মায়া
রচনাঃ তারিকুল ইসলাম লিমন
মায়া-- দিনার গোছানো সংসার। সে নিজেও খুব গোছানো মেয়ে। দিনার বিয়ে হয়েছে সাত বছর। শ্বশুর বাড়ির সবাইকে সে তার আচার আচরণে মুগ্ধ করে রেখেছে। দিনা ও সফিকের একমাত্র মেয়ে মায়া। বয়স মাত্র চার। দিনা সবার অগোচরে সারাক্ষণ কাঁদে। এটা ভেবে নয় যে, সে আর কিছু দিনের মেহমান এই পৃথিবীতে বরং এটা ভেবে যে তার চলে যাবার পর এই পৃথিবীতে মেয়েটা কেমন করে থাকবে? দিনার লিভার সিরোসিস ধরা পরেছে। মৃত্যু দীনাকে ভীত করতে পারে নি; দিনার ভয় তার মেয়ের মায়া কাটিয়ে কীভাবে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে?
আজ সফিক দিনাকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে এসেছে। দিনা বলল- আর কত? এই ডাক্তার থেকে ঐ ডাক্তার। কোন লাভ নেই। ডাক্তার তো বলেই দিয়েছে আর তিন মাস বাঁচবো বড় জোর। হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে সফিক দিনাকে নিয়ে তার প্রিয় জায়গায় কিছুক্ষণ বসলো। দিনাকে আইসক্রিম কিনে দিল। দিনা আইসক্রিমে একটা কামড় দিতেই তার চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগলো। সে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, আমি চলে যাবার পর তুমি আবার বিয়ে করো। কিন্তু খেয়াল রেখো সে যেন মায়াকে আপন করে নেয়। সফিক বলল, প্লিজ, তুমি চুপ করো।
একটি করে দিন অতিবাহিত হয় আর দিনা ক্যালেন্ডারে দাগ কাটে। তার সমস্ত চিন্তা জুড়ে মায়া। মায়াকে কে দেখে রাখবে? কে গান শুনিয়ে ঘুম পারাবে? কে ওর সাথে পুতুল খেলবে? পৃথিবী থেকে চলে যাবে তাতে তার কোন আফসোস নেই। সংসারের এই চলচ্চিত্রে হয়ত তার রোল এতটুকুই। তার দায়িত্ব শেষ। মানুষের সকল কাজ যখন শেষ হয়ে যায়; আর কোন কাজ বাকি থাকে না, তখন সৃষ্টিকর্তা তাকে কাছে ডেকে নেন।
আজ দিনা ও সফিকের বিবাহ বার্ষিকী। প্রথম বিবাহ বার্ষিকীতে সফিক দিনাকে যে হাফ সিল্কের শাড়ি দিয়েছিল সেটা পরেছে। যদিও সফিক দিনার জন্য এবার একটা জামদানি শাড়ি কিনেছে কিন্তু দিনার ঐটাই পছন্দ। দিনা সুন্দর করে সেজেছে। চুল বেঁধেছে, কপালে টিপ দিয়েছে। চুড়ি পরা হয় নি, দিনার অনেক চুরি আছে কিন্তু সেগুলো এই শাড়ির সাথে ম্যাচিং হচ্ছে না। দিনা সফিককে ফোন করে বলে দিয়েছে চুড়ি নিয়ে আসার জন্য।
সফিক এলো রাত ১০ টায়। আজ অফিসে একটু বাড়তি ঝামেলা ছিল তাই দেরি হলো। তাকে বেশ ক্লান্তও দেখাচ্ছে। সফিক ফ্রেশ হয়ে খেতে বসলো। আজ দিনা সফিকের পছন্দের কিছু খাবার রান্না করেছে। খেতে বসে সফিকের মনে পড়লো যে চুড়ি আনতে সে ভুলে গেছে। দিনা চুড়ির কথা জিজ্ঞেস করছে না তাই সফিকও এই ব্যাপারে আর কিছু বললো না। খাওয়া শেষ করে দিনাকে নিয়ে সে ছাদে গেল।
দেখো, আজ কত সুন্দর একটা মায়াবী চাঁদ উঠেছে, সফিক বলল।
হ্যাঁ।
একটা গান শোনাও।
দিনা গাইতে লাগলো,
‘আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে
বসন্তের এই মাতাল সমীরণে॥’
সফিক চোখ বন্ধ করে দিনার গান শুনছে। দিনা রবীন্দ্রনাথের এই গানটা প্রায়ই গুন গুন করে গায়। এক সময় সফিকের চোখ ভিজে এলো। দিনা গান গাইতে গাইতে সফিকের চোখ মুছে দিলো।
‘যাব না গো যাব না যে, রইনু পড়ে ঘরের মাঝে-
এই নিরালায় রব আপন কোণে।
যাব না এই মাতাল সমীরণে॥’
দিনা গান শেষ করার পর সফিক টব থেকে একটা সর্পগন্ধা ফুল ছিরে এনে দিলো।
সফিক বলল, সর্পগন্ধা ফুলের আরেক নাম কী জানো?
