মিথ্যামানব


মিথ্যামানব,,

জারিন তাসনীম রুকু
অপ্রিয় মিথ্যামানব, 
    আমাদের কথার শুরুটা হয়েছিল একটা মিথ্যা দিয়ে, মনে আছে আপনার?সেই আপনার চিত্রাঙ্কনা, যার গল্প আমি আপনার কাছে বহুবার শুনেছি।

জানেন তো, আমার বেশ লাগতো আপনার ওর প্রতি তীব্র রকমের অধিকারবোধ আর আপনার বাক্যে তার প্রতি উপচে পরা সম্মান দেখতে।মাঝেসাঝে বড্ড হিংসে হতো।  মনে হতো, ইশ!যদি আমি চিত্রাঙ্কনা হতে পারতাম!

মাঝেসাঝে জিজ্ঞেস করতাম,"এই যে প্রতিনিয়ত একেক রঙ এর পাঞ্জাবি পরেন, এর পেছনে কোনো কারন আছে?"
আপনি বলতেন,"চিত্রাঙ্কনার শাড়ির বিপরীতে আমার পাঞ্জাবি টাকে যেন মানিয়ে যায়, তার এক ব্যর্থ চেষ্টা বলতে পারো।"আমি বলতাম, "ঠিক কেমন ব্যর্থতা?" আপনি বলতেন,"এই ধরো আজ ও সাদা পরলে আমি পরবো আকাশী,কাল ও নীল পরলে আমি পরবো হলুদ,পরশু ও লাল পরলে আমি পরবো কালো।"
তখনও আমার মনে হতো ইশ!যদি একটা দিনের জন্য চিত্রাঙ্কনা হতে পারতাম!

প্রতিনিয়ত চশমার ফ্রেম পাল্টে ঘুরে বেড়াতেন আপনি। আমি জিজ্ঞেস করতাম, "চিত্রাঙ্কনার চশমার বিপরীতে বুঝি আপনার চশমাটা বেমানান লাগে প্রতিদিন?"
আপনি বলতেন,"চিত্রাঙ্কনার দূরদর্শন অত্যাধিক, এর চেয়েও অধিক।ওর চশমার প্রয়োজন হয় না,তবে আমার ফ্রেম পাল্টানোর বিষয়টা শুধু ওর কন্ঠে একবার 'মানাচ্ছে তোমাকে' শোনার আকাঙ্ক্ষামাত্র।"

আমি অবচেতন মনে আপনার প্রেমের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে একজন প্রেমিক কে ভালবেসে ফেলছিলাম।

খুব সম্ভবত সেদিন টা আমার সব থেকে ভাল একটা দিনে পরিণত হতো, যেদিন আমি জানতে পেরেছিলাম, চিত্রাঙ্কনা শুধু মাত্র আপনার কাল্পনিক এক নারী, যার কোনো বাস্তবিক রুপ নেই। হয়তো সেদিন এর পর থেকেই আমার পরনে শাড়ি আর কপালে টিপটা নিত্যদিন এর হয়ে যেত। কিন্তু না, সেদিন আমি জানতে পারলাম, সেই চিত্রাঙ্কনার মাঝে আপনার আরো কয়েকশ প্রেয়সী  বাস করছে, যারা সম্পূর্ণ বাস্তবতা জুড়ে বিরাজ করছে। যাদের কে বলা প্রথম মিথ্যাটাও এই কাল্পনিক চিত্রাঙ্কনাই ছিল।আমি সেদিন কিছুই বলিনি আপনাকে। সরে যাওয়াটায় প্রচন্ড রকমের দরকার হয়ে পড়েছিল।কিন্তু অভ্যাসটা কে গা এলিয়ে বিদায় জানাতে ব্যর্থ হচ্ছিলাম।

আপনার একেক প্রেয়সীকে মন্ত্রমুগ্ধ করে দেয়ার জন্যই যে আপনার এই পাঞ্জাবি আর চশমার এত নিত্যকার পরিবর্তন, তা বুঝে উঠেছিলাম ততদিনে।রাস্তার কিনার ধরে প্রতিদিন একেকজন প্রেয়সীর হাত ধরে একই গল্প আওড়ে যেতে আপনার ক্লান্ত লাগতো কিনা সে নিয়ে আমার বড় সংশয় ছিল।

সংশয়টার স্থায়ীত্বকাল বেশি ছিল না।অল্পদিনের মাঝেই জেনেছিলাম ক্লান্তি ভর করে গেলেই ঢাকায় চলে যেতেন আপনি। আমায় বলতেন চিত্রাঙ্কনা রবীন্দ্র সরোবর,ফুলার রোড, টিএসসি চড়িয়ে বেড়াতে ভালবাসে।আর জানতে পারলাম ঢাকার এলাকায় আপনার আরো কিছু প্রেয়সী আছে যাদের সামনে আপনি অত্যধিক ফরমাল।

একদিন আমায় বললেন,
"আমি আমার কল্পনার চিত্রাঙ্কনায় তোমার ছায়া খুজে পাই,তুমি কী আমার চিত্রাঙ্কনা হবে?"

আমি সেদিন মুঠোফোনের বিপরীত পাশে মুখ চেপে কান্না করেছিলাম।আমার বুকের ভেতর ছাড়খার হয়ে যাচ্ছিলো। সব কিছু কে মিথ্যা করে দিয়ে আমার আপনার চিত্রাঙ্কনা হতে ইচ্ছে করছিল।

ইচ্ছে করছিল আপনাকে জাপটে ধরে বলি,আমার সহস্র দিনের প্রতিক্ষা আপনার চিত্রাঙ্কনা হবার।আমি হবো চিত্রাঙ্কনা। 
ইচ্ছে করছিল সপ্তাহের সাত টা দিন ছয়বেলা ছয়বেলা করে ৪২ টা বেলায় আমি আপনাতে মশগুল থাকি,তবে এই বিয়াল্লিশটা বেলার অসংখ্য ছোট ছোট ভাগ রয়েছে। কিন্তু আমি তো আপনার ভগ্নাংশটুকু কে চাইনি।

দূরে সরে এসেছিলাম।হয়তো কেউ দূরে সরে না বলেই আপনার আমার প্রতি আগ্রহটা মারাত্নক রকমের বেড়ে গেছিলো।আমি বলে ফেলেছিলাম আমার আপনাকে নিয়ে জানার পরিধিটার কথা।আমি খুব অবাক হয়েছিলাম আপনার প্রতিউত্তর শুনে।আমি বুঝেছিলাম সেদিন, একটা মিথ্যুক ধরা পড়লেও তার কাছে তার মিথ্যা গুলো নিয়ে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা থাকে না।বাকি পারিপার্শ্বিক যত কিছু থাকে সবটা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সে,কিন্তু নিজের দোষটা নিয়ে নয়।আমি আপনার মাঝে সেদিন সামান্য সৌজন্যতা টুকুর স্থান অবধি পাইনি।

তার ঠিক কিছুদিন পরেই হলের সবথেকে ক্লোজ ফ্রেন্ডটা জাপটে ধরে এসে বলেছিল,
 ভাবনা,অনিমেষ আমাকে ভালবাসে। 

সত্যিটা ওকে দেখাতে চেয়েছিলাম। মেয়েটা উল্টো ভুল বুঝে বসলো।তারপর থেকে মেয়েটা  আমাকে দেখলেও দেখতে চাইতো না। আসলে ওর দোষ নেই, আপনি এমনই একটা ভয়ংকর তীব্র নেশা যার মাঝে ডুবে থাকতে ইচ্ছে করে।আপনার সম্পর্কে সম্পূর্ণটা জেনেও আমারই তো সবটা মিথ্যা ঘোষণা করে  আপনাকে নিয়ে পুরো শহর  হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াতে ইচ্ছে করে।

