ছুঁয়ে দিল কেউ
মোঃ তোফায়েল হোসেন
বর্ষার ঝিরঝির বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে অবশেষে পাহাড়ী শহরটায় এসে পৌঁছিলাম পড়ন্ত বিকেলে। শহরের একদম দক্ষিণ সীমানায় পাহাড়ী ঢালে একটা কর্টেজ আগেই ভাড়া করা ছিল ছদ্মনামে। সোজা গিয়ে উঠলাম সেখানে। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ আর অবিরাম বৃষ্টির কারণে ততক্ষণে সন্ধ্যার হাতছানি শুরু হয়ে গেছে।
গোপনীয় একটা কাজ দিয়ে আমাকে পাঠানো হয়েছে এ শহরে। এটাই আমার পেশা আর এ ধরনের কাজ আমার নেশাও। সন্ধ্যা, রাতের কাছে বিলিন হওয়ার আগেই দ্রুত নিজেকে স্থির করলাম। চেয়ার টেনে বসে পড়লাম পশ্চিমের খোলা জানালার পাশে। এখানে আসার উদ্দেশ্যটা সফল করতে হলে নিয়ে আসা ছকটাকে কিছু ঘষা-মাজা করা দরকার। মাথাটাকে যতটা সম্ভব ঠাণ্ডা রেখে যখন চিন্তায় বসার প্রস্তুতি শেষ করলাম ঠিক তখন দরজার কড়ায় নাড়া দিল কেউ।
অবাক হলাম! এ শহরে কেউ আসার নেই আমার কাছে। এমনকি আমি যে এখানে আছি কারও তা জানার কথাও নয়। কর্টেজ কর্তৃপক্ষকেও বলা হয়েছিল- আমি না চাইলে এখানে যেন তাদের কেউ আমার ছায়াও না মাড়ায়।
কিছুটা বিচলিতভাবেই দরজার কপাট উন্মুক্ত করলাম। মধ্যবয়সী এক লোক দাড়িয়ে আছে ওপাশে। দেখেই বুঝা যায় দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করছে লোকটা। হাড্ডিসার দেহের পরিধেয় ভেজা কাপড়ে অসংখ্য ছেড়া আর তালির চিহ্ন দৃশ্যমান। আমি লোকটাকে এখানে আসার কারণ জিজ্ঞাস করলাম। সে বেশ ভদ্রভাবেই ভেতরে ঢুকার অনুমতি চাইল। কিছুটা দ্বিধা নিয়েই তাকে রুমে ঢুকালাম তবে উন্মুক্ত রেখে দিলাম দরজার কপাট। আমি জানি যে কাজে নিয়োজিত আছি সেখানে ভুল সংশোধনের কোন সুযোগ নেই। অতএব ভুল করার কোন অবকাশ রাখা চলবে না।
এরকম শহরে এরকম লোকেরা যে জন্য আমাদের মতো নিঃসঙ্গ মানুষের দরজায় কড়া নাড়ে রাতের আঁধারে- সেও এর ব্যতিক্রম হল না। নিঃসঙ্গ মানুষের রাতের নিঃসঙ্গতা দূর করার ব্যবসা করে সে। আমার জন্যও এমন প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। আমি ধীর-স্থিরভাবে তার প্রস্তাব প্রত্যাখান করলাম। সেও চলে গেল বৃষ্টিতে ভিজে।
