শ্রাবণের বৃষ্টি
সুমন আহমেদ
ঘুম ভাঙতেই দেয়াল ঘড়িটার দিকে লক্ষ করে দেখি সকাল নয়টা ১৫মিনিট। নিত্যদিনের তুলনায় আজকের ঘুমটা একটু বেশিই হয়ে গেল। রাস্তায় অনেক যানজট- দশটার মধ্যে যেভাবেই হোক অফিসে পৌছাতে হবে; তাই নাস্তা করার সময়টুকুও পেলাম না। ঘর থেকে বের হয়ে দেখি চারিদিক অন্ধকার; মনে হয় এক্ষুণিই বৃষ্টি নামবে। মুহুর্তেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। শ্রাবণের
বৃষ্টি কিছুতেই থামার উপায় নেই, পড়ছে তো পড়ছেই...। অফিসে আর যাওয়া হলো না; কাকভেজা হয়ে বাসায় ফিরে এলাম। ভেজা কাপড় পাল্টিয়ে- এক মগ কফি হাতে ব্যালকনিতে
দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখছিলাম শ্রাবণের বৃষ্টি আর সেইসাথে হারিয়ে গিয়েছিলাম ফেলা আসা দুইবছর আগের এমনই এক শ্রাবণের দিনে। কলেজ লাইফ শেষ করে যখন ভার্সিটিতে বর্তি হই, তখন থেকেই নীলিমার সাথে প্রথম পরিচয়; তারপর বন্ধুত্ব। বন্ধুত্ব থেকে ভালোলাগা, ভালো লাগা থেকে ভালোবাসা, ভালোবাসা থেকে একসময় দু'জন সারাজীবন একসঙ্গে থাকার
সিদ্ধান্ত নিলাম। অবশেষে পারিবারিক ভাবে আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে চার হাত এক করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলাম। বিয়ের ঠিক ছয়মাস পর হঠাৎ একদিন অফিস থেকে বাসায় ফেরার
পর নীলিমার মুখে শুনতে পেলাম আমি নাকি বাবা হতে চলেছি। মুহুর্তেই যেন পৃথিবীর সমস্ত সুখ এসে পায়ের কাছে গড়াগড়ি খাচ্ছে। কী করবো, কোথায় যাবো কিছুই ভেবে পাচ্ছি
না। বাবা হওয়ার আনন্দ যে কতটুকু তা বলে বোঝানো যাবে না।
সেদিন পুরো মহল্লায় মিষ্টি বিতরণ করেছিলাম। তারপর একের পর এক দিন চলে যাচ্ছে আর নীলিমার গর্ভে আমার অনাগত সন্তান বড় হচ্ছে। দশমাস পূর্ণ হওয়ার পর হঠাৎ একদিন নীলিমার প্রসব ব্যাথা উঠে; সাথে-সাথে হসপিটালে নিয়ে
গেলাম। ঘন্টা খানিক পর ডাক্তার এসে বললেন- আপনার কন্যা সন্তান হয়েছে; আর...।
আর কি ডাক্তার সাহেব? আমার
নীলিমা কেমন আছে?
স্যারি আপনার স্ত্রীকে বাঁচাতে পারলাম না।
মুহুর্তেই বিশাল আকাশটা ভেঙে পড়ল মাথায়। ডাক্তারের শার্টের কলারে ধরে... ডাক্তার সাহেব আপনি মিথ্যে বলছেন। আমার নীলিমা কখনোই আমাকে ছেড়ে যেতে পারে না। এক দৌঁড়ে অপারেশন কেবিনে গিয়ে দেখি সাদা কাপড় অঙ্গে
জড়িয়ে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছে আমার নীলিমা। নীলিমা অ-
নীলিমা, এমনতো কথা ছিলো না পৃথিবী নামের মায়াজালের এই সংসারে আমি থাকবো তুমি থাকবে না? বলেছিলে একসাথে হাসবো, কাঁদবো; একসাথে বাঁচব। আর কোনোদিন যদি এই মায়ার পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয় তাহলে একসাথেই
যাবো। তবে কেন কঠিন প্রতিশ্রুতি দিয়ে আজ তুমিও কথা রাখোনি? সেদিন আমার কান্নার ধ্বনিতে ভেঙে পড়ছিল পুরো হসপিটাল। পৃথিবীর নির্মম বাস্তবতা মেনে নিয়ে নীলিমার শেষ
স্মৃতি আমার একমাত্র মেয়ে লীলাবতীকে বুকে আগলে ধরে বেঁচে থাকার কঠিন এক জীবন যুদ্ধে নিজেকে সমর্পণ করলাম। লীলাবতীর বয়স যখন ছয় বছর। হঠাৎ একদিন গ্রামের বাড়ি থেকে মা ফোন দিয়ে বললেন- বাবারে কতোদিন হয়ে গেল তোর মুখখানা দেখি না। সেই যে কবে একবার বউমা মারা যাওয়ার আগে এসেছিলি, আরতো এলি না। আমার দাদুভাই লীলাবতী কেমন আছে? ওকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে; অফিস
থেকে কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে তোর এই বুড়ো মা-কে দেখে যা বাবা। এখন বর্ষাকাল চারিদিক শুধু পানি আর পানি...এবছর আমাদের বিলে অসংখ্য শাপলা শালুকের মিছিল- দেখতে প্রকৃতির পরিবেশ অসম্ভব ভালো লাগে; লীলাবতীকে
নিয়ে নৌকায় চড়ে ঘুরতেও পারবি।
ঠিক আছে মা সময় করে আসবো।
কিছুদিন পর আমি আর আমার একমাত্র মেয়ে
লীলাবতীকে নিয়ে ঢাকা কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে রওনা দিলাম গ্রামার বাড়ি ব্রাক্ষণবাড়িয়া, নবীনগরের উদ্দেশ্যে। অনেক দিন পর ট্রেন জার্নি ভালোই লেগেছিল। ভৈরব স্টেশনে নেমে পড়লাম। ভৈরব থেকে নবীনগরের নৌকায় উঠলাম। কিছুক্ষণ পর নৌকা ছেড়ে দিল; কিছুটা পথ যাবার পর- সম্ভবত আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার; মূহুর্তেই নীলাকাশ ঢেকে গেল- যেন কালবৈশাখীর কালো আঁধারে। নৌকায় তুলনামূলক যাত্রী অনেক বেশি ছিল। একের পর এক ঢেউ আসছে আর সকল যাত্রী মৃত্যুর ভয়ে চিৎকার শুরু করলো। আমার ছয় বছরের অবুঝ লীলাবতী আমার বুকে জড়িয়ে চুপটি করে বসে আছে। আমিও অনেক শক্ত করে লীলাবতীকে বুকে জড়িয়ে রেখেছিলাম। হঠাৎ এক ঢেউ এসে যাত্রী সহ নৌকা ডুবিয়ে দিল নদীর মাঝখানে। সেদিন নিজ চোখে দেখেছিলাম বেঁচে থাকার জীবনযুদ্ধ। দেখেছিলাম আমার নিষ্পাপ লীলাবতীর চোখে
বেঁচে থাকার এক পৃথিবী আহাজারি। ঢেউয়ের স্রোতে একসময় লীলাবতীর হাতটা আমার হাত থেকে ছুটে গেল। ঢেউয়ের স্রোতে ভাসতে-ভাসতে কখন জানি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। জ্ঞান ফেরার পর দেখি হসপিটালে বেড-এ শুয়ে আছি আর
পাশে ডুবে যাওয়া অসংখ্য মানুষের লাশ। শত লাশের ভিড়ে পাগলের মতো খুঁজতে শুরু করলাম আমার লীলাবতীকে। খুঁজতে-খুঁজতে একসময় দেখি আমার লীলাবতীর নিষ্পাপ
মুখখানা। দুহাত তুলে ভাগ্য বিধাতাকে ডেকে বললাম- হে ভাগ্য বিধাতা, কী অপরাধ ছিল আমার লীলাবতীর? আর কিছুটা দিন এই পৃথিবীটা দেখার কি অধিকার ছিল না ওর? কি
অপরাধ করেছিলাম আমি? এক এক করে- একজীবনের সমস্ত সুখ কেড়ে নিলে। একসাথে সারাজীবন পথচলার প্রিয় মানুষটাকে কেড়ে নিলে- তবুও কোনো অভিযোগ করিনি। আজ
আবার সেই মানুষটার শেষ স্মৃতি আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বনটাকেও কেড়ে নিলে; তবে কেন- আমাকে বাঁচিয়ে রেখে প্রতি মুহুর্ত দিচ্ছো বেঁচে থেকেও মৃত্যুর স্বাদ?
সব ভাবনার শহর ছেড়ে ফিরে এলাম কফির মগ হাতে। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে শ্রাবণের বৃষ্টি দেখার মুহুর্তে। জ্বলন্ত কফিটা শীতল হয়ে গেল; আর কখন জানি নিজের অজান্তেই
গাল বেয়ে অঝোরে ঝরে পড়ছে শ্রাবণের বৃষ্টি।


Post a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.