আয়ানের নানাবাড়ির কুকুর- ছোট গল্প


আয়ানের নানাবাড়ির কুকুর,,

 - জুয়েল আশরাফ,,

          

আয়ান যখন নানাবাড়িতে পৌঁছাল তখন সন্ধ্যা। নানাদের উঠোনে এসে দাঁড়াতেই কোথ্থেকে একটা কুকুর এসে তার শরীর চাটতে লাগল। এগারো বছরের আয়ান ভয়ে চিৎকার দিয়ে সরে গেল। ছোটমামা হেসে বললেন, ভয় পাস নে আয়ান, এটা আমাদের কুকুর। যাকে পছন্দ করে তারই শরীর চেটে দেয়।
     কিন্তু কুকুরে আয়ানের সব সময়ই ভয়। বাড়ির কুকুর হোক, পথে ঘাটের কুকুর হোক, কুকুর দেখলেই সে দৌড়ে পালাবার চেষ্টা করে। তার নানাবাড়ির কুকুরটা আকাড়ে বিশাল। গা ভর্তি লোম। অচেনা লোক দেখলেই জিব বের করে হাসফাস করবে, গোঙ্গানির মতো শব্দ করে। চোখ দুটি ভয়ঙ্কর। দেখলে মনে হবে এখনই ছুটে এসে কামড়ে ছিড়ে খেয়ে নেবে। কিন্তু এই কুকুরটাকে দেখতে যত পাজি মনে হয়েছিল আচরণে সেরকম মনে হলো না। আয়ান দেখল গা চেটে দিয়েই লেজ নাড়িয়ে কুকুরটা আনন্দ প্রকাশ করতে লাগল।
     মাগরিবের নামাজ পড়ে আয়ানের নানাজান মসজিদ থেকে বাড়িতে এলেন। কুকুর দেখে ভয় পেয়েছে শুনে কাছে ডাকলেন। নানাজান বললেন, কুকুর দেখে ভয় করবি না। নিজেকে বীর মনে করবি সবসময়। একটা দোয়া শেখালেন তিনি। বললেন, হঠাৎ কুকুর আক্রমণ করলে এই দোয়া পাঠ করবি, ইনশাআল্লাহ কুকুর চুপ হয়ে চলে যাবে। মনে থাকবে তো?
     আয়ান 'হ্যাঁ'- সূচক মাথা নাড়ল।
     কুকুরের ভয়ে দোয়াটা সে নানার কাছ থেকে কাগজে লিখে নিয়েছে। যে কদিন তারা নানাবাড়িতে ছিল কুকুরটাকে দেখলেই দোয়াটা পড়তো। কাগজে লেখা দোয়া সবসময় তার পকেটেই থাকতো। তৃতীয় দিনে কাগজ দেখে দোয়া পড়ার আর দরকার হয়নি, তার মুখস্থ হয়ে গেছে।
     নানাবাড়ি থেকে বিদায় নেওয়ার দিন দেখা গেল কুকুরটা আশেপাশে নেই। আয়ান আনন্দে স্বস্তির শ্বাস ফেলল। বড় আপা বিরক্ত মুখে বললেন, কী ছেলেরে তুই! কুকুরের ভয়ে গা ঘেষে থাকিস। সরে দাঁড়া, গরম লাগে।
     বাসস্ট্যান্ডে এসে তারা সবাই বাসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। বাস এসে কাছাকাছি থামতেই ছোট্ট একটা কান্ড ঘটল। নানাবাড়ির কুকুরটা তার দিকে দৌঁড়ের গতিতে ছুটে আসছে। সে ভয় ও আতঙ্কে চিৎকার দিয়ে বাসভর্তি লোকের পিলে চমকে দিল। বড় আপা এবার রাগ আর লজ্জায় মাকে বলল, মা, ওকে সামলাও, তাহলে কিন্তু ফুটবলের মতো লাথি মেরে জানালার কাচ ভেঙ্গে আয়ানকে বের করব। 
     আয়ান বাবাকে জাপটে ধরে ছিল। মা আশ্বস্ত করতে বললেন, এই কী রে আয়ান! ভয় পাচ্ছিস কেন বাবা? কুকুরটা তো তোকে বন্ধু ভাবছে। এই কটা দিন দুজনে একই বাড়িতে ছিলি, বিদায়ের সময় ওকে বলে আসিসনি, তাই তোকে বিদায়ের শুভেচ্ছা জানাতে এসেছে।
      সে মায়ের কথা যাচাইয়ের জন্য জানালার বাইরে তাকাল। সত্যি সত্যিই কুকুরটা কেমন বিদায় বিরহ চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। এই প্রথম একটি প্রাণীর জন্য তার মায়া হলো। গাড়ি ততক্ষণে ছেড়ে দিয়েছে। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে, গাড়ি চলছে। আর কুকুরটা ছুটছে গাড়ির পিছু পিছু। 
      আধ ঘন্টা বাদেই গাড়ি এসে থামল গন্তব্যস্থানে। আয়ান বাস থেকে নেমেই চারপাশ তাকাল। কুকুরটাকে দেখতে পেল না। বাড়িতে এসে পরনের কাপড় পাল্টাবে এমন সময় মা বললেন, আয়ান আয়, কে এসেছে দেখবি।
     বাইরে এসে আয়ান অবাক। নানাবাড়ির কুকুরটা তাদের বারান্দায় দু'হাত সামনে বিছিয়ে বসে আছে। তার ভীষণ মায়া হতে লাগল। সে কুকুরটার দিকে চেয়ে আছে। কুকুরটাও তার দিকে চেয়ে আছে। জিব বের করে হাঁফাচ্ছে।
     রাতে কুকুরটাকে খেতে দিয়ে  নরম একটা বস্তা বিছিয়ে দিল আয়ান বারান্দায়। তার হাতের স্পর্শ পেয়ে কুকুরটা চোখ বুজে ঘুমিয়ে পড়ল। আয়ান নিজের বিছানায় এসে শুয়ে শুয়ে সিদ্ধান্ত নিল নানা বাড়ির কুকুরটাকে আর যেতে দেবে না। তাদের বাড়িতেই রাখবে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই বারান্দায় এসে দেখা গেল কুকুরটা নেই। মা বললেন, রহিম চাচাকে দিয়ে নানাবাড়িতে কুকুরটাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। সে মন খারাপ নিয়ে আবার বিছানায় এসে শুয়ে পড়ল।
     দিন সাতেক পর স্কুল থেকে এসে শুনল মা বলছেন, আয়ান, কুকুরটা আমাদের বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার পর অসুখে পড়ে। কাল বিকেলে মারা গেছে।
     সে স্কুল ব্যাগ মেঝেতে ফেলে দিয়েই মাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠল। মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কি হলো কাঁদছিস কেন?
     সে কেন কাঁদছে জানে না। শুধু মনে পড়ল, কুকুরটার নির্বাক চোখের অদ্ভুত চাহনি।

0/Post a Comment/Comments

Please do not enter any spam link in the comment box.

Stay connected

FACEBOOK- Fans Like
TWITTER- Followers Follow
YOUTUBE- Subscribers Subscribe

Subscribe us

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner