সবুজ বনের গোয়েন্দা হাতি-শিশুতোষ

 সবুজ বনের গোয়েন্দা হাতি

     খায়রুল আলম রাজু 

চাঁদনী রাত। ঝলমলে আলো। ঝিরিঝিরি বাতাস। চারপাশটা দিনের মতো। আলোকিত। আজ বনের সভা। সাপ্তাহিক সভা। প্রতি পূর্ণিমার রাতেই সভা হয়। নদীর পাড়ে। বটগাছটায়। বনে কার কি সমস্যা, তা সমাধানের জন্যই সভা হয়ে থাকে। বাঘ মশাই সভাপতি। সিংহ বিচারক। সভা শুরু হতেই  বকের কান্না। 
সবাই বললো, বকরানী তুমি কাঁদছো কেনো? ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বকরানী বললো, আজ দু'দিন হলো আমার ছানা বাসায় নেই। কেউ হয়তো নিয়ে গেছে। আমি ওকে খুঁজে পাচ্ছি না। ওদিকে ওর বাবাও বাসায় নেই। তিন দিনের জন্য শহরে গেছেন। বোনের বাসায়। এখনো ফেরেনি। শিয়াল পন্ডিত বললো, বকছানা কার সাথে মিশতো বেশি?
ঘাস ফড়িং বলে উঠলো, আমার সাথে। বকছানা আর আমি বন্ধু ছিলাম। আমরা সারাদিন খেলতাম। উড়তাম। ঘুরতাম। সবুজ ঘাসে গড়াগড়ি খেতাম। নদীর পাড়ে স্নান করতাম। কিন্তু দু'দিন হলো বকছানার দেখা নেই। ওকে পুরো বন খুঁজেও পাইনি। মা বকও কম খোঁজেনি। বাঘ মশাই বললেন, বিষয়টা বেশ জটিল। সিংহ বুড়ো বললো, বিষয়টি সমাধান করতেই হবে। উপস্থিত সবার একই কথা। কিন্তু আমাদের বনে তো কোনো শিকারী আসে না- বক ছানাকে বধ করবে। এমনকি বনে কোনো শিকারী পাখিও নেই। না শকুন। না চিল। হাতিছানা বললো, এসো আমরা বনের এদিক-ওদিক খুঁজে দেখি। সবাই খোঁজাখুঁজি করলো। কিন্তু না, বকছানার খোঁজ মিলেনি। হাতিছানা অস্থির। বকছানাকে খুঁজতে হবে। সে সিংহ বুড়োকে বললো, আসুন বকরানীর বাসায় যাই। যদি কোনো তথ্য মেলে। সিংহ বুড়োও   সবাইকে  বললো চলো যাই। বকরানীর বাসায়। বাঘ মশাই বললো, হাতি সোনা আমরা জানি, তুমি বুদ্ধিমান। বনের অনেক সমস্যাই সমাধান করেছ। দোয়া রইল। এই মিশনেও সফল হও। বাঘ মামার কথায় সাহস জাগে  হাতিছানার। খরগোশ বলে আর কত দূর? শালিক বলে ওই তো এসে গেছি। শিরিষ গাছটায় বকরানির বাসা। পাশেই নদী। ছোট ছোট ঢেউ। দুপাশে কাশফুল। সবুজ ঘাস। হাতি চারপাশটা দেখলো। শুঁড় দিয়ে শুকলো। মাটিতে পায়ের ছাপ। ছোট ছোট। কিন্তু উপস্থিত কারোর পা তো এমন না! এই ছাপ কিসের তবে?হাতিছানা ছাপটি দেখে। লক্ষ্য করে খোঁজে। অবশেষে একটি গর্ত পেলো৷ ছাপটি গর্ত থেকে শিরিষগাছটা বরাবর  এসেছে। আশেপাশে আরও ছাপ। দেখতে একই। কিন্তু পুরনো। এই ছাপটি নতুন। বেশ স্পষ্ট। মাটিতে যে ছাপ, একই ছাপ গাছেও। গর্তের কাছে যায় হাতিটা। গর্তে বিরাট অজগর। হাতিছানা সবাইকে ডাকে। হাত নেড়ে বলো এই দেখে, মাটিতে পায়ের ছাপ। একই ছাপ গাছেও।  এটি সাপের ছাপ। এই গর্তেই সাপের বাসা। তারমানে এই সাপটাই বকছানাকে খেয়েছে! সিংহ বুড়ো সাপকে ডাকলো। সাপটি বাইরে এলো, অবাক হয়ে বললো, আপনারা হঠাৎ আমার বাড়িতে; কিসের জন্য? বাঘ মামা বললো, ঢং করো না। তুমি বকরানীর ছানাকে খেয়েছো কেনো?
কই, না তো! আমি বকছানাকে খাইনি। 
আপনাদের ভুল হচ্ছে। 
ঠিক আছে। তুমি সত্যি বলছো। কিন্তু গাছে তোমার পায়ের ছাপ কেনো? 
অজগর হতভম্ব। হাতির প্রশ্নে আর সাহসী কথায়।
অজগর বললো, শুনো তবে, সেদিন বড্ড রোদ ছিল। কাঠফাটা রোদ। পিপাসায় তৃষ্ণার্ত ছিলাম। তাই নদীতে আসি।  অল্প জলের জন্য। জল খেয়ে কুটিরে ফিরছি। হঠাৎ চিঁউ, চিঁউ শব্দ। বকছানা জ্বরে কাঁপছিল। জল খাবো জল খাবো, বলে ডাকছে। আমিও জল নিয়ে গাছে উঠি। বকছানাকে জল খাইয়ে কুটিরে ফিরি। তারপর কী হলো আমি জানি না! 
শিয়াল পন্ডিত বললো,  বকরানি বকছানার কি সত্যি জ্বর ছিল? 
জ্বি, সেদিন বড্ড জ্বর ছিল। আমি ঔষধ আনবো বলেই হরিণীর কাছে যাই। ফিরে আর ওকে পাইনি। 
আরও চিন্তায় পড়লো হাতিটা। উপস্থিত সবাই। ওদিকে বকরানী কাঁদছে তো কাঁদছেই... থামছে না। হঠাৎ চিঁউ... চিঁউ... চিঁউ শব্দ। কান পেতে শুনছে হাতিটা। একটু এগিয়ে এলো। নদীর পাড়ে। কুমিরের ঘরটায়। হাতিটা এগিয়ে যেতেই দেখে বকছানা কুমিরের ঘরটায়! আবারও সবাইকে ডাকলো হাতিটা। সবাই দৌঁড়ে এলো। বকরানি জড়িয়ে ধরলো বক ছানাকে। আদর করতে লাগলো। কপালে ।গালে। মাথায়। 
বকরানি বললো, খোকা তুই এখানে কেনো? 
জানো মা, জ্বরের জন্য উড়তে পারছিলাম না।  অজগর মামা আমাকে জল খাইয়েছে। একটু পর আবার তৃষ্ণা পায়। জল খাবো বলেই নদীতে আসি। কিন্তু জল খেয়ে আর উড়তে পারিনি। কুমির খালা আমাকে  জল খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। মাথায় বিলি কাটেন। আদর-যত্নে সুস্থ  করেন।সবাই পুরো বিষয়টা বুঝতে পারেন। বকরানীও। খুশিতে সবাই হাতি ছানার তারিফ করেন, বুদ্ধির জন্য। সাহসের জন্য। কেউ কেউ বলেন, হাতিছানা আমাদের  সবুজ বনের গোয়েন্দা। বিপদের বন্ধু।

0/Post a Comment/Comments

Please do not enter any spam link in the comment box.

Stay connected

FACEBOOK- Fans Like
TWITTER- Followers Follow
YOUTUBE- Subscribers Subscribe

Subscribe us

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner