দয়ালু টুকুন-শিশুতোষ

 দয়ালু টুকুন

জহির টিয়া 



টুকুন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। খুব মেধাবী ছাত্র সে। আচার-ব্যবহারেও গ্রামের সকলের কাছে একজন ভালো ছেলে। সকলেই তাকে খুব আদর-স্নেহ করে, ভালবাসে। আর টুকটুকে মিষ্টি হাসি মুখে থাকে সদায়, তাই সবাই ছোট্ট করে ডাকে - টুকু।  
ফজরের আজান হলেই মায়ের সাথে সাথে উঠে পড়ে টুকুন। কখনো তাকে একটা ডাক ছাড়া, দ্বিতীয় ডাক দিতে হয় না মাকে। এরপর ফজরের নামাজ পড়ে, পড়তে বসে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে সে। নামাজ পড়ে এসেই, বইখাতা নিয়ে পড়তে বসে পড়ার টেবিলে। সকাল সকাল তাকে গণিত ও ইংরেজি পড়তে ভালো লাগে। এ সময় মনটা তরতাজা থাকে। সহজেই ব্রেনে ক্যাচ করে। অন্য বিষয়ের চাইতে যেহেতু গণিত ও ইংরেজিটা একটু কঠিন। তাই সকালেই এই বিষয় দুটি লিখতে পড়তে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে টুকুন। 

একদিন সকালে কেবলেই পড়তে বসেছে। এমন সময় পাশের বাড়ি হতে কান্নার আওয়াজ কানে যায় টুকুনের। সে জানে, পাশের বাড়ির রাসুর দাদিটা কয়েকদিন ধরে বেশ অসুস্থ। টুকুন পড়ার টেবিল হতে উঠে, এক দৌঁড়ে পৌঁছে যায় সেখানে। গিয়ে দেখে, রাসুর দাদি চোখ উল্টাইয়া কেমন করছে। আর বিড়বিড় করে কী যেন বকছে। রাসুর বাপ তার দাদির একমাত্র ছেলে। রাসুর বাপ শহরে রাজমিস্ত্রির কাজ করে। রাসুরা দুই ভাই-বোন মায়ের সাথে দাদির কাছেই গ্রামে থাকে। রাসুর বয়স পাঁচ বছর আর তার ছোট বোনের বয়স দুই বছরের মতো। রাসু দাদির পাশে বসে অঝরে কাঁদছে। দুই গাল বেয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। রাসুর মাও হাউমাউ করে কাঁদছে আর আঁচল দিয়ে চোখ মুছছে। টুকুন এই দৃশ্য দেখে, নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না।
সে নিজেই ডাক্তার আনতে ছুটে গেল । ডাক্তার ডেকে আনা থেকে শুরু করে ওষুধপাতি সবকিছু কিনে আনে ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে। রাসুর দাদিকে ঝুলন্ত স্যালাইন দেওয়া হয় । এমন মহৎ কাজে টুকুনের সময়টা কেটে যায় । এদিকে স্কুলের সময়ও হয়ে যাওয়ায়, তাড়াতাড়ি করে অল্প কিছু খেয়ে স্কুলে চলে যায় টুকুন। 

দ্বিতীয় পিরিয়ডে গণিতের স্যার, লিকলিকে একটা লম্বা লাঠি হাতে প্রবেশ করেন। স্যার যে খুব রাগি তা নয়। তবে মাঝেমধ্যে মারেন। বিশেষ করে, বাড়ির কাজ করে না নিয়ে গেলে মারেন । স্যারের একটাই টাটকা কথা- অঙ্ক পার আর না পার খাতা জমা দিতে হবে। তাহলেই বুঝব বাড়িতে পড়তে বসেছিস।
ক্লাশে ঢুকেই স্যার বাড়ির কাজের খাতা জমা চাইলেন। একেএকে সবাই খাতা জমা দিল। টুকুনও খাতা জমা দেওয়ার জন্য ব্যাগ খুঁজতে গিয়ে মনে পড়ে যায়, সে গণিত খাতা আনে নি। এমন কি বাড়িতে অঙ্ক করারও সময় হয়নি তার । রাসুর দাদির জন্য ডাক্তার ডাকতে গিয়ে সকালের পুরো সময়টা ওদিকেই নষ্ট হয়। নষ্ট বলা ঠিক হবে না, একটি মানবিক কাজ করে টুকুন।  অঙ্ক স্যার ভয়ংকর কণ্ঠে বললেন- কে কে বাড়ির কাজ করে আনিস নি দাঁড়া ? কয়েকজনের সাথে টুকুনও দাঁড়ালো। স্যার চোখ লাল লাল করে কঠিন কণ্ঠস্বরে টুকুনের দিকে এগিয়ে বললেন- তুইও বাড়ির কাজ করে আনিস নি ? 
তখন টুকুন বুকে সাহস নিয়ে স্যারকে সকালের ঘটে যাওয়া ঘটনাটা বলল। তাতেই স্যার ঠোঁটের ফাঁকে মৃদু হাসি দিয়ে বললেন- বাহ্ দারুণ একটা কাজ করেছ টুকুন ! পরের উপকার করাই হলো ধরণীতে শ্রেষ্ঠ কর্ম । এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ কর্ম আর হতে পারে না। তুমি এই বয়সে যেটা করেছ, সত্যিই প্রশংসা পাওয়ার দাবিদার। ভেরি গুড জব ডিয়ার। টুকুনের গা-গতরে হাত দিয়ে আদর করে বললেন স্যার। কিন্তু শোনো, ছুটির পরে এই অঙ্কগুলো অবশ্যই করতে হবে। প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিনই করে নিতে হবে। পরে করব বলে ফেলে রাখতে নেই। 
টুকুন স্যারের কথাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলো। তারপর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসির রেখা টেনে বলল- ঠিক আছে স্যার।

0/Post a Comment/Comments

Please do not enter any spam link in the comment box.

Stay connected

FACEBOOK- Fans Like
TWITTER- Followers Follow
YOUTUBE- Subscribers Subscribe

Subscribe us

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner