chader burer bare-sesutosh story-bengali


চাঁদের বুড়ির বাড়ি,,

মুহসীন মোসাদ্দেক,,








ছোট্ট রিদা। তুলতুলে ফুরফুরে একটা মেয়ে। বয়স পাঁচ বছর। এরই মধ্যে সে অনেক পটু পটু কথা বলে। বাবাকে সে প্রশ্ন করে, ‘আচ্ছা বাবা, গাড়ি চড়ে চাঁদের বাড়ি যাওয়া যায় না?’
বাবা রিদার তুলতুলে গাল টিপে দিয়ে বলে, ‘না মামণি, যায় না!’
‘কেন যায় না!’
‘যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই যে, তাই।’
রিদা বিরক্তি নিয়ে বলে, ‘কেন কোনো রাস্তা নেই! কেউ কেন একটা বানিয়ে ফেলে না!’
বাবা হাসে, ‘রাস্তা বানানো হলে কী করতে তুমি?’
‘গাড়ি চড়ে চাঁদের বাড়ি চলে যেতাম! আমার গাড়িটাতে চড়ে।’ রিদার চটপটে উত্তর।
বাবা আবার হাসে। বাবা রিদাকে একটা গাড়ি কিনে দিয়েছে, খেলনা গাড়ি। রিদা সে গাড়ি চড়ে এ ঘর ও ঘর ছুটে বেড়ায়।
রিদা বায়না ধরে, ‘বাবা, তুমিই একটা রাস্তা বানিয়ে ফেলো না!’
রিদাকে কাছে টেনে নিয়ে বাবা বলে, ‘আমাদের আশেপাশের রাস্তার মতো রাস্তা বানিয়ে তো চাঁদে যাওয়া যাবে না! চাঁদ তো ওই দূরে শূন্যে থাকে! রাস্তা বানিয়ে গাড়ি চড়ে কি যাওয়া যাবে, বলো?’
রিদা মুখ গোমরা করে ফেলে। বাবা রিদার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, ‘তবে, রকেটে চড়ে চাঁদের বাড়ি যাওয়া যায়।’
‘হুররে!’ রিদা উচ্ছ্বসিত হয়ে লাফিয়ে ওঠে, ‘তাহলে বাবা, তুমি একটা রকেট কিনে ফেলো!’
বাবা রিদাকে হতাশ করে না, ‘ঠিক আছে মামণি, টাকা জমিয়ে একটা রকেট কিনে ফেলবো তোমার জন্য!’
‘আমিও তাহলে টাকা জমাবো। বাবা, তুমি প্রতিদিন আমাকে দুই টাকা করে দিবে, আমি জমিয়ে রাখবো।’
বাবা হাসে। রিদার তুলতুলে গাল টিপে দিয়ে বলে, ‘ঠিক আছে, দিবো।’
রিদা চোখ নাচিয়ে মিটিমিটি হাসে, অনেক সাধনার মাধ্যমে কিছু প্রাপ্তির মতো হাসি। রিদা অবশ্য জানে না একটা রকেটের দাম কত! যদি জানতো তবে নিশ্চয় বাবার কাছে মাত্র দুই টাকা চাইত না!
বাবা বলে, ‘আচ্ছা মামণি, চাঁদের বাড়ি গিয়ে তুমি কী করবে?’
‘ওখানে চাঁদের বুড়ির বাড়ি আছে না! আমি সেখানে যাবো। চাঁদের বুড়ির সাথে দেখা করবো, ভাব করবো। চাঁদের বুড়ি অনেক মজার মজার গল্প জানে। তার পাশে বসে গল্প শুনবো।’ রিদা এমন আবেশী আমেজে বললো যেন তার চোখের সামনে চাঁদের বুড়ি আর তার বাড়ি ভেসে আছে!
বাবা অবাক হলো। ভাবছিল মেয়ের মাথায় চাঁদের বুড়ির বাড়ি যাওয়ার বিষয়টা এসেছে কীভাবে? বাবা ব্যাপারটা ধরতে পেরেছে। নিশ্চয় দাদা-দাদি-নানা-নানি অথবা মামা-খালা-চাচা-ফুফুদের কাছ থেকে চাঁদের বুড়ির গল্প শুনতে শুনতে তার মাথায় বিষয়টা এসেছে!
বাবার সাথে রিদা সত্যি সত্যি টাকা জমানো শুরু করে। একটা মাটির ব্যাংক কিনে দিয়েছে বাবা। রিদা প্রতিদিন সকালে বাবার কাছ থেকে দুই টাকা করে নেয় আর তা ব্যাংকে জমিয়ে রাখে!

রিদার ঘরের জানালা দিয়ে আকাশ দেখা যায়। সে আকাশে চাঁদও দেখা যায়। রিদা জানালার পাশে বসে চাঁদ দেখে। প্রতিদিন যে চাঁদের আকৃতি পরিবর্তন হয় এবং হঠাৎ হঠাৎ চাঁদটা হারিয়ে যায়, তারপর আবার আসে এবং ছোট থেকে বড় হতে হতে গোল হয়ে যায়—এসব রিদা বুঝে ফেলেছে। যখন জোছনা হয়, চাঁদটা যখন একদম গোল থাকে তখন রিদার কাছে সবচেয়ে ভালো লাগে। এসময় রিদার মনে হতে থাকে চাঁদে সে চাঁদের বুড়ির বাড়ি এবং বুড়িকে দেখতে পায়! চাঁদের বুড়ির বাড়ি এবং বুড়িকে দেখার জন্য রিদা জানালায় বসে চাঁদের অপেক্ষায় থাকে!
চাঁদের পরিবর্তন লক্ষ্য করার পর রিদার কপালে একটা চিন্তার ভাঁজ পড়ে, বাবার কাছে ছুটে গিয়ে বলে, ‘বাবা, বাবা, মাঝে মাঝে যে চাঁদটাকে দেখা যায় না এবং যখন অনেক ছোট আর চিকন দেখায় তখন চাঁদের বুড়ির বাড়ির কী হয়! চাঁদের বুড়ি কোথায় থাকে!’
বাবা হেসে ফেললেও রিদাকে বুঝিয়ে বলে, ‘চাঁদের বুড়ির বাড়ি বা চাঁদ কোথাও যায় না, ওখানেই থাকে। চাঁদে যখন ইলেকট্রিসিটি থাকে না তখন আলোও থাকে না, তাই এমন হয়। চাঁদে ইলেকট্রিসিটি অর্থাৎ আলো আসে সূর্য থেকে। আর চাঁদটা এক জায়গায় থাকে না, পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে থাকে, ঘুরতে ঘুরতে সূর্য থেকে যখন অনেক দূরে সরে যায় তখন সূর্যের আলো চাঁদে পৌঁছাতে পারে না বলে সেখানে আলো থাকে না। এ কারণে আমরা দেখতে পাই না বা ছোট দেখি। বুঝলে?’
রিদার চিন্তা দূর হয়।
জানালায় বসে পূর্ণ বা প্রায় পূর্ণ কিংবা অর্ধপূর্ণ চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকলে সত্যি সত্যি রিদার চোখের সামনে চাঁদের বুড়ি আর তার বাড়ি ভেসে ওঠে!
একদিন রিদা একটা ছবি এঁকে ফেলে! চাঁদের বুড়ি ও তার বাড়ির ছবি! সবাই অবাক হয়ে দেখে! একদম জীবন্ত মনে হয় ছবিটাকে!
ছবিটা এতটাই জীবন্ত যে, রিদার চোখের সামনে চাঁদের বুড়ি নড়েচড়ে বসে! আর এই সুযোগে রিদা চাঁদের বুড়ির সাথে গল্প শুরু করে! যখনই সে ছবিটা সামনে মেলে ধরে তখনই সে চাঁদের বুড়ির সাথে গল্প শুরু করে! আবার যখনই তার গল্প করতে ইচ্ছে করে তখনই সে ছবিটা মেলে ধরে! তারপর কত যে গল্প করে!
রিদাকে এখন আর আকাশে চাঁদ উঠার অপেক্ষা করা লাগে না, ছবিটা সামনে মেলে ধরলেই হয়! চাঁদের বুড়ি তার বাড়ি থেকে বের হয়ে আসে রিদার গল্প শুনতে! যদিও রিদার ইচ্ছে ছিল চাঁদের বুড়ির কাছে গল্প শোনার, কিন্তু তার পরিবর্তে রিদাই এখন চাঁদের বুড়িকে গল্প শোনায়! রিদা সারাদিন যা যা করে তার সব চাঁদের বুড়িকে গল্প করে শোনায়।
চাঁদের বুড়ির বাড়ি যাওয়ার জন্য রিদার এখন আর রাস্তা লাগবে না, গাড়ি লাগবে না, রকেটও না! এই ছবিটাই তার সব!

0/Post a Comment/Comments

Please do not enter any spam link in the comment box.

Stay connected

FACEBOOK- Fans Like
TWITTER- Followers Follow
YOUTUBE- Subscribers Subscribe

Subscribe us

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner