জাদুর পাখি
কবির কাঞ্চননতুন বাসায় ওঠার পর থেকে স্নেহার একদম ভালো লাগে না। সারাক্ষণ মনমরা হয়ে থাকে।
আর কথায় কথায় মাকে বলে,
- আম্মু, চল না, আমরা আগের বাসায় ফিরে যাই। এ বাসায় আমার ভালো লাগে না।
বিথি আক্তার চোখ কপালে তুলে বললেন,
- কেন মা, কী হয়েছে? এ বাসা তো আগের বাসার চেয়ে অনেক সুন্দর। দু'টো বেডরুমেই টয়লেট আছে , সুন্দর ড্রয়িং রুম, একপাশে আবার ডাইনিং স্পেস আছে। ঘরের সব টাইলস করা। তারচেয়ে খুশির কথা আমাদের বেডরুমের সাথেই নানন্দিক কারুকাজ করা বেলকনি আছে। মন খারাপ হলে সেখানে গিয়ে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারো।
- আমার শুধু শুধু আকাশ দেখতে ভালো লাগে না।
- শুধু আকাশ দেখতে তোমাকে কে বলেছে? আকাশের বুকে কতো পাখি ওড়ে। ওসব তোমার মন ভালো করে দেবে। তাছাড়া বেলকনিতে দাঁড়িয়ে সবুজ গাছের দিকে তাকিয়ে থেকো। দেখবে তোমার মনে এক ধরণের প্রশান্তি নেমে আসবে।
- তোমার কথা আমি মানলাম। কিন্তু আকাশে এতো পাখি। কেউ ভালোবেসে আমার কাছে আসে না কেন? আমার সাথে প্রাণ ভরে কথা বলে না কেন? আমি তো ওদের দেখে খুব মজা পাই। আমায় দেখে ওরা কী একটুও মজা পাই না, মা?
- অবশ্যই মজা পায়। তবে ওরা মানুষ দেখলে খুব ভয় পায়। মানুষরা ওদের নিয়ে মজা করে। খাঁচায় বন্দি করে রাখে।
- তাতে কী হয়! ওরা তো খাঁচাই থাকবে।
- না, মা ওরা খাঁচায় থাকতে চায় না। ওদের আসল ঠিকানা হলো খোলা আকাশ। আকাশে উড়ে উড়ে ওরা জীবনের জয়গান গায়। তারপর ক্লান্তদেহে ফিরে আসে আপন নীড়ে।
- আপন নীড়ে! ওদের কী আমাদের মতো এমন সুন্দর বাসা আছে?
- হ্যাঁ, আছে। তবে আমাদের মতো এমন না। নিজেদের মতো করে ওরা বনে-জঙ্গলে, ঝোপঝাড়ে, কিংবা কোন বাসাবাড়ির একপাশে বাসা বানায়। সারাদিন খাদ্য সংগ্রহের জন্য বেরিয়ে গেলেও দিনশেষে ঠিকই স্বজনের মায়ায় ফিরে আসে।
স্নেহা উৎফুল্ল হয়ে বলল,
- হ্যাঁ, মা তুমি একদম ঠিক বলেছো। আমাদের আগের বাসার ছাদে একবার আমি খড়কুটো দিয়ে বাননো একটি পাখির বাসা দেখেছিলাম। খুব ছোট। তবে বেশ মজবুত মনে হয়েছিল। আমি তা নিতেই আব্বু আমাকে বারণ করেছিলেন। তাই আর নিইনি। আচ্ছা মা, ওদের তো আমাদের মতো হাত নেই। তবে কেমন করে এতো সুন্দর মজবুত বাসা বানায়? আর কেমন করেইবা ইচ্ছে হলেই উড়তে পারে?
বিথি আক্তার হাসতে হাসতে বললেন,
- ওহ! এই কথা। শোন মামণি, পাখিদের হাত নেই। তবে আছে শক্ত চঞ্চু, সরু পা, প্রসারিত দুটি ডানা। ওদের বাড়তি আছে সমৃদ্ধ বায়ুথলি। ওদের দেহের হাড়গুলোও ফাঁপা। যে কারণে ওরা সহজেই উঠতে পারে। প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে ওরা বাসা তৈরি করে।
এতক্ষণ স্নেহা মুগ্ধ চোখে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। মা যেন তাদের ইস্কুলের বাংলা মেডামের মতো করে সবকিছু ভেঙে ভেঙে বুঝিয়ে দিচ্ছেন।
স্নেহাকে ভাবুক মনে তাকিয়ে থাকতে দেখে বিথি আক্তার আবার বললেন,
- আবার কী ভাবছো? আর কোনো প্রশ্ন?
- না, মা বাইরে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। আমি কী একটু বেলকনির দিকে যাব?
- হ্যাঁ, যাও। তবে সাবধান। বৃষ্টিতে ভিজো না। তাহলে অসুখ করবে।
- আচ্ছা।
স্নেহা ধীরগতিতে চুপিচুপি বেলকনির দিকে এগিয়ে আসে। হঠাৎ লক্ষ্য করে, বেলকনির এককোণে একটি মাঝারি সাইজের পাখি বৃষ্টিতে ভিজে জবুথবু হয়ে গেছে। বেলকনিতে রাখা বড়গাছটির টবের একপাশে কোনমতে নিজেকে লুকানোর চেষ্টা করছে। পাখিটিকে দেখে মনে হচ্ছে প্রচন্ড ঠান্ডায় গায়ে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এসেছে। নিরুপায় হয়ে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছে।
স্নেহা পা টিপেটিপে পাখিটির কাছাকাছি চলে আসে। তবু পাখিটি একটুও সরলো না। স্নেহা সাহস করে পাখিটিকে ধরে কোলের কাছে নিয়ে ভালোভাবে লক্ষ্য করে।
দেহ পুরোপুরি চকচকে গাঢ় কালো বর্ণের।
চোখের নিচে, মাথার পাশে ও পেছনে মাংসল উপাঙ্গ আছে। ডানায় সাদা পট্টি স্পষ্ট। চোখজোড়া কালচে বাদামি। ঠোট শক্ত ও হলুদ। ঠোঁটের আগা কমলা রঙের। পা ও পায়ের পাতা হলুদ। মাথার চারপাশের মাংসল উপাঙ্গের রং হালকা হলুদ।
পাখিটির দুরাবস্থা দেখে স্নেহার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। সে পাখিটির দিকে তাকিয়ে রইলো। হঠাৎ
পাখিটি ঘাঁড় উঁচিয়ে স্নেহার দিকে তাকিয়ে বলল,
- স্নে-হা, আমাকে একটু উষ্ণতা দাও। আমি সুস্থ হলে তোমার উপকার করব। তুমি আমার বন্ধু হবে?
পাখির কন্ঠে নাকা সুরে কথা শুনে স্নেহা বিস্মিত হয়। সে অপ্রস্তুত থেকে জবাব দিল,
- তুমি মানুষের মতো কথা বলতে পারো!
- হ্যাঁ, আমি কোন সাধারণ পাখি নই। জাদুর পাখি।
- জাদুর পাখি মানে?
- জাদুর পাখি বোঝো না? আমি চাইলে তোমার যেকোন ইচ্ছে পূরণ করে দিতে পারি।
- তাহলে আমার কাছে সাহায্য চাইছো কেন? জাদুর কেরামতি দিয়ে তো তোমার ভেজা শরীরকেও শুকিয়ে নিতে পারো।
- না, আমরা সবার জন্য জাদুর কেরামতি দেখাতে পারলেও নিজের জন্য তা পারি না। এতে হিতে বিপরীত হয়।
- ওহ্! আচ্ছা। আর কথা বাড়িও না। আগে তোমার সুস্থতা প্রয়োজন।
এই কথা বলে স্নেহা পাখিটি নিয়ে এক দৌড়ে রান্নাঘরের দিকে চলে আসে। মাকে রান্না করতে দেখে ব্যস্ত গলায় বলল,
- মা, আমাকে একটু জায়গা দাও। আমি চুলার কাছে যাব।
- চুলার কাছে কেন?
স্নেহার হাতে ভেজাপাখিটি দেখে মা বললেন,
- কিরে ময়না পাখিটি কোথায় পেলি?
স্নেহা মনে মনে বলল,
- ময়না পাখি! তাহলে তো ওরা কথা বলতেই পারে। ভালোই হলো। ওর সাথে বন্ধুত্ব করব।
-কিরে কোন কথা বলছিস না যে?
স্নেহা আমতাআমতা করে বলল,
- না মানে, ইয়ে আমাদের বেলকনিতে বড় গাছটার টবের পাশে পেয়েছি। বৃষ্টিতে খুব ভিজে গেছে। দেখো মা এখনও কীভাবে কাঁপছে। মনে হয় গায়ে জ্বর এসে গেছে।
বিথি আক্তার মেয়ের হাত থেকে পাখিটি নিয়ে চুলা থেকে একটু নিরাপদ দূরত্বে ধরলেন। তাপ পেয়ে পাখিটি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
কিছুক্ষণ পর পাখিটি ডানা ঝাপটিয়ে গায়ের পানি ঝরালো। বিথি আক্তার শাড়ির আঁচল দিয়ে ভালোভাবে পাখিটির গায়ের অবশিষ্ট পানিও শুকিয়ে নিলেন। এরপর স্নেহার হাতে দিয়ে বললেন,
- ওকে নিয়ে বেলকনির দিকে যাও। বৃষ্টি থেমে গেলে
ওকে ছেড়ে দেবে।
- হ্যাঁ, মা।
এই বলে স্নেহা পাখিটি নিয়ে বেলকনির দিকে চলে আসে।
বেলকনির এককোণে বসে পাখিটির সাথে গল্প শুরু করে স্নেহা। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে দু'জনের মধুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
ময়না পাখিটি বলল,
- স্নেহা, আমার মিষ্টি বন্ধু। আজকের জন্য আমাকে বিদায় দাও। কাল আবার দেখা হবে। এখন বল, তুমি কী খেতে চাও?
- আমার কিছু লাগবে না। তুমি একটু বস্। আমি যাব আর আসব। তোমার জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসছি।
ময়নাপাখি আবার বলে ওঠলো,
- না, স্নেহা তোমাকে আর কষ্ট করতে হবে না। তুমি আগে বল এখন কী খাবে?
স্নেহা একটু ভেবে বলল,
- কমলা খাব।
এবার ময়না পাখি বলল,
- তোমার চোখ বন্ধ কর।
স্নেহা চোখ বন্ধ করলে পাখিটি বিড়বিড় করে বলল,
"ক-ম-লা।ক-ম-লা।"
অমনি স্নেহার সামনে দু'টো কমলা এসে গেলো।
এবার পাখিটি তাকে চোখ মেলতে বলল। স্নেহা চোখ মেলে দেখে তার সামনে দু'টো পাকা কমলা পড়ে আছে। সে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। মনে মনে ভাবতে লাগলো- এটা কী করে সম্ভব! তাহলে কী সত্যি ময়নাপাখিটি জাদুর পাখি!
পাখিটি স্নেহার হাতে কমলা দু'টো তুলে দিয়ে বলল,
- ক-ম-লা। ক-ম-লা।
স্নেহা কমলা দু'টো হাতে নিতেই পাখিটি ডানা ঝাপটিয়ে উড়তে শুরু করলো। পিছন থেকে স্নেহা জোর গলায় বলল,
- বন্ধু, কাল আবার এসো।
জাদুর পাখিটি সম্মতির ভঙ্গিতে ঘাঁড় নাড়তে নাড়তে শূন্যে হারিয়ে গেল।


Post a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.