Bengali short story-Nargis kahon




 


নার্গিস কাহন
      - জুয়েল আশরাফ 

বাসে উঠার মুখে নার্গিসের চোখ চকচক করে উঠল। একজন ভদ্র লোকের একহাজার টাকার একটা নোট পকেট থেকে পড়ে গেছে। সে বলতে যাচ্ছিল- 'আঙ্কেল আপনার টাকা' সে তা করল না, যেন কারোর কিছুই পড়েনি এমন ভঙ্গিতে বাসে উঠে পড়ল। লিলি তার কাছে চারশো টাকা পায়। অনেকদিন থেকে কানের কাছে ঘ্যানর ঘ্যানর করে যাচ্ছে। কৃপণ বান্ধবীদের কাছ থেকে টাকা ধার করার মহাবিপদ, কারণে-অকারণে যার তার সামনে চেয়ে বসে। দোকানদার ফালুর কাছে একশ চল্লিশ টাকা বাকি। গত সপ্তাহে একহালি ডিম আর টুকটাক কিছু জিনিস কিনেছে। সেই টাকাটাও শোধ করা হয়নি। আজ সবার শোধ দেবার পরও বাকি থাকবে চারশো ষাট টাকা। দশটা টাকা মসজিদের দান বাক্সে দিয়ে রাখবে। পাপের পাশাপাশি কিছু পূণ্য রাখা ভাল। যদিও টাকাটা অন্যের, অন্যের টাকা দান করলে পাপ মোচন হয় না। তারপরও 'দান' জিনিসটা তো ভাল, হোক সেটা পরের টাকায় অথবা নিজের টাকায়।
     নার্গিস মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনের একটিতে ধপাস করে বসে পড়ল। এবং অহেতুক একটা লোক দেখানো দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার বুক থেকে। মনে মনে ঋণের টাকাটা সে আলাদা করে ফেলল। এই মুহূর্তে সে ৪৫০ টাকার মালিক। কারোর কাছে ঋণ নেই। ঋণ থাকা ভাল না। লোকমান হাকিম (আ) নিজের পুত্রকে নসীহত করেছেন- 'বেটা! করজ হইতে নিজেকে হেফাজতে রাখিও। কেননা, ইহা দিনের বেলায় জিল্লতি এবং রাত্রিতে দুশ্চিন্তা।' অর্থাৎ পাওনাদারের তাগাদায় দিনের বেলায় অপমান সহ্য করতে হয় এবং সারারাত্র করজের চিন্তায় অতিবাহিত হয়। 
     নার্গিস টের পেল পেট খিদেয় চো চো করছে। সকালে আলু সেদ্ধ দিয়ে গরম ভাত খেয়ে এসেছে সে। এতক্ষণ খিদে ছিল না। টাকাটা হাতে আসার পর থেকেই খিদেটা কেমন অসভ্য হয়ে উঠেছে। অফিসের সামনে বাসটা থামলেই নেমে পড়বে। তার অফিসের সামনে নামতে তো তাকে হবেই। কিন্তু নেমেই অফিসে ঢুকবে না। আগে কিছু খেয়ে নেবে। খাবার জন্যেও একটা নিরিবিলি রেস্টুরেন্ট দরকার। রাস্তার ওপারে, অফিসের ঠিক উল্টো দিকে একসঙ্গে বেশ কয়েকটা হোটেল রয়েছে। একটাতেও যাবে না। পরিচিত কেউ না কেউ থাকতে পারে। সবাই তার মতো আলুসেদ্ধ খেয়ে অফিসে আসে না। কেউ কেউ পরোটার সঙ্গে খাসির কলিজা ভুনা খেতে পেট খালি নিয়েও আসে।
     বাস থেকে নেমে পড়ল নার্গিস। রাস্তা পার হয়ে কিছুদূর হেঁটে গেলেই আরো হোটেল। সত্যি সত্যিই আট মিনিট হেঁটে এসেই হোটেল পেয়ে গেল সে। এবং সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হলো হোটেলের সাইনবোর্ডে লেখা- 'হোটেল নিরিবিলি'। কী ইন্টারেস্টিং ব্যাপার! সে খুঁজতে ছিল নিরিবিলি, হোটেলের নামই নিরিবিলি। কিন্তু ভেতরে ঢুকে দেখা গেল উল্টো ঘটনা। নামের সাথে ভেতরের পরিবেশের কোন মিল নেই। গিজগিজ করছে লোক, প্রতিটি টেবিলে লোকভর্তি। অনেকে দাঁড়িয়ে রয়েছে টেবিল খালি হবার আশায়। বেয়ারারা ব্যস্ত হয়ে খাবার পরিবেশনে ছোটাছুটি করছে। এদিকে সব হোটেলেই সকালের এই দৃশ্য। নার্গিস কী করবে- ভেবে না উঠতেই একজন বেয়ারা এসে বলল, আপা দোতলায় যান, উপরে টেবিল খালি আছে।
     নার্গিস দোতলায় উঠল না। হাতে ধরা নোটটি তার কাছে হঠাৎই কেন মনে হলো নোটটি আসল নয়, নকল টাকা। যদিও আসল নকল সে চিনতে পারবে না। দোকান থেকে কিছু কিনে যাচাই করে নিলে হয়। যেমন ত্রিশ চল্লিশ টাকার ভেতর একটা পণ্য কিনে নিয়ে দেখা যাক। আজকাল ভাংতি টাকার অভাবে দোকানদার একহাজার টাকার নোটে ত্রিশ টাকার পণ্য বিক্রি করতে চায় না। নার্গিসের বিশ্বাস তার কাছে বিক্রি করবে। শুধু তার কাছেই না সব সুন্দরী মেয়েদের কাছেই দোকানদার বিক্রি করবে। সে বত্রিশ টাকায় একটা লাক্স সাবান কিনে নিল। দোকানদার হাসিমুখে বলল, 'আপা আবার আসবেন'। আবার আসবে কিনা নার্গিস জানে না। সে জলদি জলদি অফিসের পথে হাঁটতে লাগল। হাতে সময় কম। এতদূর আসা ঠিক হয়নি। খাওয়া হলো না। একসময় পরে এসে খেয়ে যাবে। টাকাটা রয়েছে থাক।
     মোবাইল ফোনের রিংটোন বাজছে। নার্গিস দেখল লিলির ফোন। একটু আগেই মনে মনে লিলিকে ভাবছিল সে। অফিসে ঢুকেই প্রথমে যাবে লিলির টেবিলে। চারশ টাকা টেবিলের উপর রেখে দিয়ে বলবে, 'এই নে তোর চারশ টাকা। সামনের শুক্রবারে দেবার কথা ছিল, চারদিন আগেই দিয়ে রাখলাম। টাকা তো হাতের ময়লা, আসে চলে যায়!'
     নার্গিস ফোন উঠিয়েই বলল, অফিসের কাছাকাছি আছি। তিন মিনিট লাগবে।
     লিলি বলল, শোন অফিসে যাস না। আজ অফিসে স্ট্রাইক করেছে।
     -তুই কোথায়?
     -আমি এখন বাসায়। বের হয়ে ছিলাম, জামাল ভাইয়ের ফোন পেয়ে অর্ধেক রাস্তা ফিরে এলাম।
     -ও।
     -কি করবি তুই এখন?
     -কী আর করব বাসায় চলে যাব।
     -এক কাজ কর আমার এখানে চলে আয়। দুপুরে খেয়ে যাস। মা রেঁধে নানীকে দেখতে গেছেন।
     -না রে, বাসাতেই যাই। কিছু ময়লা কাপড় আছে গত শনিবারে ধোয়া হয়নি।
     ফোন ছেড়ে দিল নার্গিস। আজ সারাটাদিন ছুটি পাওয়া গেল। সবচেয়ে ভাল হতো বাসায় থাকতেই লিলির ফোনটা পাওয়া যেত যদি! তাহলে কষ্ট করে এতদূর আসতে হতো না। বাস ভাড়াটা বেঁচে যেতো। কিন্তু একহাজার টাকার নোটটা পেতো না সে।
     গলির মুখে এসে দেখল ফালুর দোকানে ভিড় কম। বাকির টাকাটা দিয়েই তালা খুলে নিজের ঘরে এসে ঢুকল। ব্যাগটা বিছানার পাশে রেখে দিয়ে শুয়ে পড়ল। শরীর ক্লান্ত লাগছে। ইচ্ছে করছে না ময়লা কাপড়গুলি ধুতে। দুপুরে রান্নার ঝামেলা নেই। টিফিন কেরিয়ারে দুপুরের জন্যে নিয়ে যাওয়া সেই আলু সেদ্ধ রয়েছে। দরকার হলে একটা ডিম ভাজি করে নেবে। 
     চোখটা ঘুমে লেগে এসেছিল। ফোনের রিংটোনে জেগে উঠল। আবার লিলির ফোন।
     -কি করছিস রে তুই?
     -শুয়ে আছি। মাথা ব্যথা হচ্ছে।
     -এখনই আমাদের বাসায় চলে আয়। একটা জরুরী প্রয়োজন।
     প্রয়োজনটা যে কী নার্গিস ভাল করে জানে। সোজাসুজি বললেই হয় টাকার দরকার। নার্গিস বলল, তোর জন্য চারশ টাকা আজ অফিসে নিয়ে গিয়েছিলাম...।