আপনার মনে আছে, তার ঠিক কিছুদিন পর আপনি বলেছিলেন আপনার শরীরে একটা ভয়ংকর রকমের রোগ বাস করছে? আপনার মেয়াদ গুনে গুনে ষাটটা দিন। বলেছিলেন আপনি আমার সঙ্গে এই শেষ সময় টুকু বাঁচতে চান। সেই সব প্রেয়সী শ্রেয়সীর অধ্যায় বন্ধ করে দিয়ে আপনি শেষ একটা অধ্যায় নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চান।

আমি সেবার আপনাকে বিশ্বাস করেছিলাম। মনে হচ্ছিলো, হয়তো এটা আপনার জীবনের একটা অভাগা সত্য।আজ গুনে গুনে চারটা বছর পরও আপনার হৃদপিণ্ডটা ঠিক আগের মত লাবডাব শব্দে প্রতিফলিত হচ্ছে। 

নেহালদা সেদিন বলছিল, জানিস তো, অনিমেষ টা ভাল নেই একদম।ওর চারপাশটা বড্ড ফাঁকা।কেউ নেই আশেপাশে ছেলেটার।যাদের নিয়ে টইটই করে ঘুরে বেড়াতো সবাই ওকে ছেড়ে চলে গেছে।কারণবশত আরো কিছু কাছের মানুষ দূরে সরে গেছে।

আমি চুপ করে রইলাম।

জানেন অনিমেষ, আমি জানি আজ আপনি বড্ড একা।আমি জানি,প্রতিনিয়ত আপনি একা মাঝরাত এর দিকে নিয়নের আলোতে হাঁটতে বেড়িয়ে পড়েন।পাঞ্জাবিটার রঙ প্রতিনিয়ত আর বদল হয়না আগের মত,কালো ফ্রেমেই এখন দিব্যি চলে যাচ্ছে আপনার, চুল গুলো অগোছালো ভাবে বড় হয়ে গেছে, মুখভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়িগুলোর যত্ন না নিতে নিতে  দাড়িগুলো নিজের সৌন্দর্য হারিয়ে বসেছে।মুখের মলিনতাটুকু ক্ষয়ে গেছে।কেমন একটা অসহায়ত্ব জুড়ে থাকে আপনার পুরো শরীর জুড়ে।

জানেন অনিমেষ, আমি আপনাকে দেখি।আমার চারপাশটা হাহাকার করে আপনার এই অসহায়ত্ব দেখে, প্রতিনিয়ত এই রাস্তায় আপনি যেই সময় আসেন, আমিও ঠিক সেই সময় পৌঁছে যাই সেখানে, আড়াল থেকে দেখি আপনাকে।চার বছর আগে যেখানে মিথ্যে টাকেও সত্য লেগেছিল,আজ চোখের সামনের সত্যটাকেও দেখতে অবিকল মিথ্যের মত লাগে।

মাঝেসাঝে একটা প্রশ্ন করতে ফেলতে ইচ্ছে করে।বলতে ইচ্ছে করে আচ্ছা অনিমেষ,আপনার আষ্টেপৃষ্ঠে যেমন মিথ্যা জড়িয়ে আছে, ঠিক তেমনই কী আমি আপনার জীবন জুড়ে কেবল এক মিথ্যা নামেই পরিচিত??
বলে দিলে পরের বার ইতি টানার সময় ভাবনা না লিখে ইতি মিথ্যা লেখার অভ্যেসটা করে নিতাম।





--------------------
মিথ্যামানব
    জারিন তাসনীম রুকু

0/Post a Comment/Comments

Please do not enter any spam link in the comment box.

Stay connected

FACEBOOK- Fans Like
TWITTER- Followers Follow
YOUTUBE- Subscribers Subscribe

Subscribe us

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner