তন্দ্রাচ্ছন্ন
মোঃ তোফায়েল হোসেন
আমরা থাকতাম শহরের দক্ষিণ প্রান্তে, রাস্তার উত্তর ও দক্ষিণ পাশে মুখোমুখি; একটু উপর নিচ। প্রায় দুই মাসের একটা জরুরী কাজ নিয়ে গিয়েছিলাম আমি সেই শহরে। মেসের দু’তলার যে রুমে আমি থাকতাম তার একমাত্র উত্তরমুখি জানালার পাশেই ছিল আমার বিছানা। ওখানে শুলেই আকাশ দেখা যেত আর প্রায়ই দেখা যেত রাস্তার ওপাশের নীল বিল্ডিংটার তিন তলার ফ্ল্যাটের দক্ষিণমুখি একটা খোলা জানালায় দাড়ানো এক তন্বী পরীকে। সম্ভবত ঐ রুমটায় মেয়েটা থাকতো। মাঝে মাঝে সে জানালায় দাড়িয়ে দৃষ্টি ঘুরাত কিন্তু কখনো স্থীর দৃষ্টি দিত না আমার জানালায়। আমি হুচট খেতাম, তবুও আমার বাউণ্ডুলে জীবন আর পেশার কথা ভেবে আনমনা হয়ে যেতাম।
চৈত্রের এক দুপুরে যখন আমি মেস থেকে বের হয়ে রাস্তায় নামলাম তখন সে একটা গাড়ি থেকে নেমে তার বিল্ডিং-এর দিকে পা বাড়াচ্ছে। বিদায় মুহূর্তে গাড়ির ভেতর থেকে তার সমবয়সী একটা মেয়ে নাম ধরে ডেকে তাকে থামিয়ে কাল আসবে এ নিশ্চয়তা দিয়ে গেল। সুভাগ্যক্রমে আমি তন্দ্রার নামটা জেনে গেলাম।
যদিও কষ্টরা প্রতিনিয়ত আমাকে ব্যঙ্গ করতো তারপরও আমি তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে গেলাম। কিন্তু সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ায় ভালোবাসি শব্দটা বলার আগেই আমার বিদায় ঘন্টা বেজে গেল। যেদিন সন্ধ্যায় আমি মায়াময় সেই শহর ছেড়েছিলাম সেদিন পড়ন্ত বিকেলেই তন্দ্রার দৃষ্টি হাওয়ায় উড়ে এসেছিল তার নীল ফ্ল্যাটের জানালা থেকে আমার ভাঙা জানালায়- এক মায়াবী কষ্টের জন্ম দিতে। তন্দ্রা তার জানালায় দাড়িয়ে অপলক নয়নে দীর্ঘ সময় আমার জানালায় তাকিয়েছিল। আমি তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়েছিলাম নাকি তন্দ্রাকে তন্দ্রা আচ্ছন্ন করেছিল তা বুঝিনি। তারপরও আমার এলোমেলো জীবনের নিয়মেই সন্ধ্যার আধারে সম্পূর্ণ আর এক রূপ নিয়ে ছদ্মবেশে সেই শহর ছেড়ে প্রায় পাঁচশত মাইল দূরে আরেক শহরের দিকে রওয়ানা দিতে বাধ্য হলাম।
প্রায় দুই মাস ধরে আমি নতুন শহরে একজন উড়ন্ত ব্যবসায়ীর বেশে ঘুরে বেড়াচ্ছি। একদিন গোধূলী বেলায় রেন্ট-এ-কার থেকে ভাড়া করা গাড়িটা নিয়ে শহরের বাহিরে থেকে শহরে ফিরছিলাম। রিজার্ভ ফরেস্টের ভিতর দিয়ে রাস্তাটা চলে গেছে একে-বেঁকে। একমনে গাড়ি চালাচ্ছিলাম আর ডিভিডিতে শুনছিলাম আমার প্রিয় সেই গান- “আমি অন্তর থেকে বলছি, আমি আত্মা থেকে বলছি; আমি হৃদয় দুয়ারে দাড়িয়ে একা, তোমার প্রহর গুনছি।”
শহরের কাছাকাছি চলে এসেছি এমন সময় মোবাইল অপারেটর কোম্পানির নির্ধারিত নম্বার থেকে ফোন এলো। অন্য সময় বিরক্ত লাগে এই ফোনগুলো। কিন্তু কেন জানি তখন অনেকটা আগ্রহ নিয়ে রিসিভ করলাম। বরাবরের মতো একটা মিষ্টি কন্ঠ ভেসে এলো। জানালো তাদের একটা অফার সম্পর্কে। তার বিস্তারিত বিবরণ শুনতে শুনতে শহরে প্রবেশ করলাম।
সেদিন রাত প্রায় দশটার দিকে অপরিচিত একটা নম্বার থেকে ফোন এলো। তন্দ্রা নামে পরিচয় দিল। নামটা শুনেই শিহরণ বয়ে গেল গোটা শরীরে। তারপর নিজের বোকামি বুঝতে পেরে মনে মনে হেসে উঠলাম- হাজার হাজার তন্দ্রা আছে পৃথিবীতে! কিন্তু আমি কি জানতাম বিচিত্র পৃথিবী তার বিচিত্র খেলায় আমাকে আরেকটা বিচিত্র প্রহসন উপহার দিবে।
মেয়েটা যা বললো তার সারমর্ম হলো- সে একটা মোবাইল অপারেটর কোম্পানিতে চাকুরী করে। আজ পড়ন্ত বিকেলে সেই আমাকে ফোন দিয়েছিল তাদের একটা অফার জানাতে। প্রতিদিন সে হাওয়ায় ভেসে আসা অনেক কন্ঠ শুনে, কিন্তু কেন যেন আমার কন্ঠ তাকে মোহাচ্ছন্ন করেছে। আমি যদি রাজি হই সে মাঝে মাঝে আমার সাথে কথা বলতে চায়।
আমি তাকে প্রশ্ন করলাম- আপনি আমার সম্পর্কে তো কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না; নাকি আমাকে জানেন? উত্তরে সে বললো- আমি আপনার কন্ঠে মুগ্ধ। তারপরও যদি নিজের সম্পর্কে বলেন কৃতজ্ঞ হবো।
আমার পেশা অবৈধ না হলেও অনেক গোপনীয়তা, অনেক বিপদ তার মাঝে জড়িত থাকে বিধায় আমি আমার বর্তমান পরিচয়টাই দিলাম। সাথে আমার বাউণ্ডুলে জীবনটার একটা চিত্রও তাকে বলে দিলাম। অতপরঃ তার ঠিকানা জানতে চাইলাম। সে বেশ আগ্রহ নিয়ে জানালো। তার কথা শুনে, কিছু প্রশ্ন করার পর বিষ্ময়ের সাথে আবিস্কার করলাম- এ সেই তন্দ্র, যে মায়াময় সেই শহরের নীল ফ্ল্যাটের জানালায় দাড়িয়ে দৃষ্টি দিয়েছিল বিদায় বেলায়।
আমি বিষয়টা তার কাছে গোপন রাখলাম। তন্দ্রা প্রতিদিন, প্রতিরাত ফোন দিত। আমরা বিছিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করতাম। এভাবে খুব দ্রুতই তন্দ্রা আমাতে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। আর আমি তো আগেই তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলাম।
তন্দ্রা হৃদয় লেনা-দেনার খেলায় দ্রুত আরও গভীরে ডুবে গেল। তার পৃথিবী যে আমাকে ঘিরে তাও বলতে ভুল করলো না। দেখা করতে চাইলো আমার সাথে। আমি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। অতঃপর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হলাম। সেই শহরের আমিকে গোপন রেখে তন্দ্রাকে আমার জীবন সম্পর্কে যতটুকু বলা যায় ততটুকু বললাম। কিন্তু সবকিছু ঢেকে রেখে তন্দ্রা আমাতেই বিলিন হতে চাইলো। আমি হেরে গেলাম। অতীত ভুলে ভবিষ্যৎ স্বপ্ন দেখার প্রয়াস পেলাম।
পাঁচদিন পর আমাকে না জানিয়ে হঠাৎ করেই তন্দ্রা এসে হাজির হলো এ শহরে। আমাকে দেখে সে চমকে উঠলো। দায়সারাভাবে কিছুক্ষণ থেকে, এলোমেলো কিছু কথা বলে চলে গেল; তারপর যোগাযোগ বিছিন্ন করে দিল। আমি আমার স্বপ্নকে খুন করে খুনি হয়ে রইলাম।
বছরখানেক পরে দূরের এক পাহাড়ী গ্রামে তন্দ্রার সাথে আবারও দেখা। অফিসের কয়েকজন মিলে ওরা ঘুরতে গিয়েছিল। জীবনেও ভাবিনি তন্দ্রার সাথে আর দেখা হবে। সেরকম কিছু আমি কামনাও করিনি। বরং আর যেন তার সাথে দেখা না হয় সেই কামনাই ছিল।
মুখোমুখি দাড়াতে না চাইলেও নিজের অজান্তেই দাড়ালাম। তার এমন আচরনের কৈফিয়ত চাইলে, সে বললো- প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে চাইলে- যদি সময় থাকে ঐ শহরটায় একদিন এসো, যে শহরের নীল ফ্ল্যাটে আমি থাকি। সাথে সাথে দিন তারিখ ঠিক করে তাকে জানালাম।
গিয়েছিলাম ওখানে। তন্দ্রাও নেমে এসেছিল তার নীল ফ্ল্যাট থেকে পিচ ঢালা রাস্তায়। আমাকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিয়েছিল তার ফ্ল্যাট আর আমার সেই স্মৃতিময় পলেস্তার খসা মেসের ভাঙা জানালা। আমি বুঝেছিলাম, তার কাছে ব্যবধানটা কি।
চোখের জলে দৃষ্টি ঝাপসা হওয়ার আগেই তন্দ্রা চলে গেল তার নীল ফ্ল্যাটে। আর আমি ঝাপসা দৃষ্টি নিয়ে হাটা দিলাম ফুটপাত ধরে আমার সেই বাউণ্ডুলে রূপে, কষ্টের বোঝাটা আরও একটু ভারি করে- পথ ভ্রষ্ট হতে, আরও কষ্ট পেয়ে আরও নষ্ট হতে।


Post a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.