মা আমাদের মা,,
- জুয়েল আশরাফ
মইটা এনে টিনের চালের বারান্দায় ঠেকালমা বললেন, কী হলো আরাফাত? শব্দ হলো কীসের?আরাফাত হাতে ধরা পাখিটি মাকে দেখিয়ে আনন্দ পাওয়া গলায় বলল, মা পাখি ধরেছি।মা চোখ কপালে তুলে বললেন, কী করেছিস পাজি ছেলে! পাখি ধরেছিস কেন? ছেড়ে দে।আরাফাত বলল, অনেক কষ্টে ধরেছি মা। পাখি ধরে ছেড়ে দিতে যাব কেন? পাখি ধরে কেউ ছেড়ে দেয় নাকি?মা বললেন, ওর ছানা আছে। ছানা দুটো কষ্ট পাবে। মা ছাড়া ছানা দুটো না খেয়ে মারা যাবে।মরুক, তাতে আমার কী! এই পাখি এখন আমার। কত লোকই তো পাখি ধরে। ছানার কথা ভেবে কি কেউ পাখি ধরে?মা হতাশভাবে মাথা নাড়লেন। তারপর বললেন, এমনভাবে বলিস না বাবা। তোর যেমন মায়ের দরকার আছে, ছানা দুটিরও মা দরকার। মা ছাড়া বাঁচতে পারবে না ওরা।আরাফাত হি হি করে হেসে উঠল। বলল, তুমি আজ অদ্ভুত কথা বলছো মা। ছানার বাঁচা মরা নিয়ে আমার কী? আমার খুশিতে আমি পাখি ধরে এনেছি।মা টের পেলেন, এই ছেলেকে বোঝানো মুশকিল। তিনি চলে গেলেন নিজের কাজে। আরাফাত পাখিটি তার পড়ার ঘরে এনে খাঁচার ভেতর ঢুকিয়ে দিল। সঙ্গে কিছু খাবার পানি দিয়ে খাঁচার দরজা দিল আটকে। এরপর দূরে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করল, পাখিটি কিছুই খাচ্ছে না। মায়ের ডাকে সে নিজের খাবার খেতে চলে গেল। এরপর দুপুরের ঘুম ঘুমানোর জন্য বিছানায় এলো। বিছানার পাশে চেয়ারের ওপর পাখির খাঁচা। সে খাঁচার ভেতর পাখি দেখতে দেখতে মহাসুখে ঘুমিয়ে পড়ল। প্রচন্ড ডাকাডাকিতে আরাফাতের ঘুম ভাঙল। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল বাবা। অস্থির গলায় বাবা বললেন, আরাফাত, শোনো, একটা খারাপ খবর আছে।বাবার এরকম অস্থির আর ভয় পাওয়া মুখ জীবনে দেখেনি আরাফাত। সে জিজ্ঞেস করল, কি হয়েছে বাবা?বাবা বললেন, আমি আর তোমার আম্মু শপিং করতে যাচ্ছিলাম। রাস্তা থেকে গুন্ডা পান্ডার একটা দল তোমার আম্মুকে তুলে নিয়ে গেছে। ওদের দাবি পাঁচ লাখ টাকা পেলেই ওরা তোমার আম্মুকে ছেড়ে দেবে। টাকাটা সন্ধ্যার আগেই পৌঁছাতে হবে, নাহলে ওরা তোমার আম্মুকে মেরে ফেলবে। আরাফাত কাঁদ কাঁদ গলায় বলল, এখন কি হবে বাবা? মাকে তো বাঁচাতেই হবে।বাবা বললেন, আমি টাকার সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। কিন্তু টাকাটা নিয়ে যেতে হবে তোমাকে। তোমার কাছ থেকে টাকাটা পেলেই ওরা তোমার আম্মুকে ছেড়ে দেবে।আরাফাত বলল, আমাকে তাড়াতাড়ি টাকাটা দাও বাবা। সন্ধ্যা হতে বেশি দেরি নেই। মাকে যে মুক্ত করে আনতেই হবে।টাকার ব্যাগ নিয়ে আরাফাত রওনা হলো। গুন্ডাদের ঠিকানা অনুযায়ী পুরানো আমলের একটা ভাঙা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। বাড়ির মুখে লোহার বিশাল গেট। লতাগুল্ম দিয়ে প্রায় অর্ধেক ঢেকে আছে বাড়িটি। গেট দিয়ে ঢুকতেই আরাফাতের বুক অজানা ভয়ে কেঁপে উঠল। সে বাড়ির ভেতরে ঢুকে অন্ধকার আবিস্কার করল। চারদিকে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ভেতরে কোনো আলো নেই। বাইরের গাছপালা বাড়ির ভেতরটাকে একেবারেই অন্ধকার করে দিয়েছে। অথচ এখনো বিকেল শুরু হয়নি। তাতেই এত অন্ধকার! আরাফাত বিশ্রী দুর্গন্ধ পেল। ওয়াক থু করতে শুরু করল সে। কয়েকটা চামচিকা তার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে চলে গেল। একটা হুতুম পেঁচা কোথ্থেকে ভুতুড়ে গলায় ডেকে উঠল। একের পর এক অন্ধকার ঘর পেরিয়ে যাচ্ছে তবু আরাফাত মায়ের কোনো হদিস পাচ্ছে না। তার একবার গর্তের মতো জায়গায় পা আটকে গিয়ে তীব্র ব্যথা পেল। তারপর চিৎকার করে মাকে ডাকতে লাগল। কিন্তু কেউ সাঁড়া দিল না।আরাফাত এবার কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, মা তুমি বোথায়? আমি তোমাকে নিতে এসেছি। গুন্ডাদের টাকা দিয়ে তোমাকে নিয়ে যাব।কোনো টু শব্দ নেই। কাওকেই খুঁজে পেল না। সে বসে পড়ল। দুই হাতে চোখ মুখ ঢেকে কাঁদতে শুরু করল আরাফাত। হঠাৎ অন্ধকারের ভেতর থেকে সে একটা কন্ঠ শুনতে পেল। একটা বাচ্চার কন্ঠ। সে চমকে উঠল, এরকম ভয়ংকর অন্ধকারে বাচ্চা মানুষের আওয়াজ!বাচ্চা কন্ঠটি বলল, কাঁদছো কেন আরাফাত? তোমার মাকে গুন্ডাদের দল ধরে নিয়ে গেছে বলে? আরাফাত জিজ্ঞেস করল, কে তুমি? কোথায় তুমি? তুমিই কি আমার মাকে আটকে রেখেছ? কেন আটকে রেখেছ?সেই বাচ্চা কন্ঠটা এবার হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, মায়ের জন্য এত ব্যস্ত হয়ে উঠেছ কেন আরাফাত? মা ছাড়া তোমার কি খুব মন খারাপ হচ্ছে?আরাফাত বলল, আমি মাকে ছাড়া একদম ভাল থাকতে পারি না। খেতে পারি না, ঘুমাতে পারি না, গোসল করতে পারি না। আমার সব কাজেই আমার মাকে দরকার হয়। মা ছাড়া আমি একেবারেই অচল।বাচ্চা কন্ঠটা হাসতে হাসতে বলল, খুব কষ্ট হচ্ছে আরাফাত? তুমি যখন মা পাখিকে ছানা দুটির কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছ, সেই ছানা দুটিরও ভয়ংকর কষ্ট হচ্ছে যেরকম মা ছাড়া কষ্ট তুমি পাচ্ছ। তোমার নিজের সব কাজের জন্য যেমন মায়ের দরকার হয়, পাখি ছানা দুটিরও মায়ের দরকার পড়ে খাবার ঘুমের জন্য, বাঁচার জন্য। মা ছাড়া ছানা দুটিও তোমার মতন অচল।আরাফাত কেঁদে বলল, আমি মা-পাখি আটকে রেখেছি বলে কি তুমি আমাকে শাস্তি দিচ্ছ?বাচ্চা কন্ঠটা রহস্যময় গলায় বলল, আমি শুধু তোমাকে দেখাচ্ছি কারোর মাকে ধরে নিয়ে গেলে কেমন লাগে। শুধু পাখির মা আর মানুষের মা নয়, পৃথিবীর যে কোনো জীব জন্তুুর কাছ থেকে মাকে আলাদা করে নিলে কিরকম কষ্ট হতে পারে বোঝো এখন? আরাফাত কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমি আর কোনোদিন কোনো মাকে ধরব না, সে পাখির মা হোক অথবা ফড়িংয়ের মা। আমি বাড়ি গিয়েই খাঁচা খুলে পাখি মাকে ছেড়ে দেব।বাচ্চা কন্ঠটি বলল, এই তো লক্ষী ছেলের মতো কথা! আমাদের সবার ভেতরেই মায়ের জন্য ভালবাসা রয়েছে, শুধু মানুষ আর পাখি কেন পৃথিবীর কোনো প্রাণী মা ছাড়া ভাল থাকে না।আরাফাত বলল, কেউ যেন পৃথিবীর কোনো মাকে কষ্ট না দেয় সেদিকে সতর্ক করব। আজকের পর আমি নিজেও সতর্ক হব। এখন আমার মাকে ছেড়ে দাও প্লীজ।বাচ্চা কন্ঠটা গুন্ডাদের মতো খিলখিল করে হেসে উঠল। আর সেই হাসির সঙ্গে আরাফাত চমকে জেগে উঠে দেখল, সে এখনো বিছানায় শুয়ে আছে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল সে। খাঁচার ভেতর পাখিটি ছটফট করছে। মা ইফতারের আয়োজন করে যাচ্ছেন। আরাফাত বলল, ছানা দুটি মা ছাড়া কত ঘন্টা বেঁচে থাকতে পারবে মা?এই ধরনের প্রশ্ন শুনে মা তাকিয়ে থাকলেন। আরাফাত জবাবের জন্য মোটেও অপেক্ষায় থাকবে না। সে জলদি করে খাঁচা খুলে পাখিটি বের করে বারান্দায় নিয়ে এলো। তার পিছু পিছু মা-ও এলেন চলে। পাখির মাথায় নরম করে একটা চুমু খেয়ে ছেড়ে দিল। ছাড়া পেয়েই পাখিটি ফুড়ুৎ উড়ে গিয়ে ঠিক আগের সেই জায়গায় যেখানে তার ছানা দুটি রয়েছে পৌঁছে গেল। আরাফাত নিজের মাকে জড়িয়ে ধরল। এরপর অবাক হয়ে সে লক্ষ্য করল, ছানা দুটিও তাদের মাকে জড়িয়ে ধরে যেন কৃতজ্ঞ চোখে তার দিকে অপলক তাকিয়ে রয়েছে।please Follow & Share
world books collect
please Follow & Share
world books collect


Post a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.