই।
লিথুন কলমটা তার ব্যাগের ভেতরে রেখে দিল। ইংরেজি স্যারকে আসতে দেখে, সবাই হুড়মুড় করে ক্লাশে ঢুকে পড়ে। ক্লাশ শুরু হলো। ক্লাশ চলাকালীন সময়, তন্নি নামের একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে স্যারকে বলল-- স্যার, আমার কলম চুরি হয়ে গেছে! বলেই কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে চোখ কচলাতে লাগল। স্যার সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন- কেউ তার কলম নিয়েছে কি-না? সবাই বলে উঠল- না স্যার।
লিথুনের মনটা বলছিল যে, স্যার, দরজার সামনে একটা কলম পড়েছিল। আমি সেটা পেয়েছি । কিন্তু স্যার ক্লাশ হতে বেরিয়ে গেলে, এই কথা হয়তো কেউ বিশ্বাস করবে না ।
লিথুনের উপস্থিত বুদ্ধি প্রখর। সে জানে, এ সময় কলম পাওয়ার কথা স্বীকার করলে, সবাই তাকে চোর হিসেবে চিহ্নিত করবে । যখন-তখন চোর বলে ডাকবে সবাই। তাই সে চুপচাপ বসে রইল। ক্লাশ শেষ হল। আবার সবাই বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। লিথুনও বের হলো। তবে সে বারান্দায় না দাঁড়িয়ে, অফিস কক্ষের দিকে চলে গেল। অফিস কক্ষের সামনে দাঁড়াতেই ইংরেজি স্যার জিজ্ঞেস করলেন,
-কিরে লিথুন, কিছু বলবি?
-জি স্যার।
-কী বলবি বল।
তারপর লিথুন প্যান্টের পকেট হতে কলমটা বের করে স্যারকে দিল। আর স্যারকে সবকথা বুঝিয়ে বললো। স্যার শুনে, খুব খুশি হলেন লিথুনের উপস্থিত বুদ্ধিতে। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। স্যার সন্তুষ্ট হয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, এখন যাও। আমি এর পরের ক্লাশে গিয়ে দিয়ে আসব।
লিথুন ক্লাশে গিয়ে বসলো। সে লক্ষ্য করে, তন্নি মনখারাপ করে বসে আছে। লিথুনের খুব মায়া হলো কিন্তু বলতে পারলো না যে, তার কাছে কলমটি আছে।
ঠিক পরের ঘণ্টায় ইংরেজি স্যার আবার এলেন। এসেই তন্নির দিকে এগিয়ে গিয়ে পকেট থেকে কলমটা বের করে দিলেন। আর বললেন - এটা তোমার কলম কিনা দেখো তো? তন্নি মাথা নাড়িয়ে বলল- জি, স্যার। এটা আমার কলম। কলম পেয়ে তন্নি খুব খুশি হলো। স্যার টেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন- তোমরা জানো কি কলমটা কোথায় পেলাম?
সবাই এক সাথে বলে উঠল- না স্যার। জানি না।
তখন স্যার কলম পাওয়ার সবকথা বর্ণনা করলেন। সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনলো। স্যার আবার জিজ্ঞেস করলেন,
-তোমরা কি জানতে চাও? কে কলমটা পেয়েছিল?
-জি স্যার, জানতে চাই। সবাই বলল।
লিথুনের দিকে ইশারা করেন স্যার। সে উঠে দাঁড়ালো। সবাই তার দিকে তাকাচ্ছে। সেই তাকানোটা ভালবাসার, বন্ধুত্বের।
স্যার বললেন, আশা করি লিথুনের কাছ থেকে তোমরা শিক্ষা নিতে পেরেছো। সে কত বুদ্ধিমান! তার উপস্থিত বুদ্ধিই তাকে বাঁচিয়ে দিল, একটা দুর্নাম হতে। তোমরা একই পরিবারের সদস্য। সবাই সবার বন্ধু। মনে থাকবে তো?
-জি স্যার। অবশ্যই মনে থাকবে।
স্যার চলে গেলেন। লিথুনের গাল বেয়ে টপটপ করে জল ঝরছে। এই জল আনন্দের। সবাই লিথুনকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরলো। সবাই এক সাথে বলতে লাগল- আমরা সবাই, সবার বন্ধু। সুখেদুঃখে সবাই সবার পাশে থাকবো।
তারপর লিথুনকে নিয়ে আনন্দ আর হৈহুল্লোর করতে লাগল সবাই ।


Post a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.