আগন্তুক,,
মোঃ তোফায়েল হোসেন,,
বিয়ের পর জাহিদ আর রিনার বিবাহিত জীবন অনেকটা শেষ বর্ষার মত বেশ ভালোই কাটছিল। এই মেঘ, এই পশলা বৃষ্টি আবার পরক্ষণেই রোদ্দুর।
কিন্তু কিছুদিন পর হঠাৎ করেই রিনার প্রতি জাহিদের কেমন যেন গা ছাড়া ভাব হতে লাগল। ভালবাসা আছে- তবে আগের মতো আবেগ নেই। জাহিদ অফিস থেকে আগে ঘন্টায় ঘন্টায় ফোন করতো কিন্তু এখন কোনোদিন একটা আবার কোনোদিন একবারও নয়। সারাক্ষণ কী রকম একটা চাপা টেনশনে যেন তার মাঝে বিরাজ করে। অল্পতেই রেগে যায়। জাহিদের এই cwieZ©b রিনাকে ভাবনায় ফেলে দেয়।
তারপর ভাবনাটা হঠাৎ আতঙ্কে রূপ নেয়। সে ভাবে- তবে কি জাহিদ সব জেনে গেছে? আসলে হয়েছিলও তাই।
সেই বিকেলেই অফিস শেষে অচেনা আগন্তুক শেষবারের জন্য এসেছিল জাহিদের কাছে- রিনার নষ্ট জীবনের বেশ কিছু প্রমাণসহ। অদ্ভুত মানুষটা জাহিদকে অনেকটা সম্মোহিত করে পরবর্তী করনীয় সম্পর্কে কিছু একটা আবাস দিয়ে হারিয়ে গিয়েছিল জনারণ্যে।
একরোখা জাহিদ তার বিশ্বাসকে ঠকানো হয়েছে ভেবে বিচলতি হল। আগন্তুকের পরামর্শটাই সর্বোত্তম ভেবে সিদ্ধান্ত নিল- প্রতিশোধ নেবে সে। ফোন দিল রিনাকে- আমি সন্ধ্যার পরপরই আসছি; রেডি থাক, তোমাকে নিয়ে অপরূপ একটা জায়গায় যাব আজ। পূর্ণিমার জ্যোৎস্না দেখব দু’জনে wbR©‡b। কথাগুলো শুনে রিনা মুচকি হেসেছিল একটু।
ব্যস্ত শহরের ব্যস্ততার মাঝে সন্ধ্যার আঁধারে নিজের গাড়িতে করে জাহিদ রিনাকে নিয়ে চললো দক্ষিণে। শহর ছাড়িয়ে পাহাড়ি একটা রাস্তা ধরে চার মাইলের মতো এগিয়ে গিয়ে বামে মোড় নিয়ে আরও মাইল খানেক যাওয়ার পর একটা টিলার পাদদেশে গাড়ি থামাল জাহিদ।
চলতি পথেই জাহিদ রিনাকে জানিয়েছিল এই টিলাটা সম্পর্কে। টিলাটার চূড়ায় একটা মাজার আছে। প্রতি সন্ধ্যায় কেউ বা কারা একটা বিশাল প্রদীপ জ্বালিয়ে যায়। ভোর হওয়ার সাথে সাথে আবার সেটা নিভিয়ে দিতেও ভুল করেনা। জাহিদ আরও জানায় বেশ আগে একবার সে তার কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে এখানে এসেছিল এবং চূড়ায় বসে রাতের অপরূপ দৃশ্য দেখেছিল মন ভরে। আজ সে রিনাকেও দেখাতে চায় প্রকৃতির এই সৌন্দয্য। রিনা কোন দ্বিমত না করে জাহিদের প্রতি তার অঢেল বিশ্বাস আর ভালোবাসা বুঝিয়ে দিল। তবে জাহিদ না দেখলেও পূব আকাশে জ্বল জ্বল করা পূর্ণ চাঁদ কিন্তু ঠিকই দেখেছিল- রিনার ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি!
সেই আগন্তুকের কথা মতো জাহিদ পরিকল্পনা করেছিল- রিনাকে চূড়া থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবে চারশত ফুট নিচের পাথরের মেঝেতে। তারপর নিজস্ব একটা সিদ্ধান্তও ছিল তার- রিনার সাথে সেও যাত্রা করবে মৃত্যুর পথে। সব হিসাব-নিকাশের সমাপ্তি হবে আজ। কিন্তু যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে সে পৌঁছল তখনই ভুলটা ধরা দিল তার কাছে। এমন একটা বাস্তব সত্য অনুভব করলো যার প্রতিক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই নিজেকে আবিষ্কার করলো পাখির মতো শূণ্যে ভাসমান অবস্থায়! কে তাকে ধাক্কা দিয়েছিলো সে স্পষ্ট জানে! অদ্ভুত সমীকরণ বুঝে আসার আগেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে বাধ্য হয় জাহিদ। পরদিন তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পত্রিকায় প্রকাশিত হয় আর একটা আত্মহত্যার খবর।
মাসখানেক পর রিনা এ শহর ত্যাগ করেছিল। তার দু’দিন পর প্রায় পাঁচশত মাইল দূরে এক শঙ্খচিল আকাশে ওড়ে ওড়ে দেখেছিল মরু হাইওয়ের পাশে এক শিরিশের ছায়ায় রিনার কোলে মাথা রেখে ঘুমের ভান করছে সেই অচেনা আগন্তুক। আর রিনার ঠোঁট ক্ষণকাল পরপর ছুঁয়ে দিচ্ছে আগন্তুকের ললাট।


Post a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.