বাহানা
মোঃ তোফায়েল হোসেন
আশার যন্ত্রণায় বাসা ছাড়ার পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু অদৃশ্য একটা শক্তি আমাকে বেঁধে রাখল বিধায় আমি আশার কাছে পরাজিত হলাম। তবে তখন কি জানতাম একটা মেয়ের অবৈধ্য প্রেম আমার কাঁধে মিথ্যে অপবাদের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে অপরাধী সাজিয়ে রাস্তায় নামিয়ে দিবে।
বরাবরই নিঃসঙ্গ বাউণ্ডুলে মানুষ আমি। আশাদের চিলেকোঠায় একা একাই ভাড়া থাকি। ব্যস্ত শহরের অলি-গলিতে হেটে হেটে কয়েক জোড়া জুতো ক্ষয় করার পর ছোট একটা চাকরী জুটাতে সক্ষম হয়েছি। অফিসের কাছাকাছি নিজের সীমাবদ্ধতার মাঝে একটা মাথা গুজার সন্ধানে যখন পাগল প্রায় তখন হঠাৎ করেই ভাগ্যগুণে এই পায়রার খোপটা পেয়ে গেলাম।
যেদিন প্রথম সেখানে উঠলাম সেদিনই বাড়িওয়ালার একমাত্র মেয়ে আশা আমার ঘরে এল। চঞ্চল একটা হরিণী! আমার অন্তরাত্মা অন্ধকার পাজড়ের খাঁচায় জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল। সে বেশ কয়েকটা অলিখিত রুল জারী করল আমার উপর- যা ছিল সব তার জন্য। তার সামনে পড়লে কি করতে হবে, সে ছাদে আসলে কি করতে হবে ইত্যাদি। আমি চুপচাপ তার প্রজ্ঞাপন পাঠ শুনলাম আর উপর নিচ মাথা নাড়াতে থাকলাম।
সুভাগ্য না র্দূভাগ্য জানি না তবে প্রতিদিনই তার সাথে কোথাও না কোথাও আমার দেখা হয়ে যেত। সে মুখোমুখি হলেই আমার গোটা কাঠামোতে কাঁপন ধরত। অনেকভাবে বুঝার চেষ্টা করেও এই অনুভূতির মর্মার্থ বুঝে উঠতে পারিনি। সবচেয়ে কম অস্বস্তিতে পড়তাম যখন ফুটপাতে দেখা হত। আমি হাটতাম ডাস্টবিন, ভিখারি, হকারদের পাশ কাটিয়ে আর আশা লাল মারুতিতে চড়ে ভদ্র সমাজের ভদ্রলোকদের লেটেস্ট মডেলের গাড়ি পাশ কাটাত এবং গাড়ির গ্লাস নামিয়ে কটমট এক দৃষ্টি দিয়ে আমার ক্লান্তিহীন হাটা দেখত। আমার পা ক্ষণিকের জন্য থেমে যেত, আটকে যেত ফুটপাতের স্লাবে।
দিন গড়ানোর সাথে সাথে আশার দূরন্তপনা বাড়তে লাগল। আমি রুমে থাকলে কারণে অকারণে ছাদে তার পদচারণ বেড়ে যেত। তার পোশাক পরিচ্ছদে, হাটা চলায় নিজেকে প্রকাশ করে আমাকে অবশ করে দেওয়ার একটা প্রচেষ্টা বরাবরই ছিল- যা আমার দৃষ্টিতে খুব ভালভাবেই ধরা পড়ল।
একদিন হঠাৎ করেই আশা সিঁড়িতে আমাকে আগলে তার দেয়া রুল ভঙ্গের অভিযোগ করল- যা ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যে। আমি কিছু বলতে পারিনি। মূলতঃ কথা আটকে গেল। কিন্তু সেই মুহূর্তে আবিষ্কার করলাম তার গভীর দু’টি চোখের আমোঘ চুম্বকিয় শক্তি আমাকে অদ্ভুতভাবে টানছে। আমি দৌড়ে পালালাম আর আশা খিল খিল করে হাসতে লাগল।
জানিনা এ সাহস কোথায় পেলাম তবুও সেদিন বিকেলে যখন আশা ছাদে হাটছিল তখন রুম থেকে তাকে লক্ষ্য করলাম। আমার দৃষ্টিতে আবিষ্কৃত হল তার শরীরের ত্রুটিহীন আকর্ষণীয় বাঁক। আমি অন্ধ হয়ে গেলাম। তবে স্পষ্ট বুঝলাম আমাকে ঘায়েল করার প্রচেষ্টায় আশা সফল।
পরদিন বাসা থেকে দু’শ গজ দূরে যখন আশা আমাকে গাড়িতে উঠার আমন্ত্রণ জানাল তখনই আবিষ্কার করলাম- একটা অনির্বচনীয় স্বপ্ন, একটা অচেনা সুখস্বাদ আমাকে জনারণ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে উষ্ণ ভূমণ্ডলের বাইরে কামনা বাসনাপূর্ণ কোন জগতে ঠাঁই করে দিতে তার এই শিহরণ জাগানো হাতছানি। কিন্তু নিজের অবস্থান হঠাৎ করেই অস্তিত্বে নাড়া দিয়ে গেল। কাজের দোহাই দিয়ে পালিয়ে গেলাম।
আশা নতুন করে, নতুন নিয়মে জ্বালাতন শুরু করল। দেখা হলেই চোখের ভাষায় অজানা একটা ইঙ্গিত দিত। বিধাতার ত্রুটিহীণ অপূর্ব সৃষ্টি নিজের শরীরকে মাধ্যম করে আমাকে কাছে টানতে চাইল। আমি তার সব ইঙ্গিত বুঝলাম কিন্তু কিছুতেই আমার প্রতি তার এ চাহিদার শিকড় খোঁজে পেলাম না। তাই যেমন ছিলাম তেমন অধরাই থাকলাম।
সময়ের সাথে আশা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠলো। কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে এখানে সেখানে আমার উপর চড়াও হতে লাগল। এমন কি সুযোগ পেলে আমার রুমে এসেও আক্রমণ করতে দ্বিধা করল না। প্রচণ্ড শক্তিতে আমাকে তার শরীরে টানার চেষ্টা করতেই থাকল। স্পর্শ শিহরণ বুঝিয়ে দিতে বারবার ছুঁয়ে দিতে লাগল আমার অনামিকা, আমার কনিষ্ঠা, আমার কাঁধ, আমার চিবুক!
আশার বয়সটা আবেগী আর আমি সে বয়স পেরিয়ে এসেছি বেশ আগে। তাই আশা না জানলেও আমি স্পষ্ট জানি আমাদের চাওয়ার ব্যবধান। জানি এ চাহিদার ফল। কিন্তু না করার ভাষাটা যে হারিয়ে ফেলেছি সেদিন থেকেই যেদিন প্রথম আশা আমার দৃষ্টি সীমায় এসে দাড়িয়েছিল।
একদিন আশা আমাকে বাধ্য করল তার গাড়িতে চড়তে। নিজে ড্রাইভ করে নিয়ে গেল শহর থেকে বেশ দূরে তার বাবার আদিগন্ত শ্যামল নির্জন এক বাংলোয়। কিছু বুঝার আগেই একটা মোহমায়ার পিছু ছুটে নির্জন একটা রুমে তার সাথে ঢুকে গেলাম। সে দুধে আলতা শরীরের ভাজ উন্মুক্ত করে দিল আমার জন্য। মুহূর্তে তার শরীরের মোহনীয় ঘ্রাণ আমার শিরায় ঢুকে রক্তে মিশে গেল।
তারপরই ভিজে গেল মন। তার ক্ষুধার্ত দেহ সোহাগের আরক পান করিয়ে ঝড় বহিয়ে দিল আমার আমিত্বে। ক্লান্ত দুপুর থেকে গোধূলী পর্যন্ত শ্রান্তিহীন, ক্লান্তিহীন দু’জন- যেন দূরন্ত ঝড় আমাদের আছড়ে দিল, উড়িয়ে নিতে চাইল। তারপর বিপর্যস্ত বিবসন আশার নিঃসাড় দেহটা লেপটে গেল বিছানায়। যেন বৈশাখের প্রবল ঝড়ের পরে উত্থাল গাঙ্গের মরা মাছ ডাঙ্গায় পড়ে আছে।
আমি বোকা না চালাক এ প্রশ্নের উত্তর নিজের কাছ থেকে বের করতে পারলাম না। আশার বাবার অঢেল সম্পদ আমাকে একবারও স্পর্শ করতে পারলনা ঠিক কিন্তু আশার শরীর ঠিকই আমাকে স্পর্শ করে অপরাধী বানিয়ে দিল।
সেদিনের পর থেকে সে আরও বেপরোয়া হয়ে গেল। কিন্তু আমি নিজের লাগাম নিজেই টেনে ধরলাম। জানি ওখানে ডুবে গেলে উঠে আসার আর কোন উপায় নেই যতক্ষণ লাশ হয়ে অন্যের কাঁধে চড়ে না উঠি। তাই তাকে বুঝিয়ে বললাম। ক্ষমা চাইলাম নিজের অপরাধের জন্য। সে সব দোষ তার নিজের উপর নিয়ে আমাকে বলল- তুমি যে সামাজিক বাঁধার কথা বলছ তা না হয় না ডিঙ্গানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমরা তো ভেসে যেতে পারি দু’জন দু’জনার মাঝে- যতদিন দু’টি দেহ পরস্পরকে চায়।
অনেক বুঝানোর পরও যখন আশা অবিচল থাকল তখন সিদ্ধান্ত নিলাম- বাসা ছেড়ে দেব। কিন্তু প্রস্তুতি শেষ করেও পারলাম না চলে যেতে শুধু আশার করুণ চোখ দেখে। সে বলল- আমি আর কিছু চাইব না তোমার কাছে কিন্তু তুমি চলে যেও না, থাকো আমার দৃষ্টিতে। আমি তোমাকে দেখে দেখে একসময় হয়তো ক্লান্ত হয়ে যাব। তখন না হয় চলে যেও।
ভাবনার সাগরে হাবুডুবু খেতে খেতে হারিয়ে ফেললাম বেশ কয়েকটা প্রহর। তারপর অনেক পরে সিদ্ধান্তে আসলাম- যা হয় হোক, ডুবব আশার বুকে। ঝড় আর ভূমিকম্প সৃষ্টি করব দু’জনার পৃথিবীতে। আর ক্লান্ত হয়ে ঘুমাব শান্তির ঘুম। তাই জীবন তরী আশার বন্দরে ভিড়িয়ে তাকে জানালাম- আমি ডুব দিতে চাই তোমার উন্মুক্ত প্রেম সাগরে।
সে তার ঝাপসা দৃষ্টি আমার দৃষ্টিতে রেখে উত্তর দিল- অনেক দেরী হয়ে গেছে বন্ধু। এখন আমি অন্য ঠিকানায় ভালোবাসার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করে ফেলেছি!
ব্যথায় নীল হয়ে গেল মন। পরমুহূর্তে স্বাভাবিক হয়ে গেল সব। জীবনকে জীবনের মত চালিয়ে নিতে দূরে কোথাও হারিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। বদলির অজুহাত দেখিয়ে আশার বাবাকে জানালাম কাল ভোরে চলে যাচ্ছি।
সে রাতেই এক নির্মম সত্য প্রকাশিত হল। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল আশা। ডাক্তার, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, তারপর প্রকাশিত- আশা তিন মাসের অন্তঃসত্তা!
আশার বাবার তর্জন গর্জনময় উত্তপ্ত প্রহরে তার তর্জনি আমাকে দেখিয়ে দিল। আমি বিমূঢ় হয়ে গেলাম। আশার সাথে বাংলোয় গেছি এখনো মাস পেরোয়নি। তাহলে এ কি বলছে আশা! ভাবনার অতলে হারানোর আগেই আশার বাবা পারিবারিক সম্মান রক্ষার্থে কোন উচ্চবাক্য না করে আমাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে রক্ত চোখে তাকিয়ে মুহূর্তের নোটিশে বাসা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন।
কেমন করে কি হল, কোনও অনুভূতি নেই আমার। চেতনাও হারিয়ে ফেলার উপক্রম। নিদ্রিত, না মূর্চিত নাকি সম্মোহিত বুঝে উঠতে পারছি না। বিপর্যস্ত শরীর শিথিল, পড়ে যেতে চাইছে মেঝেতে। একটা দূরন্ত ঘূর্ণীঝড় বয়ে গেল আমার উপর দিয়ে। শরীরের সব জোড় খুলে যাচ্ছে যেন। মনে হল ভেসে চলছি প্রচণ্ড প্লাবনে। আশপাশের কোন শব্দই কানে যাচ্ছে না। তবুও নিজের সমস্ত ক্ষমতা একত্র করে পা বাড়ালাম দরজার দিকে।
বর্ষার আকাশে মেঘের দৌড় খেলা। আমার আকাশে অঝর শ্রাবণ। এক বোঝা অপরাধ নিয়ে রাস্তায় হারাতে চলছি। আশাদের বাসার সীমানায় দাড়িয়ে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হল- যে দোষে দোষী হলাম সে দোষ তো আমার নয়।
কিন্তু হল না আর বলা। হল না আর দৃষ্টি ফিরিয়ে পিছনে দেখা।


Post a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.