মা আমার রাজরাণী
জহির টিয়া
ঠিক সন্ধ্যার আগখানে, হাতে একশ টাকার একটা নোট গুঁজে দিয়ে মা বললেন- কাফি , যা তো বাপ-ধন। একটু দোকান হতে ঘুরে আয় তো বাপ ।
টাকাটা হাতে নিয়ে সাতপাঁচ কিছু না ভেবেই হাঁটতে শুরু করলাম। আবার, মা পেছন হতে সর্তক করে দিয়ে বললেন- দেখেশুনে যাস। টাকাটা হারিয়ে দিস না বাজান। যা যা লাগবে তা তা লেখা আছে টাকার ভেতরের কাগজে । তাড়াতাড়ি আসিস কিন্তু সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে।
মায়ের বলা কথাগুলো শুধুমাত্র কর্ণপাত করলাম। কোনো জবাব দিলাম না । আমার একটু স্মরণশক্তি কম। বিশেষ করে বাজার করতে দিলে, কোন জিনিস কী পরিমাণ নিতে হবে ঠিকঠাক মনে থাকে না। তাই মা কোনো কিছু কিনতে পাঠালে কাগজে টুকে দেন। মা খুব বেশি পড়াশোনা করতে পারেন নি। শুনেছি, ক্লাশ ফোরে পড়ার সময় মা'র বিয়ে হয়েছিল । আগের যুগে নাকি মেয়েদের খুব অল্প বয়সেই বিয়ে দিতো। সেই হিসেবের বাইরে মাও ছিলেন না । মাঝেমধ্যে মা বলেন- ছাত্রী হিসেবে খুব খারাপ ছিলাম না রে বাজান । ক্লাশে আমার সামনে এক-দুই জন থাকত। ইচ্ছে ছিল খুব ভালোভাবে পড়াশোনা করে চাকরি করার কিন্তু তা হয়ে উঠেনি। অভাবের সংসারে তোর নানাজান বিয়ে দিয়ে দেন।
অক্ষরজ্ঞানহীন আমার বাবা । যিনি জমিতে লাঙল চালানো, ফসল ফলানোর কলাকৌশল ছাড়া আর কিছুই জানেন না। বাবা একজন সফল কৃষকও বটে। গেরস্থালীতেই বাবার বেশ মনোযোগ। বাইরের পৃথিবীটা তাঁর কাছে তুচ্ছ। তবু বাবাকে নিয়েও আমার অনেক অহংকার। তিনি আমাকে প্রতিনিয়ত স্বপ্ন দেখান, ঠিক মানুষের মতো মানুষ হওয়ার। প্রায় বুকের কাছে টেনে বাবা বলেন - ব্যাটা, আমি তো মূর্খ-টুর্খ মানুষ। লেখাপড়া করতে পারিনি। তাতেও আমার কোনো দুঃখ নেই। তোরা দুই ভাই লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হ। লেখাপড়া করলে সারাজীবন বর সেজে ঘুরতে পারবি। আর লেখাপড়া না করলে জীবনে একদিনই বর সাজতে পারবি। আমার মতো রোদে পুড়ে, বিষ্টিতে ভিজে সারাজীবন কাটাতে হবে । তোর মায়ের স্বপ্নটাকে পুরণ করিস বাপজান । পাগলীর স্বপ্নটাকে তো আমিই মাটি চাপা দিয়েছি।
বাবার মহামূল্যবান কথাগুলো কানে ঝনঝন করে বাজে। ভাবি, বাবা পড়াশোনা করলে অনেক বড় কিছু হতে পারতেন। যেটা সম্ভব হয়নি অভাব নামক এক যন্ত্রণার গ্যাঁড়াকলে পড়ে ।
বাবা, মাকে খুবই ভালবাসেন। তাই মাঝেমধ্যে এটা-ওটা বলে ডাকেন। মাও তাঁর ব্যতিক্রম নন। সেটা তাঁদের দেখেই বোঝা যায়।
মাকে নিয়েও আমার খুব গর্ব হয়। এতো অল্প বয়সে এসেও কেমন করে সংসারটাকে গুছিয়ে নিয়েছেন। অভাবের সংসারটাকে স্বচ্ছলতার এক শক্ত ভিতে দাঁড় করিয়েছেন। শ্বশুর-শ্বাশড়ির সেবারও একটু ঘাটতি রাখেন না। আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে আর ছোট ভাইটা দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। এখন পর্যন্ত মা, সংসারটাকে সামলে আমরা দুই ভাইকে নিয়মিত পড়ান। কোনো প্রাইভেট মাস্টারের প্রয়োজন হয়নি। সকাল-সন্ধ্যায় পড়িয়ে দেন। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি, ধর্মীয় শিক্ষা দেন মা।
লেফটরাইটের মতো করে দৌঁড়িয়ে দোকানে গেলাম। যা যা কাগজে লেখা ছিল পড়ে পড়ে সেগুলো নিয়ে আবার বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। কিন্তু দোকানে ছিল বেশ ভিড়। তাই একটু দেরি হয়ে গেল। রাতের অন্ধকার জেঁকে বসেছে চারিদিকে। ঝিঁঝিঁপোকারাও মনের সুখে গান ধরেছে। একটা, দুইটা করে জোনাকিরাও বেরিয়ে পড়েছে। তারার মতো মিটমিটে আলো ছড়াচ্ছে। বাড়ি হতে দোকানের দূরত্ব আধা কিলোমিটারেরও কম হবে । এর মাঝে রাস্তার দু'ধারেই বিভিন্ন রকম গাছপালায় ঠাসা । মাঝামাঝিতে একটা বাঁশের ঝোঁপও আছে । চল্লিশ-পঞ্চাশেক বাঁশগাছ হবে তাতে । বেশ লম্বা ও মোটাতাজা বাঁশগুলো। বিভিন্ন পাখিদের আবাসস্থল এটা। ওদের কিচিরমিচির ডাকে মুখরিত থাকে সকাল-সন্ধ্যায় এলাকাটা । মাঝেমাঝে মনে হয়, পাখিরা ঝগড়াঝাঁটি শুরু করেছে। কিন্তু তা নয়। সারাদিনের ক্লান্তিটাকে আনন্দের মাধ্যমে উপভোগ করছে সন্তানদের নিয়ে। যেটা আমার বাবা-মাও করে থাকেন।
যাক সে কথা। আমি কোনদিকে না তাকিয়ে রাস্তা বরাবর চলে আসছি। বাঁশঝাড়ের কাছাকাছি আসতেই, দুইটা বাঁশ আমার পথ আগলে শুয়ে পড়ল। প্রথমে থতমত খেয়ে কিছুটা ভয় পেয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। পরক্ষণেই ভেতরে সাহস সঞ্চয় করলাম। আবার বাঁশ দুইটা দাঁড়িয়ে, ধপাস দিয়ে পড়ে গেল। যেন কালবৈশাখীর ঝড় বইছে। থরথরে কাঁপছে বাঁশ দুটি। আর বাঁশের কঞ্চিগুলো ঝাঁটার মতো ঝাড়ু দিচ্ছে। মনে মনে ভাবলাম, ভূতটুতই হতে পারে। যদিও ভূতটুতে বিশ্বাসী নই আমি। মা বলেছেন - আসলে ভূতটুত বলে কিছুই নাই। এগুলো শয়তানের কাজ। আমাকে ভয় দেখানোর জন্য এমন করছে সেটা বুঝতে পারি । আর তখনই মায়ের কথাগুলো স্মরণ করার চেষ্টা করলাম। আউজুবিল্লাহি , বিসমিল্লাহ্ পড়ে বুকে ফুঁ দিতেই বাঁশ দুইটাই আস্তে আস্তে কাঁপাকাঁপি বন্ধ করে দিল । তারপর কালেমা, আয়াতুল কুরসি পাঠ করতে লাগলাম। আর বাঁশ দুইটা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। আমি টর্নেডো গতিতে দৌঁড়িয়ে বাড়ি চলে এলাম। আমার হাঁসফাঁস দেখে মা বললেন- কি হয়েছে রে বাজান ? এমন হাঁপাচ্ছিস ক্যান ?
তারপর মাকে সবকথা খুলে বললাম। মা বুকে টেনে মুচকি হেসে দোয়া করে দিলেন। আর বললেন- ভয় করিস না বাজান। আল্লার ওপর ভরসা রেখে, আল্লার কালাম অন্তর থাকলে কোনো বিপদ-ই স্পর্শ করতে পারবে না।
বলেই মা রান্না ঘরে চলে গেলেন। আমি মুখহাত ধুয়ে পড়তে বসলাম ছোট ভাই সাফিকে নিয়ে। রান্না শেষে মাও এসে যোগ দিলেন। মা, আমাদের বেশ কিছুক্ষণ পড়িয়ে খাবার বেড়ে দিলেন। খাওয়ার পর, দুই ভাই মায়ের দুপাশে শুয়ে বললাম- মা আজকে সুন্দর গল্পটল্প বলেন । সন্ধ্যার ব্যাপারটা এখনো নাড়া দিচ্ছে বুকের মধ্যখানে। মা আমার চুলে বিলি কাটতে কাটতে বললেন- ও সব বাদ দে বাজান। শোন, একটা গল্প বলি। সাফি লাফিয়ে ওঠে বলল- মা, আজ রাজা-রাণীর গল্প বলেন। সাফির সাথে আমিও তাল মেলালাম। রাজা-রাণীর গল্প শোনার জন্য। মা বলতে শুরু করলেন -
এক ছিল অলস রাজা। সে সারাক্ষণ ঘুম নিয়ে ব্যস্ত থাকত। রাষ্ট্রীয় কাজে গিয়েও ঘুমের ঘোর কাটত না। কোনো সভা-সমাবেশে গেলেও মঞ্চে বসে বাঘের মতো হা করে 'হাই' তুলত । এতে প্রজারা ভীষণ বিরক্তিবোধ করত। কিন্তু মুখ খুলে কিছু বলতে পারত ভয়ে। কারণ, রাজা ছিল হিংস্র বাঘের মত। তবে রাজাকে ভালো না বাসলেও রাণীকে ঠিকই ভালোবাসত প্রজারা। রাজা অলস হলেও রাজরাণী ছিল প্রখর বুদ্ধিমতী ও গুণবতী। রাজরাণীর জন্যেই রাজা রাজ্যটাকে ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারত।
- ঠিক তোমার মতো। তাই না মা ? মায়ের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে, প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল মায়ের কাছে সাফি । আমিও সাফির কথায় মত দিয়ে বললাম,
- মা, ঠিকই বলেছে তো সাফি । তুমি তো ওই রাজরাণীর চেয়ে একটুও কম না। তুমি আমাদের রাজ্যের রাজরাণী, মা।
- আমি কি আর রাজরাণী রে বাজান । মায়ের সহজ-সরল স্বীকারোক্তি।
- না, মা । সত্যিই, তুমিই তো আমাদের রাজরাণী। বাবার সংসার নামক রাজ্যটাকে তুমিই তো প্রাণ দিয়েছ।
যখন কথাগুলো বলছি, তখন লক্ষ্য করি মায়ের গাল বেয়ে চোখের জল চুঁইছে। আমি গালের জলগুলো মুছে দিয়ে কপাল গালে কয়েকটা চুমু দিলাম। আমার দেখাদেখি সাফিও মাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে লাগল। মা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। হাউমাউ করে আমাদের জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে খেতে কাঁদতে লাগলেন। আমরাও মায়ের গলা জড়িয়ে কাঁদতে লাগলাম। এই কান্না যে সুখের কান্না, ভালবাসার কান্না।


Post a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.