কী?
সর্পগন্ধা ফুলের আরেক নাম হল চন্দ্রা, সংস্কৃত নাম চন্দ্রিকা। চাঁদের আলোতে চন্দ্রা ফুল দিলাম চাঁদনীকে।
তুমি তো আর এখন আমাকে চাঁদনী নামে ডাকোই না। আচ্ছা আমি যখন থাকবো না তখন কী তুমি চাঁদ দেখতে আসবে, এমনই কোন এক চাঁদনী রাতে?
দিনার শরীর ক্রমশ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। সে অনেক কাবু হয়ে পড়েছে। দিনা তার মেয়েকে কাছে ডেকে বসালো।
মা, তুমি কি তোমার বাবার সাথে থাকতে পারবে?
কেন? তুমি কোথায় যাবে?
আমি দূরে চলে যাবো।
তাহলে আমিও দূরে চলে যাবো।
দিনা আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল।
মায়া বলল, মা, তুমি কাঁদছো কেন?
দিনা আর কিছুই বলতে পারলো না। প্রকৃতির এই নিষ্ঠুর পরিহাসে দিনাকে এই পৃথিবী থেকে অকালে চলে যেতে হবে। কিন্তু তার মনে বার বার ঘুরে ফিরে একটা চিন্তাই আসে; সে তার মেয়ের মায়া কিভাবে ত্যাগ করবে?
সফিক আজ অফিস থেকে ফেরার পথে দিনার জন্য অনেকগুলো চুড়ি কিনলো। একটা কেক আগেই অর্ডার দিয়ে রেখেছিল। আজ দিনার জন্মদিন। দিনার জন্য একটা গিফট কিনে সেটা রেপিং পেপারে মুরিয়ে নিল; দিনাকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য। বাসার ফেরার পথে ফোন এলো দিনা হটাৎ অসুস্থ হয়ে পরেছে। তাকে হাসপাতালে নিয়া যাওয়া হচ্ছে।
দিনাকে আইসিইউতে নেয়া হয়েছে। ডাক্তার বলল আমাদের হাতে কিছু নেই। লিভার প্রায় নাইনটি পার্সেনট নষ্ট হয়ে গেছে। সফিক পাথর হয়ে গেল। পরিবার-পরিজনের মাঝে শোকের ছায়া পড়ে গেলো। ক্রমশ আশার প্রদীপ নিভু নিভু করছে। চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছে।
পাঁচ দিন পর আইসিইউ থেকে দিনার লাশ বের করা হলো। স্বজনরা জড়ো হয়ে কান্নাকাটি করছে। শুধু সফিক লাশের কাছে নেই। সে মায়াকে নিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
মায়া জিজ্ঞেস করল, বাবা, মামনি কোথায়?
সফিক বলল, তোমার মামনি একটা জরুরী কাজে দূরে গিয়েছে; কদিন বাদে ফিরবে।
মায়া বলল, বাবা শোনো, মামনি আমায় বলেছিল, সে দূরে চলে যাবে। কিন্তু আমায় না বলে চলে গেলো কেন? তুমি দেখো, মামনি ফিরে এলে আমি আর তার সাথে কথা বলবো না। একদমই বলবো না। কোনো দিনও না। মামনির সাথে কাট্টি। চিরদিনের কাট্টি। Please- Follow & Share


Post a Comment
Please do not enter any spam link in the comment box.