মানুষপাখি-শিশুতোষ


মানুষপাখি,,

খায়রুল আলম রাজু,,


আমাদের বাড়িটা, গ্রামের ঠিক মাঝখানে। একখন্ড সবুজে ঘেরা। এদিকে ফুল গাছ, ওদিকে ফলজ ও ঔষধি গাছ। পুবের পুকুরের পরেই ধানক্ষেত। পথে পথে গাছের সারি, ঘাসগাছ, তালগাছ লতাপাতায় বিছিয়ে পড়া সবুজ আঁচল। পুরো বাড়িটা মাতিয়ে রাখে—পাখিরা। সকাল-বিকাল এগাছে-ওগাছে পাখিদের আনাগোনা। বক আর কাকের বাসায় ভর্তি পশ্চিমের বাঁশঝাড়। কাঁঠালগাছটা শালিক, ঘুঘুর বাসায়। দক্ষিণের বড় আমগাছটায় দোয়েলপাখি। আর উঠোনের বেগুনগাছে—ছোট্টটুনি। বাড়ির বেলকনিতে চড়ুইদের কিচিরমিচির শেষ নেই। বৈশাখে বড় আপু বেড়াতে আসে। পুরো বাড়ি জুড়ে উৎসব।হৈ-হুল্লোড় আর খানাদানার আয়োজন।  পিঠেপুলি, মলা মাছের চচ্চড়ি, মাংসভোনা, তালের পিঠে কত খাবারের ধুম! ওদিকে ভাইয়া বিয়ে করেছে দু'বছর। গতকাল এক অতিথি এলো বাড়িতে। নতুন অতিথি। অতিথিকে আমরা আগে চিনতাম না। এখন চিনি ঠিকই, নাম নেই। আমাদের বাড়িতে অতিথি পাখির মতোই ওর আগমন৷ আমি ওর নাম দিলাম তোতাপাখি।  আপু বলেন দোয়েল। ভাইয়া বলেন টুনটুনি। ভাবি বলল, না, ওর নাম শালিক। আব্বু বলল, ওর নাম ময়নাপাখি। আমার তখন মনটা জুড়ে দুঃখ এলো। আমি বাড়ির ছোট। আমার ইচ্ছে ওর নাম তোতাপাখি রাখবো। ও দেখতে পাখির মতো–সুন্দর। ফুলের মতো দেখতে। কিন্তু ফুল তো কথা বলে না বোবা। এই মেহমান তো কথে বলে। ওর নাম আমি তোতা পাখি রাখবো। ও পাখির মতো কাঁদে, কথা বলে। তোতাপাখিও কথা বলে। ওই যে, বারান্দায় রাখা খাঁচার তোতাপাখি, সারাক্ষণ ও কথা বলে। কত কথা ওর মুখে। কত হাসি ও ঠোঁটে। কত সুন্দর ওর পালক। কত সুন্দর ও দেখতে। হঠাৎ আম্মু বলল, 'শুভ, ও তো পাখি না বাবা, ও তো আমাদের মেহমান। তোমার ভাইয়ার ছেলে।' ও তোমার ভাইপো হয়। তুমি ওর ছোট চাচ্চু। দুষ্টু-মিষ্টি ছোট চাচ্চু। 
ভাবি বলল, 'তাইতো, এখন কি হবে? আমরা ওর কী নাম রাখবো?' 
শুভ, তুমিই ঠিক করো...।
—পেয়ে গেছি, আমি ওর নাম পেয়ে গেছি হুররে...।
—কী নাম, শুভ? সবাই জিজ্ঞেস করল।
— ও পাখির মতো চিঁউচিঁউ করে কাঁদে। ওটাই ওর কথা। মুখের ভাষা। ওর নাম ‘তোতাপাখি’। সবাই হেসে কুটিকুটি। 
শুভ এবার কেঁদে উঠলো। ভাইয়া মাথায়  হাত বুলিয়ে বলল, 'শুভ, ও আমাদের মেহমান। নতুন সদস্য। তুমি ওকে তোতাপাখি বলেই ডেকো। কিন্তু আমরা সবাই ওর নাম রাখলাম—ভুবন। ও আমাদের পৃথিবী, ওকে ঘিরে আমরা গোলাকার বৃত্ত। আম্মু হাসল, আমিও হাসলাম। ভাইয়াও হাসল, আপুও, আব্বু এবং ভাবিও হেসে উঠল। অতিথিও হাসির শব্দে লাফিয়ে উঠলো; জলে ভাসা সরপুঁটির মতো। ওর পা গুলো নাচতে লাগলো, হাতগুলো নাড়াতে লাগলো। চেয়ে রইল আমার দিকে—পাখির মতো। আমি বলে উঠলাম, 'তোতাপাখি, কেমন আছিস?' ও আরও হেসে উঠলো, লাফিয়ে উঠলো। আনন্দে পুরো বাড়িটাই দোলে উঠলো রঙবেরঙে উৎসবে।
আম্মু বলল, এতো পাখি পাখি বললে, ওকে গাছে রেখে আয়! গাছের ডালে থাকবে, আকাশে উড়বে, কিচিরমিচির করবে। আমার ঘরে পাখি-টাখির জায়গা নেই।
টগবগে রাগ হলো শুভর। কেঁদে উঠলো আবারও, ঠিক ওর ভাইপোর মতো। আর হেসে কুটিকুটি সবাই। আম্মু বলল, “বোকা ছেলে, আমি তো মজা করেছি।” যাও পড়তে বসো। গ্রীষ্মের ছুটি শেষ। আগামীকাল স্কুল খোলবে। এবছর তোমার পি এস সি পরীক্ষা। ট্যালেন্টপুল বৃত্তি পেতে হবে। যাও, যাও পড়তে বসো৷ সোনা আমার, পড়তে বসো যাও।
—আচ্ছা আম্মু, আমি তো মানুষ, আমায় সোনা বলো কেনো?
-ভুবনকে তোতাপাখি বললেই যত দোষ আমার!সবাই লুটিয়ে পড়ল হাসিতে।
—ভাইয়া বলল, ঠিক আছে, ঠিক আছে, ভুবন হলো মানুষপাখি। আমরা ওকে পাখি বলেই ডাকবো। তোতাপাখি। কী সুন্দর নাম! বড় হলে এই তোতাপাখিও ডাকবে: চাচ্চু, ফুফু, দাদু, দাদা কত কী!
শুভ আনন্দে বলে উঠলো,
হিপ! হিপ! হুররে...  
তোতাপাখি বলবে কথা 
খেলবে অচীনপুর রে!    
         

0/Post a Comment/Comments

Please do not enter any spam link in the comment box.

Stay connected

FACEBOOK- Fans Like
TWITTER- Followers Follow
YOUTUBE- Subscribers Subscribe

Subscribe us

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner