চলে যায় বসন্তের দিন,,
- জুয়েল আশরাফ,,
আফরোজার বিয়ে হওয়ার সতেরো দিন পর জুবায়ের সেই জায়গাটিতে এসে বসলো, যেখানে সে আর আফরোজা প্রায়ই এসে বসতো। একটা কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে পাশাপাশি ঘাসের ওপর বসে দুজনার মধ্যে কত অভিমান, কত রকমের ভালোবাসার গল্প হতো। সবই এখন স্মৃতি হয়ে বেদনার মানসপটে ভেসে বেড়াচ্ছে। শেষবার এমনই এক বসন্ত বিকেলে আফরোজার সাথে শেষ কথা হয় এই গাছের ছায়ায়। সে আর আফরোজা বসেছিল খুব কাছাকাছি। জুবায়ের এখানেই আসতে বলেছিল আফরোজাকে দেখা করার জন্য। সে অস্থির হয়ে উঠেছিল তাকে দেখবে। রাতে কী সব আজেবাজে স্বপ্ন দেখে মন খারাপ নিয়ে সেদিন আফরোজার সঙ্গে দেখা করে। কে জানতো সেই দেখাই দুজনের শেষ দেখা হবে! সেদিনের দৃশ্যটা খুব মনে পড়ে যায়। একটা দুঃস্বপ্ন বলার জন্য আফরোজাকে এখানে ডেকে এনেছিলো সেদিন। শুরু থেকেই জুবায়ের ছিল চুপচাপ। একটা কথাও মুখ থেকে বের হচ্ছিল না। আফরোজা বিরক্ত হয়ে বলল, তুমি কি কিছু বলবে না হলে চলে গেলাম। মাকে বিশ মিনিটের কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছি। স্বপ্নে কী দেখলে বলো।
সেদিন জুবায়ের স্বপ্নে দেখার ব্যাপারে বলতে পারল না। তার চোখে হঠাৎ ময়লা ঢুকেছিল। চোখ থেকে ময়লা বের করার কাজে সে ব্যস্ত হলো। ময়লা চোখের কোথায় আটকে আছে বোঝা যাচ্ছে না। একজনের সাহায্য নিলেই হয়। আফরোজাকে বললেই হয়। জুবায়ের যদি বলে, 'আফরোজা চোখের ভেতর কী যেন ঢুকেছে, তাকাতে পারছি না। যন্ত্রণা হচ্ছে।' জুবায়ের একশ ভাগ নিশ্চিত যন্ত্রণার কথা শোনা মাত্রই আফরোজা ব্যস্ত হয়ে উঠবে চোখ থেকে ময়লা বের করার জন্যে। জুবায়ের কোনো কিছুতে যন্ত্রণা পায় এটা আফরোজা কোনদিন চায়নি। কিন্তু আফরোজাকে কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না।
আফরোজা বলল, চোখ কচলাচ্ছো কেন? কী হয়েছে চোখের?
জুবায়ের বলল, কিছু না।
-কিছু না হলে এম্নি এম্নি চোখ কেউ কচলায়?
-চুলকাচ্ছে।
-চুলকালেও এভাবে চুলকানো ঠিক না। মনে হচ্ছে চোখের পাতা ছিঁড়ে ফেলবে!
জুবায়ের চুলকানো বন্ধ করে দিল। আফরোজা বলল, আমার দিকে তাকাও। মাথা নিচে রেখেছো কেন? ওমা! তোমার চোখ এত লাল কেন? কিছু ঢুকেনি তো চোখে?
জুবায়ের বলল, আজ আর কথা হবে না তোমার সঙ্গে?
-বলেছি তো বাবা চলে এসেছেন অফিস থেকে। আজ বাসায় মেহমান আসবে রাতে। মন খারাপ করো না প্লিজ।
-মন খারাপ করছি না। কিন্তু দেখো চোখটাই হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল।
-দেখি, আমাকে দেখতে দাও।
জুবায়েরের চোখে হাত দিল আফরোজা। কিছুক্ষণ চেষ্টার পর একটা ময়লা বেরিয়ে এলো। চোখে আরাম পেল জুবায়ের। আফরোজা বলল, আমার এখন যেতে হবে। মা বকা দেবেন। সময় পেলেই তোমার কাছে আসবো।
জুবায়ের বলল, আচ্ছা যাও।
আফরোজা বিরক্ত ভঙ্গিতে তাকাল। জুবায়ের বলল, কোনো সমস্যা?
আফরোজা বলল, আমার চলে যাবার কথা শুনে তুমি 'আচ্ছা যাও' বলে উঠলে কেন? আরেকটু পরে যাবার কথা বললে না কেন?
জুবায়ের অবাক হয়ে বলল, কী আশ্চর্য, তুমিই না বললে যেতে হবে এখনি?
-আমি যাব বললেই তুমি যেতে দেবে কেন? আরেকটু সঙ্গে থাকি এটা তুমি চাও না?
জুবায়ের মন খারাপ করে বলল, দেখো আমার মন এম্নিতে আজ ভালো নেই। প্লিজ ঝগড়া করো না আজ।
হঠাৎ আফরোজা উত্তেজিত গলায় বলল, আমি ঝগড়া করছি তোমার সাথে? আমি ঝগড়াটে? আর কোনোদিন তোমার কাছে আসবো না।
জুবায়ের চুপ হয়ে গেল। আফরোজা অতিমাত্রায় রেগে গেছে। রেগে যাওয়া অবস্থায় তার সাথে কথা বলতে নেই। কথা বললেই বিপদ। রাগ আরো বেড়ে যাবে।
আফরোজা উত্তেজনায় বলল, যাচ্ছি আমি। আর কোনোদিন তোমার কাছে আসবো না। আজ আমাকে তুমি গাল দিয়েছো, ঝগড়াটে বলেছো। আমি মনে রাখবো হুঁ।
জুবায়ের চুপ করে থাকল।
আফরোজা কান্না জড়ানো গলায় বলল, কোনোদিন এই ঝগড়া মেয়ের মুখ আর দেখবে না। আমি যাচ্ছি চলে। যাবার আগে বলে যাই ঠিকমতো খেয়ো, রাত জেগো না। কোনো কারণে মন খারাপ করো না। তুমি কষ্ট পেলে আমিও কষ্ট পাই। ভাল থেকো।
জুবায়ের আফরোজার হাত টেনে ধরল। বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নিল, তারপর আফরোজার কানের কাছে মুখ এনে আস্তে করে বলল, আমার অভিমানী পাগলীটা, শুধু কাঁদতে জানে।
সেদিন স্বপ্নটা আফরোজাকে বলা হয়নি। আর কোনোদিন বলা হবেও না। স্বপ্নটা সে নিজের ব্যাক্তিগত ডায়রীতে লিখে রেখেছে...।
গতরাতে তোমাকে স্বপ্নে দেখেছি। স্বপ্নে দেখলাম তুমি কোনো এক বিয়ে বাড়িতে এসেছো। কী আশ্চর্য, সেই বিয়ে বাড়িতে আমিও আমন্ত্রিত অতিথি।
পুরো এলাকা জুড়েই বিয়ের আনন্দ। যেন একটা উৎসব। তুমি যেই বাড়িটাতে এসেছো রাস্তা থেকে সেই বাড়ির বারান্দায় তোমাকে দেখা যায়। গেটে দু'জন দাড়োয়ান, কাউকেই ঢুকতে দিচ্ছে না। আমি রাস্তা থেকে কতবার তোমাকে হাত নেড়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলাম তুমি একবারও ফিরে তাকালে না। মনে হলো আমাকে দেখতেই পাচ্ছো না। মাঝে মাঝে বারান্দায় এসে আবার চলে যাও ভিতরে। আমি তখন সাহসী হয়ে দাড়োয়ান দু'জনের সামনে এসে দাঁড়ালাম। কী অদ্ভুত, দাড়োয়ান দুজন সবাইকেই বাঁধা দিচ্ছে, কিন্তু যখনি আমি সোজা গেটে ঢুকে পড়লাম দাড়োয়ান দু'জনই আমাকে দেখে বিনয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। আমাকে বাঁধা দিল না কেউ। ভেতরে ঢুকে আমি খুবই ব্যথা নিয়ে চারপাশে তাকালাম। আমার চোখের সামনে ফাঁকা জায়গা। সেখানে এক পাশে একটা দেয়ালহীন ঘরে, অনেকগুলো মানুষ বিয়ের আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে রান্না করছে। আমি পাশে তাকিয়ে দেখি যেই বাড়িটাতে তুমি আছো উঁচু প্রাচীরে বাড়িটা ঘেরা। কোনোকালেই সেখানে প্রবেশ করা আমার সাধ্যে নেই। আমার মন খারাপ হলো ভীষণ। ব্যথিত মন নিয়ে আমি গেট দিয়ে বের হয়ে রাস্তায় যেখানে উৎসব হচ্ছে সেই উৎসবের ভিড়ে মিশে গেলাম। কিছুক্ষণ পরেই দেখি আমি সেই বাড়িটাতে ঢুকতে পেরেছি। দোতলায় চলেও এসেছি। সেই বারান্দায়, যেখানে তোমাকে রাস্তা থেকে দেখতে পেয়েছিলাম। কিন্তু আশ্চর্য, ভীষণ অবাক ও ব্যথিত হলাম দেখে তোমাকে। আমাকে দেখার সাথে সাথেই তুমি ঘরের ভেতর চলে গেলে। আমিও ঢুকে পড়লাম তোমার ঘরে। তোমার বিছানায় লাল-সবুজ রঙের চুড়ি রেখে দিয়ে বললাম তোমার জন্য উপহার এনেছি। ঠিক তখনি তোমাকে দেওয়া অসংখ্য ছেলেদের উপহার উড়ে উড়ে এসে বিছানায় পড়ল। আমার উপহার-চুড়ি সবার উপহারের নিচে পড়ে গেল। আমি তোমার দিকে তাকালাম। আমার ব্যথাকে তুমি স্পর্শ করলে না। তবু আমি তোমাকে প্রস্তাব করলাম, 'আফরোজা আমাকে বিয়ে করো'। তুমি বললে, 'আমার পক্ষে সম্ভব না।' আমি আর দাঁড়াইনি। ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তায় নেমে পড়লাম। টের পাচ্ছি তুমি গোসল করছো। সাজগোজ করছো। লোকজনের সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে পড়েছো। এই বাড়ি ছেড়ে তুমি বেরই হবে না। আমাকে দেবার মতো এখন আর তোমার সময় নেই। আমি তোমার থেকে অনেক দূরে সরে দূরের ভিড়ে মিশে গেলাম। যেই মানুষগুলোর ভিড়ে মিশে গেছি লক্ষ্য করলাম তারা সবাই আমার আত্নীয়-আপনজন, সবাই কোনো এক উৎসব অথবা কোনো বিষয় নিয়ে উত্তেজিত। আমার দিকে কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না। আমার ব্যথা কেউ টের পাচ্ছে না। আমি সবার থেকে আলাদা হয়ে একা হয়ে যাচ্ছি। এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়ালাম যেখানে আমাকে কেউ চেনে না। জায়গাটা নোংরা, পাশে নদী। নদীতে ঘোলা পানি। লোকজন নৌকায় পার হচ্ছে। আমি সেই নদীর ঘোলা পানিতে বুক পর্যন্ত দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ কয়েকটি পরিচিত মুখ আমার সামনে পানির মধ্যে এগিয়ে এলো, তারা বলল তুমি আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছো। আমি পানি ছেড়ে উপড়ে উঠে এলাম। রাস্তায় মানুষজনের প্রচন্ড ভিড়। আমার বাবা আমার বড়বোন আমাকে দেখেই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, তারা বললেন তুমি নাকি আমাকে পাগলের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছো। আমি আনন্দ উত্তেজনায় মানুষের ভিড় ঠেলে তোমার সেই বাড়িটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। সবাই বলছে তুমি আমাকে খুব খুঁজে যাচ্ছো কিন্তু কোথাও পাচ্ছো না। আমি বাড়িটার কাছাকাছি আসতেই দেখি তুমি সাধারণ একটা শাড়ী পড়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছো। আমি তোমার সামনে এসে দাঁড়ালাম। তুমি আমার দিকে খুব স্বাভাবিক ভাবেই তাকালে। তোমার তাকানো দেখে মনে হলো না যে, আমাকে তুমি খুঁজছো। তুমি শুধু বললে, 'আমি চলে যাচ্ছি।' বলতে বলতেই দেখি তুমি হাঁটতে লাগলে। আমি দ্রুত তোমার পেছনে এসে বার বার জিজ্ঞেস করলাম, 'তুমি যাচ্ছ কোথায়?' তুমি আমাকে কোনো জবাবই দিলে না। সোজা চলে যাচ্ছো নদীর দিকে। তারপর একটা নৌকায় উঠে বসলে। আমি তোমাকে বললাম, 'তুমি নৌকায় উঠো না, তুমি নৌকায় উঠার দোয়া জানো না। প্লিজ নেমে আসো।' তুমি আমার দিকে বিরক্ত ভাবে তাকালে, বললে, 'আমি নৌকায় উঠার দোয়া জানি- সুবহানাল্লাযি ছাখ্খর লানা হাযা অমা কুন্না লাহু মুক্বরিনীন অ ইন্না ইলা.... '। আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম, 'এটা নৌকায় পড়ার দোয়া না। এটা তো গাড়ীতে পড়ার দোয়া!'


Post a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.