পরদিন রাতে সে আবার উপস্থিত। বুঝলাম কর্টেজ কর্তৃপক্ষ বিক্রি হয়ে গেছে নয়তোবা আগেই বিক্রি হয়ে আছে। বিরক্ত হলেও মেনে নিতে হল। আমার পেশায় অনেক কিছু ভাবতে হয়। প্রতিক্রিয়াটা বিভিন্ন শাখায় প্রশাখায় নিয়ে বিশ্লেষণ করতে হয়। এ বিষয়টাও তেমনই ভাবে নিতে বাধ্য হলাম। লোকটাকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য কিছু আশ্বাস দিলাম। জানালাম আমি এখানে থাকছি বেশ কিছুদিন। দু’-চারদিন পরে যেন সে আবার যোগাযোগ করে আমার সাথে। আমার কথা শুনে তার কি অভিব্যক্তি হল তা তার চেহারায় প্রকাশ পেল না। তবে যাওয়ার আগে দরজার চৌকাঠ থেকে ফেরত এসে একটা থ্রি-আর ছবি দিল আমাকে।
ছবিটা দেখে চমকে উঠলাম। অপূর্ব একটা মুখাবয়। কিশোরী এক মেয়ের নিষ্পাপ একটা স্থির দৃষ্টি যেন আমার অন্তরের অন্তরস্থলে আঘাত হানলো। বাকি অংশটা বিব্রতকর! নিজেকে আকর্ষণীয় আর কামুক দেখানোর জন্য নোংরামি ছাড়া যতটা লোভনীয় অঙ্গভঙ্গি করা যায় তার সবটাই বিদ্যমান। মুখমণ্ডলের সাথে শরীরের বাকি অঙ্গপ্রতঙ্গের অদ্ভুত অমিল। পাপ তার শরীরে বাসা বেঁধেছে- হয়তো সে স্বেচ্ছায় তা করেছে নয়তো কেউ তাকে বাধ্য করেছে। কিন্তু তার ঠোঁট, চোখ, গাল, নাক, কান এসবে পাপ যেন ছুঁয়েও যেতে পারেনি।
হঠাৎ আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ করলাম। মেয়েটার চোখে মুখে যে নিষ্পাপের চিহ্ন দেখেছিলাম তা যেন উধাও হয়ে গেছে। নিম্নাংশের ছায়া পড়েছে যেন সেখানে। মোহিনীর প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠল আমার নিঃসঙ্গ পুরুষত্বে।
আমি লোকটাকে কিছু বলব বলে চোখ তুললাম। দেখলাম সে চৌকাঠ পেরিয়ে রাস্তায় নেমে গেছে। যতক্ষণে তাকে ডাকলাম ততক্ষণে সে অন্ধকারে হারিয়ে গেল। কেন জানি জ্বর আসা কাপন শুরু হয়ে গেল আমার সমস্ত শরীরে। হেটে গিয়ে দাঁড়ালাম আয়নার সামনে। নিজেকে অচেনাই মনে হল। চোখে চোখ পড়তে আমি স্পষ্ট আমার চোখের ভাষা পড়তে পারলাম। ভাবলাম লোকটাও হয়তো আমার চোখের ভাষা পড়ে নিয়েছে।
ঘন্টখানেক পর ছবির মেয়েটা একাই এসে হাজির হল কর্টেজের দরজায়। আমি তাকে আমন্ত্রণ জানালাম বেহায়ার মতো। সেও নিজেকে পরিপক্ক এবং কামনীয়ভাবে প্রকাশ করে পারদর্শিতার সাথে প্রবেশ করল। আজ আর উন্মুক্ত রাখলাম না কপাট।
মেয়েটার মধ্যে কোন জড়তা নেই। কিন্তু আমি নিজেকে ফিরে পাওয়ার চেষ্টায় ব্যর্থ হচ্ছি বারবার। তাই দৃষ্টিটা সয়ংক্রিয়ভাবে উদাস হয়ে রইল। রাতের জন্য নিজেকে বিক্রি করার বিনিময় মূল্য হিসেবে সে ইশারায় আমাকে পাঁচশত টাকার প্রস্তাব দিল। আমি থাকলাম তার দিকে। কেঁপে উঠল আমার গোটা অস্তিত্ব। একটা কিশোরীর নিষ্পাপ মুখাবয়ব আমার একহাত ধূরে দর্পনের মতো স্থির হয়ে আছে। আমি অবশ হয়ে গেলাম। মেয়েটাকে বিদায় দেওয়ার জন্য দরজার কপাট উন্মুক্ত করলাম। অনেক কষ্টে ক্ষিণ কন্ঠে তাকে চলে যাওয়ার জন্য বললাম।
সে এসে দাঁড়ালো আমার পাশে। আলতো করে কপাটগুলো আটকে দিল আবার। আমাকে হতভম্ব করে দিয়ে একটানে উন্মুক্ত করে দিল শরীরের উর্ধাংশ। আমি দৃষ্টি নত করে দাড়িয়ে রইলাম। সে আমাকে টেনে নিতে চাইল বিছানায়। আমি পাথর হয়ে গেলাম। তারপর হঠাৎ করেই আবার নিজেকে ফিরে পেলাম। শক্তহাতে তাকে ধরে বসিয়ে দিলাম বিছানায়। মেঝে থেকে তার জামাটা তুলে এনে ঢেকে দিলাম তার উন্মুক্ত শরীর।
মেয়েটা এবার হু হু করে কেঁদে উঠল। তার পেটটা উন্মুক্ত করে ইশারায় আমাকে দেখাল। দৃষ্টি দিতেই বুঝে গেলাম- অভুক্ত সে। আর তখনই আমার কাছে ধরা দিল আরেকটা বিস্ময়- মেয়েটা বোবা!
তবে সে লেখাপড়া জানে। আমার কাছে ইশারায় কাগজ কলম চাইল। আমি আমার ডায়েরী আর কলম তার হাতে দিলাম। সে লিখে দিল তার অব্যক্ত কথাগুলো-
মেয়েটা তার লেখার প্রথমেই লেখেছিল- আমি টাকায় বিক্রি হই। আর বিক্রি না হতে পারলে অভূক্ত রই। তবে বিক্রি হওয়ার চেয়ে অভুক্ত থাকাটাই আমার কাছে উত্তম মনে হয়। কিন্তু পেটের জ্বালা আর বাবার প্রতি ভালোবাসার চেয়ে বড় কিছু আছে বলে মনে হয়না। তাই এ জ্বালার কাছে হেরে গিয়ে আমি বাধ্য হয়েই বিক্রি হই।
মেয়েটা এর পরে লিখেছিল- খুব ছোট থাকতে যখন মাকে হারালাম তখন থেকেই বাবা আমাকে আদর স্নেহে বড় করে তুললেন। ভিটে-মাটিহীন ছিলাম আমরা। মা মারা যাওয়ার পর থেকেই বাবা আমাকে নিয়ে স্থানান্তর হতে লাগলেন। অবশেষে এখানে এসে স্থির হলেন এবং আমাকে পণ্য বানালেন। এ শহরে টাকাওয়ালা লোকেরা খুব কমই আসে। তারপরও বাবা আপনার মতো লোকদের খোঁজে বের করে ঠিকই আমাকে বিক্রি করেন। বাবা খুব ভালো ফেরিওয়ালা। বাবা আমার রাতের ফেরিওয়ালা। তিনি নিজের মেয়ের দেহ ফেরিওয়ালা!
আমার দ্বারা যতটা সম্ভব ততটা সাহায্য করে তাকে মুক্তির আশ্বাস দিয়ে বিদায় দিলাম। জীবন, পৃথিবী আর মেয়েটার ভাবনায় সারারাত র্নিঘুম রইলাম। ভোরেই আমি আমার মূল সূত্রের পিছু অনুসরণ করে সে শহর ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলাম বলে আর দেখা করতে পারিনি মেয়েটার সাথে।
তবে আবারও গিয়েছিলাম ঐ শহরে কিছুদিন পর। জেনেছিলাম সে আর নেই- রাতের ফেরিওয়ালা বাবার পণ্য হওয়ার জন্য, পাঁচশত টাকার বিনিময়ে রাতে বিক্রি হওয়ার জন্য। বেশ কয়েকদিন আগে সে মারা গেছে অথবা কেউ তাকে মেরে ফেলেছে রাতের আঁধারে!

Post a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.