     -টাকার প্রসঙ্গ রাখ। তুই আসবি কিনা বল? নাকি আমিই চলে আসব? আমি এলে কিন্তু দলবল সঙ্গে নিয়ে আসবো।
     লিলি নাছোড়বান্দি। সহজে ছেড়ে দেবার পাত্রী সে নয়। একসাথে পড়াশুনা শেষ করেছে এবং একসাথেই চাকরিতে ঢুকেছে। অগত্যা বাধ্য হয়েই পাশের বাসার চাচিকে বলে বের হলো সে।
     লিলিদের বাসায় এসে অবাক হতে হলো। লিলি বলেছিল বাসায় কেউ নেই। কিন্তু বাসা ভর্তি লোকজন। লিলির মা এগিয়ে এসে হাসিমুখে বললেন, লিলির ঘরে যাও।
     -ঘটনা কি খালামণি?
     -ছেলেপক্ষ এসেছে লিলিকে দেখতে।
     লিলির ঘরে ঢোকার মুখে বসার ঘরটায় একবার উঁকি মেরে তাকাল নার্গিস। বয়স্ক মানুষদের পাশে বেশ কজন যুবক বসে আছে। কোনটি যে পাত্র বোঝার উপায় নেই। সবাই বেশ সুদর্শন, সুন্দর পোশাক। লিলির ঘরে এসে নার্গিস আরো বিস্মিত। বিয়ের শাড়িতে লিলি বসে আছে আর তাকে ঘিরে বেশ কজন মেয়ে। মনে হচ্ছে আজই বিয়ে! তাকে দেখামাত্র লিলি আনন্দে চিৎকার করে উঠে এসে জড়িয়ে ধরল।
     নার্গিস হেসে বলল, কি ব্যাপার? আজকেই বিয়ে নাকি? বিয়ের এত কিছু ঠিকঠাক অথচ আমাকে জানালি একটু আগে?
     -তোকে সারপ্রাইজ দিলাম সখী।
     নার্গিস কৌতূহল দমিয়ে রাখতে না পেরে বলল, কীভাবে কী হলো, ছেলে কি করে, বাড়ি কোথায় সব বল আমাকে। এত জলদি জলদি বিয়ে ঠিক হয়ে গেল অবাক লাগছে!
     লিলি হাত টেনে বলল, আয় হবু বরের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই।
     নার্গিস বাঁধা দিয়ে বলল, এখন না। আগে শুনি তোর মুখে।
     অবাক কান্ড। লিলি এক প্রকার জোড় করেই তাকে টেনে নিয়ে চলল সমস্ত লোকজনের সামনে বসার ঘরে। মেয়েটার আচরণে নার্গিস আরো বিস্মিত। ছেলেপক্ষের সামনে এভাবে কোন মেয়ে হাসতে হাসতে আসতে পারে! মেয়েটার কি কমন সেন্স নেই? আজ লিলির কি হলো! নাকি বিয়ের আনন্দে মাথা আউলা-ঝাউলার উপক্রম! 
     লিলি আগের থেকে আরো বেশি জোড়াল হাসি হাসতে হাসতে বলল, মামা, এই হলো নার্গিস।
     সবাই তাকাল নার্গিসের দিকে। বয়স্ক ভদ্রলোকদের মধ্য থেকে চশমা পড়া একজন হাত উঠিয়ে লিলিকে বসাতে বললেন। নার্গিসকে সবার সামনে খালি চেয়ারটায় বসানো হলো। এতগুলি মানুষের সামনে লজ্জায় জড়োসড়ো হয়ে বসল সে। চশমাপড়া লোকটি নার্গিসের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন, কেমন আছো মা? আমি লিলির বড় মামা। আমরা সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। আমার স্ত্রী সকালেই তোমাকে দেখার জন্য তোমার বাড়ি আসতে চেয়েছিল। আমি সবাইকে বোঝালাম এতগুলি মানুষকে একসাথে দেখলে মেয়েটি ভীষণ অস্বস্তিতে পড়বে। আগে আমি দেখে আসি। যদি আমার পছন্দ হয় এরপর তোমাকে এই বাড়িতে আনার ব্যবস্থা করবো। তোমাকে দেখার জন্য তোমার সাথে বাসে উঠেছি। আমার পকেট থেকে একহাজার টাকার একটা নোট পড়ে যায়। শুভ কাজে টাকা হারানো ভালো লক্ষণ। আমার দাদা বলতেন জিনিসপত্র হারানো ভাল। নতুন জিনিস আসবে। অথবা হারানো জিনিসের উপর সদকার নিয়ত করলে সওয়াব পাবে। আমি তোমার অফিসের আগের স্টপেজে নেমে পড়ি। তোমাকে আমাদের খুবই পছন্দ হয়েছে মা। শুধু তো আমাদের পছন্দ হবে না। আমার ছেলেকেও তোমার পছন্দ হওয়া চাই, তাকে পছন্দ হয় কিনা দেখো।
     এসব ঘটছে কী! এ কোন লজ্জার সাগরের মধ্যে বসিয়ে দিলি তুই লিলি! মনে মনে লিলিকে যত গালাচ্ছে তারচেয়ে বেশি নার্গিস ভাবছে এ স্বপ্ন নয় তো? সবকিছু এত দ্রুত ঘটে যাচ্ছে কী করে!
     লিলির মা খালামণি এসে একটা চেয়ার টেনে বসল নার্গিসের পাশে। লিলির মামাত ভাইকেও মুখোমুখি এনে বসানো হলো। খালামণি বললেন, আমার ভাইয়ের ছেলেকে ভাল করে দেখো তো মা। 
     নার্গিস লজ্জিত মুখে তাকাল। রূপবান এক যুবক। মাথার চুলগুলো সুন্দর একপাশে সিঁথি কাটানো। এত সুন্দর ছেলের মাথায় পরিপাটি চুলে মানায় না। নার্গিসের ইচ্ছে চুলগুলো এলোমেলো করে দেয়। এই ছেলেকে এলোমেলো চুলেই ভাল মানাবে।
     খালামণি বলতে লাগলেন, আমার ভাইয়ের পরিবারের সবাই কানাডায় সেটেল্ড। বিয়ের পর লিলিকে ছেড়ে থাকতে পারবে তো সেখানে?
     তারপর কথা বিনিময় হলো ছেলে-মেয়ের। দুজনকে এক ঘরে বসিয়ে কথা হতে লাগল। সুন্দর বুদ্ধিদীপ্ত চোখের মানুষটির কথা শুনছে নার্গিস। লিলির মামী এসে হবু বউকে গহনা পরিয়ে দিয়ে গেলেন। একসময় উঠে লিলিকে ফাঁকা জায়গায় নিয়ে গিয়ে জড়িয়ে কেঁদে ফেলল নার্গিস। লিলি অবাক এবং আনন্দিত গলায় বলল, এই পাগলী কাঁদছিস কেন তুই?
     -আমার কেউ নেই। ওরা আমার কিছুই জানে না। হুট করে বিয়ে ঠিক হয় কি করে?
     -কে বলেছে কেউ নেই? এই পৃথিবীতে আমরা ছাড়া তোর আর কেউ নেই। সেকথা সব জেনেই আমার মামা তোকে ছেলের বউ করে নিয়ে যাচ্ছে। এখন আর কাঁদিস না। এমন আনন্দমুখর দিনে কান্নাকাটি একদমই সহ্য হচ্ছে না। অল্প পরে কাজি আসবে। আমার ঘরে তোয়ালে আছে। চোখের পানি মুছে ফেল। আর শোন, বিয়ের পর আমি তোকে ভাবী-টাবি ডাকতে পারব না। আরো একটা কথা, তোর কাছে আমি চারশ টাকা পাই সেই টাকা ফেরত না দিয়ে কানাডা যেতে পারবি না। আমি পেছন থেকে ধরে রাখব।
     চোখের পানি মুছতে অথবা নিজেকে কিছু সময় একা রাখতেই নার্গিস এলো লিলির ঘরে। তার চোখে আজ ঘন ঘন পানি চলে আসছে। এত পানি যে, কিছুতেই আটকে রাখতে পারছে না! কেউ কোনদিন তাকে বলে দেয় নি- হে নার্গিস, আজকের দিনে তোকে অনেক বেশি কাঁদতে হবে। 
     নিজের ব্যাগের ভেতর থেকে টিস্যু পেপার বের করার জন্য চেইন খুলল। টিস্যু পেপার নিতে গিয়ে চোখে পড়ল হবু শ্বশুরের আটশো আটাশ টাকা আর সঙ্গে একটা লাক্স সাবান। সাথে সাথে টাকাটা হবু শ্বশুরকে ফেরত দেয়ার জন্য উঠে দাঁড়ায়।

0/Post a Comment/Comments

Please do not enter any spam link in the comment box.

Stay connected

FACEBOOK- Fans Like
TWITTER- Followers Follow
YOUTUBE- Subscribers Subscribe

Subscribe us

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner